বদলে যাচ্ছে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের দৃশ্যপট

আশিস রহমান: বদলে যাচ্ছে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের দৃশ্যপট। পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে জেলার উচ্চা শিক্ষাগ্রহণের সর্বোচ্চ এই বিদ্যাপীঠে। এর আগে শিক্ষক স্বল্পতা, নিয়মশৃঙ্খলার ব্যতয়, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষের অভাবসহ নানা সংকটে জর্জরিত ছিল প্রতিষ্ঠানটি। কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ছিল দায়িত্বহীনতার অভিযোগ, ফলে গণমাধ্যমের শিরোনামও  হয়েছে একাধিকবার। নবাগত অধ্যক্ষ অধ্যাপক নীলিমা চন্দ দায়িত্বগ্রহণের পর থেকে পাল্টে যেতে শুরু করেছে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের হালচাল।

১৯৪৪ সালের ১ জুলাই সুনামগঞ্জ কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। কলেজটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন আসামের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী স্যার সৈয়দ মুহম্মদ সাদউল্লা। প্রথমে বেসরকারি মিলনায়তন টাউন হলে এর কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৮০ সালের ৩ মার্চ কলেজটি জাতীয়করণ হয় সরকারি কলেজের মর্যাদা লাভ করে। এ কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সুনামগঞ্জ কলেজকে অনার্স কলেজে উন্নীত করার ঘোষণা করা হয়।  এরপর ২০০১ সালে বাংলা, দর্শন, ইতিহাস এবং হিসাববিজ্ঞান এ ৪ বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু হয়। ২০১৪ সালে অনার্সে যুক্ত হয় আরো ছয়টি বিষয়। এগুলো হল ইংরেজী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, ব্যবস্থাপনা, গণিত এবং উদ্ভিদবিজ্ঞান। সেসময়কার অধ্যক্ষ প্রফেসর মেজর ছয়ফুল কবির চৌধুরীর নেতৃত্বে কলেজ কর্তৃপক্ষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বাংলা, ইতিহাস, দর্শন, হিসাববিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে চালু হয় মাস্টার্সও। তবে অবকাঠামোগত সংকটের সমাধান হচ্ছিল না।

চলতি বছরের ২৬মে কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আব্দুস ছত্তারের আকস্মিক মৃত্যুতে অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়ে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ। স্থবিরতা দেখা দেয় প্রশাসনিক কার্যক্রমে। পরবর্তীতে গত ৭ জুন অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন অধ্যাপক নীলিমা চন্দ। ১৪শ বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের এই কর্মকর্তা এর আগেও সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেছেন বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে। মাঝে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজে কর্মরত ছিলেন। নীলিমা চন্দ অধ্যক্ষ পদে যোগ দেয়ার পর দৃঢ়তার সাথে কাজ শুরু করেন। প্রশাসনিক স্থবিরতা কাটিয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেন।

নীলিমা চন্দের প্রচেষ্টায় ইতোমধ্যেই শিক্ষকদের শূন্যপদ অনেকাংশে পূরণ হয়েছে। যোগ দিয়েছেন ১৩জন নতুন শিক্ষক। নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে সিসি ক্যামেরা, যার মাধ্যমে চলছে সার্বক্ষণিক নজরদারি। আর প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারের জন্য কেনা হয়েছে টয়োটা হাইএইস মডেলের মাইক্রোবাস। মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী শহীদ তালেব, গিয়াস, জগৎজ্যোতি ও আলী আসগর স্মরণে নতুন করে নির্মাণ করা হচ্ছে স্মৃতিফলক। আর ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ ঠেকাতে চালু করা হয়েছে ইউনিফর্ম। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল সুপেয় পানির ব্যবস্থা করার। ছাত্রছাত্রীদের জন্য স্থাপন করা হয়েছে পৃথক দু’টি ওয়াটার পিউরিফায়ার। আর লোডশেডিংয়ের সময় ছাত্রীনিবাসে আলো জ্বালাতে স্থাপন করা হয়েছে সোলার প্যানেল।

মাত্র চারমাসেই অধ্যক্ষ নীলিমা চন্দের নেয়া এসব পদক্ষেপ কলেজের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকসহ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে।

এসব ব্যাপারে অধ্যক্ষ অধ্যাপক নীলিমা চন্দ বলেন, ‘আমি আমার অবস্থান থেকে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের সার্বিক উন্নয়ন, সমস্যা ও সংকট নিরসনে সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি।’ তিনি জানান, এখনো পর্যন্ত কলেজের একাডেমিক ভবন ও শিক্ষক সংকট দূর হয়নি; ১০টি বিষয়ে অনার্স এবং ৪টি বিষয়ে মাস্টার্স চালু আছে, ভবিষ্যতে আরো ৬টি বিষয়ে মাস্টার্স এবং ৩টি বিষয়ে অনার্স চালু করার জন্য আবেদন করা হয়েছে। মাস্টার্স চালু হলে প্রতি বিভাগে ১২জন করে ও অনার্সের ক্ষেত্রে ৭জন করে শিক্ষক থাকতে হয়, কিন্তু এখানে আছে মাত্র ৪জন করে। অর্থাৎ সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ মার্স্টাস কলেজ হিসেবে উন্নীত হলেও এখনো পর্যন্ত ডিগ্রী কলেজের প্যাটার্নেই রয়ে গেছে। প্রধান সমস্যা শিক্ষক সংকট এবং শ্রেণিকক্ষ সংকট, এই দুই সংকট দূর হলে জেলার শিক্ষাব্যবস্থা অনেকদূর এগিয়ে যাবে।

 

সুনামগঞ্জমিরর/এআর

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *