সাক্ষাৎকারে পিএসসি’র চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাদিক

অন্য যেকোনো চাকরির চাইতে কেন বিসিএসে তরুণদের বেশি আগ্রহ? এখনকার সময়ের বিসিএসে আগের চাইতে পার্থক্য কী? যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে বিসিএসে এসেছে পরিবর্তন, সেই পরিবর্তন-পরিমার্জনসহ তরুণদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক। সুনামগঞ্জের এই কৃতিসন্তানের সাথে সুনামগঞ্জ মিরর-এর সম্পাদক সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ারের আলাপচারিতায় উঠে এসেছে নানা বিষয়। তারই চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো।

‘রক্ত দিয়ে স্বাধীন হওয়া এই দেশে যারা প্রজাতন্ত্রের চাকরি করবেন, তারা নিশ্চয়ই দেশমাতৃকার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ’

ড. মোহাম্মদ সাদিক, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন

চাকরিক্ষেত্রে এই প্রজন্মের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে বিসিএস। সরাসরি দেশসেবায় আত্মনিয়োগ করার পাশাপাশি রয়েছে ঈর্ষণীয় সম্মান। সাম্প্রতিককালে আমরা বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে দেখছি, প্রতিবারই আবেদনকারীর সংখ্যা বাড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, এই প্রজন্মের শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা নিজেদেরকে প্রজাতন্ত্রের সেবায় যুক্ত করতে দারুণ আগ্রহী। তবে এটাও সত্যি যে, দেশে শিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটদের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, সেভাবে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। পিএসসি-বিসিএসে প্রতি ব্যাচে ক্যাডার পদে প্রায় দুই থেকে আড়াই হাজার নিয়োগের সুপারিশ করছে। পাশাপাশি সমান সংখ্যক প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের সুপারিশ করা হচ্ছে। গত দশ বছরের নিয়োগ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, আমরা পর্যায়ক্রমে এ সংখ্যা বাড়ানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।

আগেকার সময়ের বিসিএসের চেয়ে এখনকার বিসিএসে বিষয়বস্তু, মানবণ্টন ও পরীক্ষা কাঠামোয় অনেক পরিবর্তন এসেছে। একসময় বিসিএসের ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতা ছিল। একটি বিসিএসে নিয়োগ হতে বছর তিনেক সময় লাগত। এখন তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষা হতো এবং বিসিএস শুরু হয় ১৯৮২ সাল থেকে। এরপর থেকে এবারেরটাসহ ৩৮টি বিসিএস সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। বলতে গেলে আমরা প্রতিবছরই একটা করে বিসিএস পেয়েছি। দেশের সবগুলো বিভাগে আমরা পরীক্ষা নিচ্ছি, এই আয়োজন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রতিবারই বিরাট কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হচ্ছে।

কর্মসংস্থানের হিসেবে আমাদের দেশে সরকারই সবচেয়ে বেশি কর্মচারী নিয়োগ করে। যেকোনো উন্নত দেশের জন্য সরকারি-বেসরকারি দুটো ক্ষেত্রই গুরুত্বপূর্ণ। মেধা, যোগ্যতা ও কাজের আগ্রহ ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়। অনেক ক্ষেত্রেই বেসরকারি চাকরিতে বেতন বেশি থাকায় আগ্রহী বেশি থাকে, তবে সাম্প্রতিককালে সরকারি চাকরির বেতন বৃদ্ধি হওয়াটা উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। সরকারি চাকরিতে বেতন ছাড়াও পেনশন, উচ্চশিক্ষার সুযোগসহ অন্যান্য যে সুবিধা আছে; তা অন্য কোথাও নেই।

দেশপ্রেম বেশি আমাদের তরুণদের মাঝে। কর্পোরেট সেক্টরে কম বয়সেই ভালো উপার্জন করার সুযোগ ছেড়েও আমাদের তরুণরা বিসিএসে আগ্রহী হওয়ার কারণ তাদের দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ। সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় লেখাপড়া করেছেন। তাছাড়া আমরা দেশের যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছি তার সবই জনগণের টাকায়। এই দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধ থেকে জনগণের সেবা করার জন্য বিসিএসে আগ্রহীর সংখ্যা বাড়ছে।
সবদেশ তো রক্ত দিয়ে স্বাধীন হয় না। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে রক্তের বিনিময়ে। এদেশ একটি পতাকা, একটি জাতীয় সংগীত অর্জন করেছে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। যারা এ দেশের প্রজাতন্ত্রের চাকরিজীবী হবেন, তাদের মধ্যে নিশ্চয়ই দেশমাতৃকার প্রতি অঙ্গীকার আছে।

এখন আমরা দেখি, সরকারি চাকরিতে মেধাবী তরুণদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ অনেক বেড়েছে। এখন বিদেশে মাস্টার্স, ডিপ্লোমা বা বিভিন্ন কোর্স করার সুযোগ পান বিসিএসের বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তারা। সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক করেছে, যেখানে বিসিএস কর্মকর্তারা উচ্চশিক্ষার জন্য যাচ্ছেন।

বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট রোডম্যাপ হাতে নিয়ে সে অনুযায়ী পরীক্ষা গ্রহণ করছে এবং এতে সময়ের সাশ্রয় হচ্ছে। বর্তমানে বিসিএসে ২৭টি ক্যাডার। এদের মধ্যে সাব-ক্যাডার আছে। সবমিলিয়ে সময়ের প্রয়োজনে একটা ধারাবাহিক পরিবর্তন চলছে। গুণগত মানেও পরিবর্তন আসছে। এবারের বিসিএসেও আমরা সর্বোচ্চ সংখ্যক নিয়োগের ব্যাপারে আশাবাদী, যারা ক্যাডার পদ পাবে না, তাদেরকে নন-ক্যাডারে নিয়োগ দেওয়া হবে। এ লক্ষ্যে আমরা সরকারের সব শূন্যপদের খোঁজ নিচ্ছি। বিসিএস পরীক্ষায় অনেকগুলো সেটে প্রশ্ন করা হয়। সবগুলো সেটই কেন্দ্রগুলোতে পাঠানো হয়, কেবল পরীক্ষা শুরুর পূর্বমুহূর্তে লটারির মাধ্যমে সেট নির্বাচন করা হয়। তাছাড়া অনলাইনে আবেদনের ব্যবস্থা করা, বিজ্ঞপ্তি, ফলাফল ও অন্যান্য তথ্য প্রকাশ করায় গতিশীলতা বেড়েছে। পরীক্ষার্থীরা এসএমএসের মাধ্যমে পরীক্ষাসংক্রান্ত তথ্য পাচ্ছেন। এভাবে বিভিন্ন পদ্ধতিতে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। এবার থেকে লিখিত পরীক্ষায় বাংলাদেশ বিষয়াবলিতে ২০০ নম্বরের মধ্যে ৫০ নম্বর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে প্রশ্ন থাকবে। প্রত্যেকটি উত্তরপত্র মূল্যায়ন করবেন দুজন পরীক্ষক। বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভার্সনে পরীক্ষা দেওয়া যাবে।
আমরা বিশ্বাস করি, বিসিএসে তারাই ভালো করেন, যারা নিজের ও নিজের দেশের বিষয়াবলি, আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহ ও সম্যক বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান রাখেন, পাশাপাশি ক্রীড়া, সংস্কৃতি, শিল্প-সাহিত্য এবং উন্নয়ন ভাবনার সম্পর্কে ধারণা রাখেন।

বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ। এ পর্যায়ে আসতে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। দেশের দারিদ্র্য দূরীকরণ ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। এই সময় যারা সিভিল সার্ভিসে যোগদান করছেন, তাদেরকে সততাও দক্ষতার সঙ্গে নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করতে হবে, কারণ তাদের কাছে জাতির প্রত্যাশা অনেক।

  • ১৭ জুলাই ২০১৭ তারিখে দৈনিক ইত্তেফাকের প্রজন্ম পাতায় প্রকাশিত
    লিখেছেন সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার
শেয়ার করুন