নীল আর সবুজের টাঙ্গুয়ার হাওর

চোখ বন্ধ করে একটা সুন্দর দৃশ্য কল্পনা করুন। একটা ট্রলারে চড়ে টুকটুক করে আপনি যাচ্ছেন, দূরদিগন্তে নীল আকাশ, সেই নীল আকাশের প্রতিবিম্ব স্বচ্ছ পানিতে মিশে আকাশটা যেন পানিতেই মিলিয়ে যাচ্ছে। আরো দূরে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের সারি, আর পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণার পানি রোদ পড়ে চিকচিক করছে! আপনার সামনে পানিতে আধডোবা হয়ে থাকা অসংখ্য হিজল গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। হিজলের পাতাগুলো বাতাসের ঝাপটায় নড়ে উঠে আপনাকে যেন হাতছানি দিচ্ছে। হঠাৎ করে উড়ে গেল এক ঝাঁক পাখি। কিচিরমিচির আওয়াজে মনে হলো ওরা যেন নিজেদের মধ্যে উৎসব করছে! এবার একটু পানির দিকে তাকান, স্বচ্ছ পানির নিচে অজস্র জলজ গাছ ডুবে আছে, যেন একটা বাগান! একটা-দুটো ব্যাঙ লাফিয়ে লাফিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। কিছুটা ভেসে ওঠা ছোট মাছের একটা দল আপনাকে দেখে টুপ করে ডুব দিয়ে আড়ালে চলে গেল।

চারদিকে আপনার মতো আরো অনেকে এই দৃশ্য দেখছেন, কেউ মোবাইলের ক্যামেরায় ধারণ করে রাখছেন। কেউ আবার ঝাঁপ দিয়ে পানিতে নামছেন! নীল আর সবুজের এই সমারোহে মানুষ, পানি, গাছ, পাখি, মাছ, পাহাড় সবাই মিলেমিশে এক উৎসব শুরু হয়েছে!

প্রিয় পাঠক, আপনারা নিশ্চয়ই এতোক্ষণে বুঝতে পেরেছেন আমি কোন জায়গার কথা বলছি। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। টাঙ্গুয়ার হাওর! সুন্দরবনের পরে বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট, বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি। বিপুল জীববৈচিত্র্যের এক অনুপম সমাহার।

টাঙ্গুয়ার হাওরের অবস্থান মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে, সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর এবং ধর্মপাশা উপজেলায়। আগেই বলেছি, বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি। এর আয়তন হিসেব করলে প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার। বেশির ভাগই জলাভূমি। শীতকালে এই জলাভূমি শুকিয়ে উর্বর জমি হয়। তখন সেখানে ধান, শাকসবজি, রবিশস্য চাষ হয়। তাছাড়া, হাওরের বুকে চরের মতো জায়গা গো-চারণভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শুকনোর সময় হাওরে গেলে দেখতে পাবেন অসংখ্য গরু, ছাগল ঘাস খাচ্ছে, ছোট ছোট বাচ্চারা সেগুলোকে দেখভাল করছে। আরেকটা জিনিস চোখে পড়বে খুব বেশি, সেটা হলো হাঁসের খামার। যেহেতু জলাভূমির তীর হাঁস পালনের জন্য উপযুক্ত, তাই টাঙ্গুয়ার হাওরে রয়েছে অনেক হাঁসের খামার। একেকটা খামারে হাজার হাজার হাঁস থাকে, এরা ডিম এবং মাংসের চাহিদা মেটানোর জন্য অনেক বড় ভূমিকা পালন করে। হাওর পাড়ের মানুষের প্রধান পেশা হলো মাছ ধরা ও চাষবাস। ১৯৯৯ সালে টাঙ্গুয়ার হাওরকে ‘পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষনা দেওয়া হয়। এর আগে হাওর ইজারা দেওয়ার রেওয়াজ ছিলো। ধনী কোনো ব্যক্তি টাকার বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হাওর ইজারা নিতেন, রক্ষণাবেক্ষণ করতেন, মাছ শিকার করতেন। ২০০৩ সাল থেকে টাঙ্গুয়ার হাওর জেলা প্রশাসনের অধীনে নেয়া হয়। তখন থেকে এখানে মাছ ধরা, পাখি শিকার বা গাছ কাটা নিষিদ্ধ। তবে আড়ালে-আবডালে জীবিকার তাগিদে, বা কারোর অর্থের লোভে হয়তো  কোনোটাই থেমে থাকেনা।

টাঙ্গুয়ার হাওর অপার সৌন্দর্যের পাশাপশি প্রাকৃতিক সম্পদের এক অঢেল ভান্ডার। প্রতি বছর বিভিন্ন দেশ থেকে পরিযায়ী পাখি এখানে আসে। সংখ্যাটা নেহায়েৎ কম নয়, প্রায় বিশ লক্ষের কাছাকাছি। রয়েছে প্রায় ১৫০ প্রজাতির মাছ, দু’শ প্রজাতির পাখি, ১২ প্রজাতির ব্যাঙ, সরীসৃপ, কচ্ছপ, এবং সারি সারি হিজল, করচ গাছ। পানির নিচে রয়েছে শালুক, পানিফল, বনতুলসী গাছ। নির্দিষ্ট ঋতুতে শাপলা ফুল ফুটে হাওরকে নতুন করে সাজায়। শীতকালে হাওর হাজার হাজার পাখির কলকাকলিতে মুখরিত থাকে। পানকৌড়ি, বালিহাঁস, ডাহুক, গাঙচিল, শকুন প্রভৃতি পাখি সহজেই চোখে পড়ে।

টাঙ্গুয়ার হাওর একটু প্রত্যন্ত এলাকায় হওয়ায় এখানে এক সময় খুব বেশি পর্যটক আসতেন না।কিন্তু সময়ের সাথে রাস্তাঘাট উন্নত হয়েছে, পর্যটকদের কথা ভেবে থাকার জায়গা, নৌকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ফলে দিন দিন সবার আগ্রহের কেন্দ্র চলে আসছে টাঙ্গুয়ার হাওর।

যেভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে কেউ হাওর দেখতে যেতে চাইলে সুনামগঞ্জ হয়ে যেতে হবে। গাবতলী বা সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে সুনামগঞ্জের বাস আছে। শ্যামলী, মামুন, হানিফ, বিআরটিসি সব বাসই পাবেন। ভাড়া নেবে ৫৫০ টাকা। সময় লাগবে প্রায় নয়-দশ ঘন্টা। বাস আপনাকে সুনামগঞ্জ সদরে নামিয়ে দেবে। সেখান থেকে সিএনজি বা মোটরসাইকেলে তাহিরপুর যেতে হবে। মোটরসাইকেলে ভাড়া জনপ্রতি ১০০ টাকা। পরিবার নিয়ে আসলে সিএনজি দিয়ে যেতে পারেন। রিজার্ভ নিলে ৪০০-৫০০ টাকা নেবে। সময় লাগবে এক ঘন্টার একটু বেশি। তাহিরপুর যাওয়ার পথে যে জায়গা ভালো লাগবে, সেখানেই গাড়ি থামিয়ে ছবি তুলতে পারেন। খুব সুন্দর জায়গা এবং খুব সুন্দর ছবি আসবে।
মোটরসাইকেল আপনাকে তাহিরপুর বাজারে নামিয়ে দেবে। সেখান থেকে নৌকা ভাড়া করে টাঙ্গুয়ার হাওরে যেতে হবে। নৌকাভেদে দাম নেবে। তবে ভালো আকারের ট্রলার ২০০০-৩০০০ টাকা নেবে। রাতে থাকতে গেলে দামটা একটু বেশি নেবে। ৪০০০-৬০০০ নিতে পারে নৌকাভেদে। এক নৌকায় মোটামুটি ১৮-২০ জন যেতে পারবেন। যেহেতু নৌকায় অনেকক্ষণ থাকতে হবে, তাই নৌকা ঠিক করার আগে সবকিছু দেখে নেবেন। লাইফ জ্যাকেট আছে কিনা, বিশ্রাম নেওয়ার ব্যবস্থা আছে কিনা, রাতে থাকলে বাথরুম এবং রান্নার ব্যবস্থা আছে কিনা সব দেখে নেবেন। সাথে শুকনা খাবার, সানগ্লাস, পানিতে নামার জন্য কাপড় চোপড় নিতে পারেন। রাতে থাকার ইচ্ছা থাকলে খাবার দাবার, এমনকি স্থানীয় কোনো শিল্পীকেও নিতে পারেন আপনাদের সাথে!

তাহিরপুর থেকে নৌকায় দু ঘন্টা লাগবে টাঙ্গুয়ার হাওরে যেতে। সেখানে ওয়াচ টাওয়ার আছে। অবশ্যই ওয়াচ টাওয়ারের উঠে চারদিক দেখে আসবেন,খুবই ভালো লাগবে। রাতে থাকলে অবশ্যই পাড়ের কাছে নৌকা রাখবেন, লাইফ জ্যাকেট টর্চ লাইট সাথে রাখবেন। হাওরের পানি খুবই স্বচ্ছ ও পরিষ্কার, তাই ইচ্ছা হলে গোসল করতে পারেন। ছোট ছোট ডিঙি নৌকা নিয়ে ছোট ছোট বাচ্চারা আপনাকে ডাকবে। পানিতে নামলে তারাই ছবি তুলে দেবে। ও হ্যাঁ, আপনি যদি চা প্রেমিক হোন, তবে পানিতে ভেসে ভেসে এক কাপ লেবু চা খাওয়াটা কিন্তু মিস করবেন না!
কয়েকটা বিষয়ে একটু সতর্ক থাকবেন দয়া করে। পানিতে প্লাস্টিকের জিনিসপত্র ফেলবেন না, পাখি শিকার বা তাদেরকে বিরক্ত করার মতো কোনো কাজ না করবেন না। সাঁতার জানলেও অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট সাথে নিন, বাচ্চাদেরকে সাবধানে রাখুন। বর্ষাকাল টাঙ্গুয়ার হাওরে যাওয়ার ভালো সময়, কিন্তু শীতেও যেতে পারেন। অতিথি পাখি দেখতে পারবেন, কুয়াশা পড়ার দৃশ্য দেখতে পারবেন।
ফিরে আসার পথে মোটরসাইকেলে নীলাদ্রী, শিমুল বাগানে, বারিক্কা টিলা, যাদুকাটা নদী দেখে আসতে পারেন। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, মুগ্ধ হবেন নিশ্চিত।

টাঙ্গুয়ার হাওর এমন একটা জায়গা, যেখানে একবার আসলে বারবার আসতে ইচ্ছা হবে।
তাহলে বন্ধুরা, লকডাউনে বসে প্ল্যান করতে থাকুন, আর করোনার এই পরিস্থিতি কেটে গেলে ব্যাগ গুছিয়ে চলে আসুন!

  • মো. মুয়াজ্জাজুর রহমান মুয়াজ
    বিভাগীয় সম্পাদক, সুনামগঞ্জ মিরর
শেয়ার করুন