তারাও পারে আশার আলো ছড়াতে

ইমন ও শিমুল নামের দুই শিশু যে অন্যসব শিশুদের চাইতে ব্যতিক্রম, তা টের পাওয়া যাচ্ছিল তারা একটু একটু করে বেড়ে ওঠার সময়। যখন তাদের অটিজমের কথা বোঝা গেল তখন তাদের ভবিষ্যত্ নিয়ে বাবা-মায়ের চিন্তার অন্ত ছিল না। কেমন করে করতে হবে পরিচর্যা, কিভাবেই বা তারা অন্যদের সঙ্গে স্কুলে যাবে। অটিস্টিক শিশুরা সাধারণত নির্দিষ্ট কোনো কাজে  পারদর্শী হলেও অন্যদের মতো করে সবার সাথে সহজভাবে মিশতে পারে না। ফলে তাদের যে আলাদা পরিচর্যা দরকার সেটা সাধারণ স্কুলে পাওয়া যায় না। এক সময় তারা মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এমন শিশুদের কথা ভেবেই সুনামগঞ্জে গড়ে উঠেছে অটিস্টিক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুল। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে স্কুলটি। ইমন ও শিমুলের মতো শিশুদের অভিভাবকরা দেখছেন আশার আলো।

শুরুর কথা
২০১৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ অটিস্টিক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন সুনামগঞ্জের তত্কালীন জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম। প্রতিষ্ঠার পর ওই বছরের ৫ অক্টোবর থেকে শুরু হয় শিক্ষা কার্যক্রম। জেলা ক্রীড়া সংস্থার পুরোনো ভবনে অস্থায়ী ক্যাম্পাস স্থাপন করা হয়। জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে অফিসার্স ক্লাব সুনামগঞ্জ এই বিদ্যালয়টি পরিচালনা করছে।

বর্তমানে এই স্কুলের শিক্ষার্থী ৪৬ জন। তাদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে অনুশীলন করান ৭ জন শিক্ষক। এদের সবাই বিনাবেতনে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করছেন। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলে। লেখাপড়া ও সাধারণ জ্ঞান শেখানোর পাশাপাশি স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি ও মিউজিক্যাল থেরাপি দেওয়া হচ্ছে অটিস্টিক শিশুদের। শেখানো হচ্ছে ছবি আঁকা ও খেলাধুলা। যাদের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তাদের জন্য রয়েছে ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা। এছাড়াও যারা পড়াশোনায় ভালো করছে তাদেরকে যুক্ত করা হচ্ছে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমে। জেলা প্রতিবন্ধীবিষয়ক কর্মকর্তা তোফাজ্জল হক ও ফিজিওথেরাপিস্ট তানজিল হকও এতে সহযোগিতা করেন।

তারাও পারে
স্কুলটির সহকারি শিক্ষক সাফাত উল হক চৌধুরী জানান, অটিস্টিক শিশুদের প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন কাজে পারদর্শিতা দেখাচ্ছে। সেই অনুযায়ী তাদের যত্ন নেওয়া হচ্ছে। এরইমধ্যে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বেশকিছু পুরস্কার পেয়েছে অটিস্টিক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলের শিক্ষার্থীরা। খেলাধুলা ও ছবি আঁকায় আঞ্চলিক পর্যায়ে পুরস্কার, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসের কুঁচকাওয়াজে অংশগ্রহণ করে প্রথম হওয়া ও শরীরচর্চা প্রদর্শনে পারদর্শিতা দেখিয়েছে তারা। এছাড়াও তারা শিশু একাডেমির আয়োজনে নানা প্রতিযোগিতায় নিয়মিত অংশ নিচ্ছে।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক সাবিরুল ইসলাম নিয়মিত স্কুলটি পরিদর্শন করছেন এবং এর পরিধি বাড়ানোর জন্য কাজ করছেন। জেলা প্রশাসকের বাসভবনের পেছনে একটি জমিতে স্কুলের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ চলছে। 
জানা গেছে, এরইমধ্যে স্কুলটি পরিদর্শন করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ, মন্ত্রী পরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম, সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক, ধর্ম সচিব মো. আব্দুল জলিল, সিলেটের সাবেক বিভাগীয় কমিশনার জামাল উদ্দীন আহমেদসহ বেশ কয়েকজন রাজনীতিবিদ ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা।

প্রধান শিক্ষক মো. মিজানুল হক সরকার বলেন, ‘প্রতিবন্ধী শিশুদের মেধা বিকাশে সহায়তা করতে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করছি। তবে স্কুলে এসব শিশুদের জন্য যে শিক্ষা উপকরণ ও খেলাধুলার সরঞ্জাম দরকার তা আমাদের পর্যাপ্ত পরিমাণে নেই। অটিস্টিক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলের কার্যক্রম আরো প্রসারিত করতে সমাজের বিত্তবান মানুষদের সহযোগিতা প্রয়োজন।’

আইএইচটির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও সাবেক সিভিল সার্জন ডা. সৈয়দ মোনাওয়ার আলী বলেন, ‘আগে সন্তান অটিস্টিক হলে অনেক বাবা-মা হীনমন্যতায় ভুগতেন। এখন সচেতনতা বাড়ায় এমন শিশুদেরকে মূল স্রোতে যুক্ত করতে তারা এগিয়ে আসছেন। এসব শিশুদের প্রতিভার বিকাশ ঘটলে তারা সমাজের কল্যাণে কাজ করবে।’

অনেক প্রতিভা লুকিয়ে আছে
স্কুলের স্থায়ী ভবন নির্মাণ কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও উপসচিব মো. কামরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমাদের জেলা প্রশাসক স্কুলটির ব্যাপারে আন্তরিক। তার নেতৃত্বে সুনামগঞ্জের সবগুলো উপজেলায় এই স্কুলের কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য আমরা কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, যেন তারা শিক্ষার মাধ্যমে সমাজের মূল স্রোতের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।’ তিনি জানান, নির্মাণাধীন ভবনের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে। তিনতলা ভবনটিতে স্কুলের শ্রেণিকক্ষ ছাড়াও থেরাপি সেন্টার ও কারিগরি শিক্ষা প্রদানের সুযোগ সুবিধা থাকবে। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কামরুজ্জামান আরো বলেন, ‘এই অটিস্টিক শিশুদের মাঝে অনেক প্রতিভা লুকিয়ে আছে। তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দিলে তারাই দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনবে।’

সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ বলেন, ‘অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধীরা সমাজের অংশ। অটিজম রোগের কারণে বুদ্ধি বিকাশ বাঁধাগ্রস্থ হওয়ায় তারা সামাজিক সম্পর্ক তৈরি করতে পারে না। ডাকলে সাড়া দেয় না কিংবা বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে না। তবে অটিস্টিক শিশুরা কোনো না কোনো বিশেষ বিষয়ে পারদর্শী হয়। কেউ গান গাওয়ায় পারদর্শী, কেউ ছবি আঁকায় পারদর্শী। তাদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এখনো অনেক কম। সুনামগঞ্জ অটিস্টিক স্কুলের মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রসারের জন্য সবাইকে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে।’

  • সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার
শেয়ার করুন