তিন সংগ্রামী শিক্ষার্থীর ভর্তিযুদ্ধ জয়

মোঃ বুরহান উদ্দিন:   হাওড়পাড়ের দরিদ্র মানুষদের স্বপ্ন দেখান তারা। তারা শিক্ষাসংগ্রামী। দারিদ্রের কষাঘাত দমাতে পারেনি তাদের। এসএসসি-এইচএসসি কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন তারা। তাদের একজন রোমায়েল আহমদ। মা-ছেলের সংসার আর নিজের লেখাপড়ার খরচ চালাতে নৌকায় মাঝির কাজ করেছেন তিনি। চরম দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেও এইচএসসি পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় স্থান করে নিয়েছেন তিনি। একইভাবে জগন্নাথপুর উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের শাহজালাল মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আমির হোসেনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। পিতৃহীন এবং দিনমজুর মায়ের সন্তান সুনামগঞ্জ শহরতলীর আলমপুরের মোজাহিদুর রহমানও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে কীভাবে ভর্তি হবেন, ঢাকায় কোথায় থাকবেন, লেখাপড়া, থাকা-খাওয়ার খরচ আসবে কোথা থেকে—এই চিন্তা পেয়ে বসেছে তাদের।

রোমায়েল আহমদের বাড়ি সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার লক্ষীপুর গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ‘খ’ ইউনিটে মানবিক বিভাগে মেধাতালিকায় ৪৪তম স্থান অধিকার করেছেন রোমায়েল। রোমায়েলের বাবা সনজব আলী কৃষক ছিলেন, মারা গেছেন ২০১৩ সালে। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। দুই বোনের বিয়ে হয়েছে। দুই ভাইও বিয়ে করে আলাদা থাকেন। মা তাহমিনা বেগম কেবল আছেন তার সঙ্গে। রোমায়েল জানান, গ্রামের লক্ষ্মীপুর তাওয়াক্কুলিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করার পর সিলেট সদর উপজেলার সফির উদ্দিন হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন। সেখানে বিনা বেতনে তাকে পড়তে দেওয়া হয়। রোমায়েল জানান, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করতে চান। পড়াশোনা করে একজন ন্যায় বিচারক হতে চান।

 

রোমায়েল আহমদই কেবল নয়, সুনামগঞ্জ শহরতলীর আলমপুরের মোজাহিদুর রহমানের অবস্থা আরও করুণ। কিন্তু তার সংগ্রাম চলমান। ৪ বোন ১ ভাইয়ের সংসারের দ্বিতীয় সন্তান তিনি। ৭ বছর আগে বাবা মতিউর রহমান মারা গেছেন। সেই থেকেই মা জাকিয়া বেগম ইটের ভাটার শ্রমিক। আলমপুর দারুল হুদা দাখিল মাদ্রাসা থেকে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে শহরতলীর মাইজবাড়ি আলহেরা আলিম মাদ্রাসা থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে আলিম পাস করেছেন তিনি। এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন তিনি। মোজাহিদুরের দুশ্চিন্তা কাটছে না—কীভাবে ঢাকা যাবেন, ভর্তি ফি কোথায় পাবেন। পড়াশুনা চালিয়ে যাবে কীভাবে? দৃঢ়চেতা মোজাহিদুর অবশ্য বলেছেন, ‘আমাকে পড়তেই হবে। ভর্তিও হতে হবে। যে করেই হোক আমি পড়াশুনা চালিয়ে যাব।’

 

রোমায়েল, মোজাহিদুরের মতো সংগ্রামী শিক্ষার্থী জগন্নাথপুরের শাহজালাল মহাবিদ্যালয়ের আমির হোসেনও। বাবা দিনমজুর সুন্দর আলী এবং মা ফাতেমা গতরখেটে পড়াশোনা করিয়েছেন আমির হোসেনকে। কলকলিয়া ইউনিয়নের পাড়ারগাঁও আইডিয়াল উচ্চবিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে জিপিএ-৫ পাওয়ার পর কলকলিয়া শাহজালাল মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন তিনি। কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁর কাছে থেকে ভর্তির কোন টাকা পয়সা নেননি। উপবৃত্তির টাকা পেয়েছেন তিনি। সেই টাকা দিয়েই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় যাওয়া-আসা করেছেন তিনি। আমির হোসেন বলেন, ‘আমার বাবা দিনমজুর তবুও স্বপ্ন দেখেন, আমি যেন পড়াশোনা করি, আমি চাই একজন সৎকর্মকর্তা হিসেবে দেশের জন্য কাজ করতে।’

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *