নির্ধারিত সময়ে বাঁধের কাজ শেষ করতে হবে: পানিসম্পদমন্ত্রী

মোঃ বুরহান উদ্দিন: পানিসম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন,  প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর আমাদের হাত নেই। তবে এই দুর্যোগ থেকে আমাদের বাঁচার চেষ্টা থাকতে হবে। গতবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুনামগঞ্জের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তাই আমাদের এবার সেভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।
শনিবার (২০ জানুয়ারি) দিনব্যাপী সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওর পরিদর্শনকালে কৃষকদের সাথে মতবিনিময় করার সময় এসব কথা বলেন তিনি।

হাওর পরিদর্শনে পানিসম্পদমন্ত্রী

মন্ত্রী বলেন, বর্ষাকালে হাওরে যে পানি আসে তা থেকে সৃষ্ট বন্যায় ফসল নষ্ট হয়। মানুষের ভোগান্তি হয়। সুনামগঞ্জের ফসল রক্ষাবাঁধের কাজ চলছে। ইনশাল্লাহ এবার  ফসল রক্ষা হবে। তিনি আরও বলেন, আমি কাজটি মন্ত্রণালয়ে বসেও করতে পারতাম। এখানে নিজে আসলাম কৃষকদের কাছ থেকে সমস্যাটি জানার জন্য। কেন ফসল নষ্ট হয়, পানি কোথা থেকে আসে,  বাঁধ নির্মাণ কাজের কী অগ্রগতি হয়েছে- সবই জানতে এসেছি আপনাদের কাছ থেকে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাঁধ নির্মাণের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাই বাঁধের কাজ করতে হবে সুষ্ঠুভাবে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে।
দুপুরে স্পিডবোটে করে প্রথমে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জোয়ালভাঙ্গা হাওর পাড়ের নির্মাণাধীন বাঁধে যান মন্ত্রী। তিনি সেখানে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান গৌরারং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ফুল মিয়াসহ স্থানীয় কৃষকরা। তারা বাঁধ নির্মাণ কাজ সঠিকভাবে চলছে জানিয়ে মন্ত্রীকে এই মর্মে আশ্বস্ত করেন যে তারা সুষ্ঠুভাবে বাঁধের কাজ সম্পন্ন করবেন। ওই ইউপি’র এক নারী সদস্য মন্ত্রীকে বলেন, বরাদ্দ চলমান থাকলে কাজের সমস্যা হবে না।
পরে মন্ত্রী জামালগঞ্জ উপজেলার পাগনার হাওরের মুচিবাড়ী হাওর রক্ষাবাঁধ পরিদর্শন করেন। সেখানে এলাকাবাসী জানান, পাগনার হাওরে এখনো জলাবদ্ধতা রয়েছে। সেখানে অনেক স্লুইস গেট অকেজো। এগুলো খুলে দিলেও সমস্যা, না দিলেও সমস্যা। খুলে দিলে বর্ষায় পানি এসে আবার ফসল ডুবিয়ে দেবে। এলাকাবাসী পাকনা হাওরে জলাবদ্ধতা নিরসনে গজারিয়া স্লুইস গেট-এর পার্শ্ববর্তী এলাকা খনন, ডালিয়া স্লুইস গেট-এর পাশে খনন, ফুলিয়ার টানা বাঁধে স্লুইস গেট নির্মাণ ও হালির হাওরে রাতলা স্লুইস গেট নির্মাণসহ চলতি মৌসুমে বাঁধ নির্মাণ কাজ দ্রুত শেষ করতে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এ বিষয়ে মন্ত্রী পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য জেলা পরিষদ বা উপজেলা পরিষদের সহযোগিতা নেওয়ার পরামর্শ দেন।
হাওর পরিদর্শনকালে আনোয়ার হোসেন  মঞ্জুর সফরসঙ্গী ছিলেন, সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. ইয়াহইয়া চৌধুরী, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. জাফর আহমেদ খান, অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কে এম আনোয়ার হোসেন, ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, সিলেট বিভাগের স্থানীয় সরকারের পরিচালক মতিউর রহমান, ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এমরান হোসেন, পুলিশ সুপার মো. বরকতুল্লাহ খান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. কামরুজ্জামান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক,  জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শামীম আল ইমরান প্রমুখ।
পাউবো কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে ৫৩ কোটি টাকার পৃথক প্রাক্কলন বিষয়ে আলোচনা
পানি সম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু হাওরের বাঁধের কাজ পরিদর্শন শেষে বিকেলে সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউজে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন। বৈঠকে সুনামগঞ্জ এলাকার হাওরসহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা হয়। বৈঠকে হাওর সমস্যা গুরুত্ব পায় এবং সমস্যা সমাধান লক্ষ্যে তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ হিসাবে ৫৩ কোটি টাকার একটি পৃথক প্রাক্কলন তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়। ঐ প্রকল্পে ভৈরবের কাছে মেঘনা নদী খনন করে সিলেটের সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি নিষ্কাষণ ব্যবস্থার জন্য ৫০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। বেশ কয়েকটি খাল খনন ও স্লুইস গেইট নির্মাণও এই প্রকল্পে রয়েছে।
বৈঠকে সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ, সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. ইয়াহইয়া চৌধুরী, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সনিয়র সচিব ড. জাফর আহমেদ খান, অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কে এম আনোয়ার হোসেন, ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, সিলেট বিভাগের স্থানীয় সরকারের পরিচালক মো. মতিউর রহমান, ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এমরান হোসেন, পুলিশ সুপার মো. বরকতুল্লাহ খান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. খামরুজ্জামান, পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক, এনডিসি শাকিল আহমদ, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী  রঞ্জন কুমার দাস উপস্থিত ছিলেন।
‘হাওর রক্ষা বাঁধের প্রয়োজনে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় সুনামগঞ্জ চলে আসবে’
পানিসম্পদমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু গত শুক্রবার রাতে সুনামগঞ্জ এসে পৌঁছান। স্থানীয় সার্কিট হাউজে গভীর রাত পর্যন্ত সুনামগঞ্জ জেলার হাওরসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের চলমান প্রকল্পের সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে উর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে মতবিনিময় করেন। মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, হাওর রক্ষাবাঁধের কাজ তদারকির জন্য প্রয়োজনে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় সুনামগঞ্জ চলে আসবে। প্রয়োজনে আমিও সুনামগঞ্জে অবস্থান করবো। তিনি বলেন, যেভাবেই হোক এবার হাওরের ফসল আমাদের রক্ষা করতেই হবে। মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বলেন, গত বছরের মত যেন হাওরের বাঁধ ভেঙে ফসলহানির ঘটনা না ঘটে-এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। তারা হাওরের কাজের তদারকি করবে। মন্ত্রী বলেন, বন্যা, ভূমিকম্পসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের খবর আগে থেকেই জানা যায়। কিন্তু আমরা খেয়াল করি না। আমাদের কোন দায়বদ্ধতা নেই। আমরা শুধু দোষারোপ করি। এটা সঠিক নয়। তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের বলেন, কাজ করতে না পারলে চলে যাবেন। তিনি বলেন, আমাদের অফিসারদের নিজ নিজ কাজ করতে হবে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
হাওর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য ৮১৫টি পিআইসির মধ্যে ৩০২টি পিআইসি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৩১টি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে-এই তথ্য জেনে তিনি বাকি পিআইসি কবে গঠন হবে প্রশ্ন রেখে কর্মকর্তাদের বলেন, এ খাতে বরাদ্দকৃত ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হবে। তিনি দ্রুত কাজ সম্পাদনের তাগিদ দিয়ে বলেন, বৃষ্টি নামার ৩ মাস বাকি। তাই তার আগেই সব কাজ শেষ করতে হবে।
ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো. এমরান হোসেনের সভাপতিত্বে আলোচনায় বক্তব্য রাখেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি মতিউর রহমান, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. জাফর আহমদ খান, অতিরিক্ত সচিব মো. ইউসুফ, আওয়ামী লীগ নেতা দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালাম, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহান, আওয়ামীলীগ নেতা সিরাজুর রহমান সিরাজ প্রমুখ ।  উপস্থিত ছিলেন সুনামগঞ্জ-৪ আসনের এমপি পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ, শামসুন নেহার বেগম শাহানা এমপি, সিলেট-২ আসনের এমপি ইয়াহহিয়া চৌধূরী, জাতীয় পার্টি (জেপি) সিলেট জেলা সভাপতি ইফতেখার আহমদ লিমন, সাধারণ সম্পাদক সমরাজ আহমদ প্রমুখ।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *