মাদকের বিস্তার যেন পুরোপুরি নিধন হয়

সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার: ২০১৩ সালে ফিরে যাওয়া যাক। বছরের মাঝামাঝি সময়ে রাজধানী ঢাকায় নিজ বাসায় খুন হন এক পুলিশ কর্মকর্তা ও তার স্ত্রী। বাইরের কারোর শত্রুতায় নয়, পুলিশ পরিদর্শক মাহফুজ ও তার স্ত্রী স্বপ্নাকে খুন করে তাদেরই মেয়ে ঐশী। জানা যায়, স্কুলপড়ুয়া মেয়ে ঐশী তার বখে যাওয়া সহপাঠীদের প্ররোচনায় মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছিল। বাবা-মা যখন কড়া শাসনে তাকে শোধরানোর চেষ্টা করেন, তখনই সে ক্ষিপ্ত হয়ে খুন করে মা-বাবাকে। বেশ কয়েকবছর পর এখনো এই নির্মম ঘটনা মানুষের মনে দাগ কেটে আছে।

কেবল মাদকের জন্যই এধরনের ঘটনা আরো বহুবার ঘটেছে। সর্বনাশা মাদকের ছোবলে আক্রান্ত হয়ে আছে তরুণরা। মাদক কেনার টাকার জন্য সন্তানের কাছে জিম্মি হচ্ছেন মা-বাবা। ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ হচ্ছে, তছনছ হচ্ছে পরিবার। ভাঙছে সংসার।

এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, দেশের ৫৩ শতাংশ তরুণ নানারকম নেশায় আসক্ত। আবার এদের মধ্যে প্রায় ৮০ ভাগই ইয়াবা ট্যাবলেট সেবন করে। মাদকে আসক্ত হওয়ার পিছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের আনাচে-কানাচে বিভিন্ন জায়গায় সন্ধ্যা নামার পর থেকেই অলিগলিতে বিভিন্ন নেশাদ্রব্য বিক্রি হয়। ক্রেতাদের বেশিরভাগই কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। শুধু তাই নয়, ক্রেতার তালিকায় রয়েছে স্কুলের শিক্ষার্থীরাও! ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও মাদক নিচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘তরুণ প্রজন্মের মাদকাসক্তির কারণ হতাশা। নৈতিক মূল্যবোধ ও সুশিক্ষার অভাব, অপসংস্কৃতির প্রভাব, পরিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়ন, শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বসহ নানাবিধ কারণে তরুণরা মাদকে ঝুঁকছে। এছাড়া মাদকের প্রতি কৌতূহল ও সচেতনতার অভাব তো আছেই, অনেকক্ষেত্রে সচেতন নন অভিভাবকরাও।’

মনোশিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, ‘পরিবারের খোঁজখবর না-নেওয়ার কারণেও অনেক শিক্ষিত ছেলেমেয়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। এটা অনেক সময় পরিবারের সদস্যরা জানেনও না। ছেলেমেয়েরা এমনভাবে আসক্ত হয়ে পড়ছে যে, মাদকের জন্য পরিবারের লোকজনকে হত্যা করতেও দ্বিধা করে না। তাই মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে পরিবার ও দেশকে রক্ষা করতে হলে দরকার সচেতনতা। একই সঙ্গে মাদক চোরাচালান, বিপণন ও বিক্রিরোধে আইনসম্মতভাবে কঠোর হতে হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও।’

শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মাসুদুল আলম বলেন, ‘আজকাল সন্ধ্যার পর স্কুলের ছাত্রদের হাতেও মাদক দেখি। রাতের অন্ধকারে কলেজ ক্যাম্পাসের কোণেও মাদকের আসর বসে। আমি নিজে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও হলের অনেককে মাদক সেবন করতে দেখতাম। মাদকের কারণে একটা নষ্ট প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে। সরকার মাদকের বিরুদ্ধে যে অভিযান শুরু করেছে, তা যেন মাদকের বিস্তারকে পুরোপুরি নিধন করে।’

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ফাহমিদুর রহমান বললেন, ‘ধূমপান করা তো এখন সাধারণ দৃশ্য। কিন্তু সহপাঠীদের অনেককে দেখেছি নানারকম মাদক নিয়ে কথা বলতে; জানতে পেরেছি তারা তাদের সুবিধামতো সময়ে কয়েকজন একসঙ্গে হয়ে মাদক সেবন করে। এটা তাদের কাছে ফ্যাশনের মতোই।’

একজন স্বাভাবিক মানুষ ও একজন মাদকাসক্তের মধ্যে বেশকিছু পার্থক্য খালি চোখেই ধরা পড়ে। মাদকসেবীর কথাবার্তা, আচার-আচরণ ও চলাফেরায় পরিবর্তন দেখা যায়। তারা অস্থির হয়ে থাকে, বিক্ষিপ্ত চিন্তাভাবনা করে। কোনো কাজেই মনোসংযোগ ধরে রাখতে পারে না। বিভিন্ন অজুহাতে বাবা-মায়ের কাছে ঘন ঘন টাকা চায়। তারা মাদক নেওয়ার জন্য অন্যদেরকেও প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। এছাড়া আজকাল অনেক তরুণ-তরুণী ইয়াবা সেবন করছে। তাদের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ইয়াবা খেলে কর্মক্ষমতা বাড়ে, তরুণীরা স্লিম থাকতে পারে। ইয়াবা সেবনের শুরুর দিকে কিছুটা উত্তেজনা ও চাঞ্চল্য তৈরি হলেও তা ধীরে ধীরে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নষ্ট করে দেয়। সাবেক সিভিল সার্জন ডা. সৈয়দ মোনাওয়ার আলী বলেন, ‘মাদকাসক্তির কারণে স্নায়ুতন্ত্র, হূদযন্ত্র, যকৃত, ফুসফুস, প্রজননতন্ত্র, কিডনি, পাকস্থলীসহ শরীরের প্রায় সব অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি তা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। আর ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে মাদক নিলে এইচআইভি সংক্রমণ হতে পারে।

মাদকাসক্তদের জন্য দেশে বেশকিছু নিরাময় কেন্দ্র কাজ করছে। কাউন্সিলিং ও চিকিত্সার মাধ্যমে মাদকসেবীদের সুস্থ করে তোলা যায়। কাউন্সিলিং করে মাদক থেকে দূরে থাকার জন্য প্রেরণা দেওয়া হয়। মাদকে আসক্ত হওয়ার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুনর্বাসনমূলক নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ চলতে থাকে। চিকিত্সার ধাপ দীর্ঘমেয়াদি হলেও সঠিক চিকিত্সায় একজন মাদকসেবী পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে পারে।’

সমাজবিজ্ঞানীদের ভাষ্যমতে, মাদক থেকে উত্তরণের জন্য পারিবারিক বন্ধনকে মজবুত করতে হবে। সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে, পাশাপাশি সুস্থ সংস্কৃতিচর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

যারা ভবিষ্যতে দেশকে নেতৃত্ব দেবে, সেই প্রজন্মের বড় অংশকে যদি মাদক থেকে রক্ষা করা না যায় তবে হুমকিতে পড়বে দেশের ভবিষ্যত্। তাই মাদক থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে এর উৎসগুলোকে দমন করতে হবে কঠোর হাতে। কেবল খুচরা ব্যবসায়ীদেরকে ধরে শাস্তি দিলেই হবে না; পর্দার পিছনে থেকে যারা এই ব্যবসার কলকাঠি নাড়ছে তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

 

সম্পাদক, সুনামগঞ্জ মিরর
tawsif.munawar@gmail.com

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *