বাবা

মীম নোশিন নাওয়াল খান:  দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যাচ্ছে। নীল স্কুল থেকে এসেই ট্যাব নিয়ে বসেছে, এখনও ওঠে নি। দুপুরে খাওয়া হয় নি। বুয়া কয়েকবার ডেকে গেছে। নীল আসছি, আসব করে আবার খেলায় মনোযোগ দিয়েছে।
তার রুটিনটা এমনই। স্কুল থেকে ফিরেই সে ট্যাব নিয়ে গেইম খেলতে বসে। খাওয়ার কোনো ঠিক থাকে না। কখনও তার দুপরের খাবার খেতে খেতে বিকেল হয়ে যায়, কখনো খাওয়াই হয় না, টেবিলে ভাত-তরকারি ঠাণ্ডা হয়।

নীলের মা নেই। দু’বছর আগে মা মারা গেছে। তারপর থেকেই তার জীবনটা অন্যরকম হয়ে গেছে, একদম অগোছালো। বাবা সকালবেলায় তাকে স্কুলে দিয়ে অফিসে চলে যায়, ফিরতে রাত হয়। সারাটাদিন নীল একাই বাসায় থাকে। তার সঙ্গী তার ট্যাব। সে ট্যাবে গেইম খেলে সারাদিন।

নীলদের বাসার সামনে একটা বেশ বড়সড় খেলার মাঠ আছে। কিন্তু সে কখনও মাঠে খেলতে যায় না। আগে যেত। যখন মা ছিল, রোজ বিকেলে সে খেলতে যেত। আশেপাশের ফ্ল্যাটের বন্ধুরা তাদের বাসায় আসত। দিনগুলো খুব সুন্দর ছিল। তাকে বাসায় একা থাকতে হত না, মায়ের সঙ্গে গল্প করে দিব্যি দিন কেটে যেত। রোড অ্যাকসিডেন্টে মা মারা গেছে। তারপর থেকে নীলের সবকিছুই উল্টোপাল্টা হয়ে গেছে।

ফোন বাজছে। খুব বিরক্তি নিয়ে নীল ফোন ধরল। বাবার ফোন। বাবা জিজ্ঞেস করল, বাসায় পৌঁছেছ ঠিকমতো নীল?
নীল গেইম খেলতে খেলতেই বলল, হুঁ।
-খেয়েছ?
-না।
বাবা এবার বিরক্তি নিয়ে বললেন, এখনও খাও নি কেন? তুমি রোজ রোজ দুপুরের খাবার খেতে বিকেল করে ফেলো। এটা একদম ঠিক না। খেয়ে নাও।
নীল অন্যমনস্কভাবে বলল, আচ্ছা।
ফোনটা রেখেই সে আবার গেইম খেলায় ব্যস্ত হয়ে গেল। সে ক্লাস এইটে পড়ে। আজকে তার ক্লাস টেস্টের খাতা দিয়েছে। সে একটা সাবজেক্টে ফেইল করেছে। বাকীগুলোতেও খুব খারাপ মার্কস পেয়েছে। কিন্তু সেটা নিয়ে তার একটুও মাথাব্যথা নেই। আগে ছিল। আগে সে খুব ভালো ছাত্র ছিল। মা নিজে তার পড়ার খেয়াল রাখত। সে সবসময় পরীক্ষায় ভালো করত। কিন্তু এখন আর পরীক্ষা নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই। সে খুব একটা পড়াশোনাও করে না। স্কুলে যেতে হয় বলে যায়।

বাবা আজ বেশ আগেই ফিরল। কলিংবেল শুনে দরজা খুলতেই ঘরে ঢুকল একরাশ সিগারেটের গন্ধ। এটা প্রতিদিনের ঘটনা। বাবা সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে ঘরে ঢোকে। আগে এই অভ্যেস ছিল না। মা মারা যাওয়ার পর থেকে বাবা সিগারেট খাওয়ার অভ্যেস করে ফেলেছে।

নীল দরজা খুলে দিয়ে নিজের ঘরে চলে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াল। বাবা গম্ভীর স্বরে ডেকে বললেন, নীল, শোনো!
নীল একবার মুখ ফিরিয়ে তাকাল। বলল, হ্যাঁ, বলো।
বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ডিনার করেছ?
নীল মাথা নেড়ে বলল, না।
-টেবিলে এসো। আমার সাথে ডিনার করো। তোমার সঙ্গে কথা আছে আমার।
নীল জিজ্ঞেস করল, কী কথা?
বাবা বললেন, সেটা তখনই বলব।
বুয়া দুপুরে রান্না করে টেবিলে খাবার রেখে যায় প্রতিদিন। রাতে সেই খাবার গরম করে খেতে হয়। কোনো কোনোদিন বাবা খাবার গরম করে, কোনোদিন ঠাণ্ডাই খেয়ে নেয়। আর নীল তো প্রায় সব রাতেই ঠাণ্ডা খাবার খেয়ে নেয়।
বাবা যত্ন করে খাবারগুলো সব গরম করে টেবিলে এনে সাজালেন। তারপর নীলকে ডাকলেন। নীল টেবিলে এসে বসল। অস্বস্তি লাগছে। বাবার সঙ্গে অনেকদিন একসঙ্গে খাওয়া হয় না। মা বেঁচে থাকতে তিনজনে একসাথে খাওয়া হত। এখন নীলের একাই খাওয়ার অভ্যেস হয়ে গেছে।
বাবা যত্ন করে প্লেটে খাবার বেড়ে দিলেন। নীল খাবার নিয়ে শুধু নাড়াচাড়া করতে লাগল, খেতে পারল না। বাবা সেটা খেয়াল করে জিজ্ঞেস করলেন, কী হল? খাচ্ছ না যে?
নীল একটু হাসতে চেষ্টা করল। বলল, না, খাচ্ছি।
বাবা জিজ্ঞেস করলেন, তোমার স্কুল কেমন চলছে নীল?
নীল মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ভালো।
-পড়াশোনা করছ ঠিক করে?
-হ্যাঁ।
নীলের এবার সত্যিই অস্বস্তি লাগছে। অদ্ভুতও লাগছে। বাবা কখনও এসব প্রশ্ন করেন না। আজকে কী হল?
নীলের কখনও বাবার এত কাছে থাকা হয় না। সকালে একবার শুধু বাবা স্কুলে দিয়ে আসেন। ওই সময়টুকু সে খুব কষ্ট করে বাবার পাশে বসে থাকে। বাবার গা থেকে সিগারেটের বিচ্ছিরি গন্ধ আসে। নীলের মনে হয় সেই গন্ধে সে বমি করে ফেলবে।
এখন সে বাবার খুব কাছে বসে আছে। মুখোমুখি চেয়ারে। বাবার গা থেকে সিগারেটের বাজে গন্ধটা আসছে। নীলের খাওয়ার রুচি হচ্ছে না। খাবারের গন্ধ ছাপিয়ে সিগারেটের গন্ধ নাকে লাগছে। গা গুলিয়ে আসছে। তার উপর বাবার এমন অদ্ভুত আচরণ। নীলের ইচ্ছে হচ্ছে টেবিল ছেড়ে উঠে যেতে। কিন্তু সে কিছুই বলতে পারছে না।
বাবা শান্তভাবে বললেন, তোমার ক্লাসটিচার ফোন করেছিলেন। আজ নাকি তোমার ক্লাস টেস্টের খাতা দিয়েছে?
নীল চমকে উঠল। আস্তে আস্তে বলল, হ্যাঁ।
বাবা বললেন, তোমার টিচার বললেন তুমি নাকি ম্যাথসে ফেইল করেছ? বাকী সাবজেক্টগুলোতেও নাকি খুব খারাপ মার্কস পেয়েছ?
নীল মাথা নিচু করে রইল। উত্তর দিল না।
বাবা বললেন, তুমি তো দুটো কোচিং-এ যাচ্ছ। দরকার হয় আরও কোনো কোচিং-এ যাও। কিন্তু লেখাপড়া খারাপ হচ্ছে কেন?
নীল কিছু বলল না। সে আসলে প্রায় দিনই কোচিং-এ যায় না। এটা বাবা জানেন না।
বাবা এবার বেশ সিরিয়াসভাবে বললেন, নীল, ওই ট্যাবটাই যত নষ্টের গোড়া! সারাটাদিন তুমি শুধু গেইম খেলো। আমি যতক্ষণ বাসায় থাকি ততক্ষণ তোমাকে ট্যাব নিয়েই পড়ে থাকতে দেখি। নিশ্চয়ই বাকী সময়ও তুমি লেখাপড়া বাদ দিয়ে একই কাজ করো। গেইমের এত নেশা কেন? লেখাপড়ার কোনো প্রয়োজন নেই? আমার মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছ তুমি! কী হবে বড় হয়ে? রিকশাওয়ালা?
নীলকে সাধারণত বাবা এভাবে বকা দেন না। নীলের খুব রাগ হল। তবু সে চুপ করে রইল।
বাবা আবার বললেন, তোমার টিচার বললেন, তোমার জেএসসি পরীক্ষা নিয়ে তারা চিন্তিত। এত খারাপ রেজাল্ট কীভাবে হচ্ছে নীল? গেইমের এত কীসের নেশা?
নীল এবার ফুঁসে উঠল। চিৎকার করে বলল, আমার গেইমের নেশা তাতে কী হয়েছে? আমি তো আর তোমার মতো সিগারেটের নেশা করি না! আমার গা থেকে তো আর সিগারেটের গন্ধ বেরোয় না! আমি তো আর দিনশেষে বাসায় এসে ইজিচেয়ারে বসে সিগারেট টানি না!
বাবা রেগে উঠে বললেন, কী বললে তুমি? বড়দের মুখে মুখে কথা বলতে শিখে গেছ? এত বেয়াদবি কীভাবে শিখলে তুমি?
নীল আবার চিৎকার করে বলল, সত্যি কথা বললে সেটা বেয়াদবিই মনে হয় বাবা। তোমার সিগারেট খাওয়ার কারণে আমি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। তুমি কি জানো, তোমার চেয়ে বেশি ক্ষতি আমার হচ্ছে? তোমার সিগারেটের ধোঁয়ায় আমার শ্বাসকষ্ট হয়। আমি কিছুই বলতে পারি না। তোমার যা ইচ্ছে তুমি করো। তাহলে তুমি কেন আমাকে বলবে?

আর কোনো কথা শোনার জন্য অপেক্ষা না করে নীল টেবিল ছেড়ে উঠে গেল। নিজের ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল সে।
বাবা স্তব্ধ হয়ে সামনে আধা-খাওয়া খাবারের প্লেট নিয়ে বসে রইলেন টেবিলে।
সকালে নীলের ঘুম ভাঙল বাবার ডাকে। সে ঘুম ঘুম চোখে দরজা খুলে বিরক্তি নিয়ে বলল, আজকে শুক্রবার। স্কুল নেই।
বাবা নরম গলায় বললেন, হ্যাঁ, আমি জানি।
নীল জিজ্ঞেস করল, তাহলে ডাকছ কেন?
বাবা কখনও ছুটির দিনে নীলকে সকালে ডাকাডাকি করেন না। ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা খেয়ে সিগারেট ধরিয়ে পত্রিকা পড়তে বসেন। তাঁর খুব সিগারেটের নেশা। দিনে দুই-তিন প্যাকেট না হলে হয় না।
বাবা হাসিমুখে বললেন, তোমার জন্য নাস্তা বানিয়ে রেখেছি। স্যান্ডউইচ আর কফি। হাতমুখ ধুয়ে টেবিলে এসো।
নীল অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল। তাঁর কথা শুনে ঘুম ঘুম ভাবটা কেটে গেছে। বলল, তুমি নাস্তা বানিয়েছ?
বাবা মাথা নেড়ে বললেন, হ্যাঁ।
নীল আর কথা বাড়াল না। হাতমুখ ধুয়ে টেবিলে চলে গেল।
খাওয়া শেষে বাবা জিজ্ঞেস করলেন, স্যান্ডউইচটা কেমন হয়েছে নীল?
নীল মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ভালো।
বাবা আবার জিজ্ঞেস করলেন, আজ তোমার কোনো কাজ আছে?
নীল বলল, হ্যাঁ, কোচিং আছে। একটু পরেই।
বাবা মাথা নেড়ে বললেন, ও।
একটু থেমে আবার বললেন, আজ যেতে হবে না কোচিং-এ।

নীল আবারও অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল। মানুষটা এত অদ্ভুত আচরণ করছে কেন?
বাবা হাসলেন। বললেন, চলো, মাঠে যাই। আকাশটা মেঘলা লাগছে। মনে হয় বৃষ্টি নামবে। বৃষ্টিতে ফুটবল খেলা দারুণ মজা। মাঠে অনেক ছেলেরাই ফুটবল খেলে দেখি। আজকে তুমি আর আমিও খেলব।
নীল ভ্রু কুঁচকে বাবার দিকে তাকাল। কিছু বলল না।
বাবা আবার বললেন, কই? চলো? আর হ্যাঁ, শুধু তুমি আর আমি যাব। সিগারেট যাবে না, ট্যাবও যাবে না।
নীলের হঠাৎ খেয়াল হল বাবার গা থেকে সিগারেটের গন্ধ আসছে না। পারফিউমের ঘ্রাণ আসছে। দেখে মনে হচ্ছে সকালে ঘুম থেকে উঠে সাবান-শ্যাম্পু দিয়ে ভালো করে গোসল করে পারফিউম মেখেছেন। সকালে বোধহয় সিগারেটও খান নি। সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, তুমি সিগারেট খাও নি আজকে?
বাবা মাথা নেড়ে বললেন, না। সিগারেটের প্যাকেটগুলো ফেলে দিয়েছি। আমি আর সিগারেট খাব না। আমি আশা করি তুমিও আর এত বেশি গেইম খেলবে না। গেইম খেলা ছাড়তে বলছি না, মাত্রাটা কমাতে বলছি শুধু।

নীল চুপ করে রইল। বাইরে বৃষ্টি শুরু হল। ঝুম বৃষ্টি। বাবা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ব্যস্ত হয়ে বললেন, কই? তাড়াতাড়ি চলো। বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে তো! বৃষ্টি শেষ হয়ে গেলে আর ভিজে ভিজে ফুটবল খেলার মজা পাওয়া যাবে না। চলো চলো, শিগগির চলো।
বাবা আর ছেলে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে দৌড়াতে শুরু করল মাঠের দিকে।

লেখক: শিশুসাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক; পাঁচবার ইউনিসেফ মীনা মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *