ভাষার মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান পরিবার, স্বজন ও পরিচিতজনরা

মাত্র ৩৪ বছর বয়সে মহামারী করোনাভাইরাসের ভয়াল থাবায় প্রাণ হারালেন সুপ্রিম কোর্টের তরুণ আইনজীবী ও সুনামগঞ্জের মেয়ে অ্যাডভোকেট কানিজ রেহনুমা রব্বানী ভাষা। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সরব উপস্থিতি, হাসিমাখা মুখ আর দারুণ বন্ধুবৎসল আচরণে সবাইকে মুগ্ধ করে রাখা ভাষা রেহনুমার আকস্মিক মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছেন স্বজন, পরিচিতজন ও সুনামগঞ্জের মানুষ।

বুধবার (১৪ জুলাই) ভোর সাড়ে ৪টায় সিলেটের মাউন্ট অ্যাডোরা হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন। বাদ জোহর দক্ষিণ সুনামগঞ্জের উজানীগাঁও জামে মসজিদে জানাজার নামাজ শেষে তাঁকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

দক্ষিণ সুনামগঞ্জের উজানীগাঁও জামে মসজিদে জানাজার নামাজ

ভাষার বাবা সুনামগঞ্জের কিংবদন্তী ছাত্রনেতা, সাংবাদিক ও জেলা আওয়ামীলীগের একসময়কার সহসভাপতি প্রয়াত গোলাম রব্বানী। মা অ্যাডভোকেট শামসুন্নাহার বেগম শাহানা রব্বানী সুনামগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বর্তমান পিপি ও সংরক্ষিত আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। ঐতিহ্যবাহী এই পরিবারটি রাজনীতি ও সংস্কৃতিচর্চার সাথে ওতপ্রেতভাবে জড়িয়ে আছে। ভাষার নানা সুনামগঞ্জের শহীদ বুদ্ধিজীবী সুনাওর আলী। খালা জেসমিন আরা বেগম জেলার প্রথম নারী আইনজীবী ও বাংলাদেশের প্রথম নারী সলিসিটর। আরেক খালা ফৌজিআরা শাম্মী জেলা পরিষদের সদস্য। মামা অ্যাডভোকেট শামসুল আবেদীন জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক। ভাষার ভাই ফজলে রাব্বী স্মরণ সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও বর্তমানে কেন্দ্রীয় যুবলীগের উপ-সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

কিছুদিন আগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন ভাষা রেহনুমা। পরে অবস্থার অবনতি ঘটলে তাঁকে হাসপাতালের আইসিইউ-তে ভর্তি করা হয়। তিনি সন্তানসম্ভবা ছিলেন বলে জানা গেছে। স্ত্রীকে হারিয়ে ভেঙ্গে পড়েছেন ভাষার স্বামী মৌলভীবাজারের বড়লেখার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার মুদাচ্ছির বিন আলী।

অ্যাডভোকেট কানিজ রেহনুমা রব্বানী ভাষা ঢাকাস্থ সুনামগঞ্জ সমিতি ঢাকার সাধারণ সম্পাদক ও সুনামগঞ্জ জেলা মহিলা আওয়ামীলীগের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। আইনপেশা চর্চার পাশাপাশি জড়িত ছিলেন বহু সংগঠনের সঙ্গে। সবার সঙ্গে যোগাযোগ, যে কারোর প্রয়োজনে এগিয়ে আসা-সহ নানা কারণেই মানুষ তাঁকে ভালোবাসতেন। সুনামগঞ্জ শহর ও শহরের বাইরে থাকা সুনামগঞ্জের বাসিন্দাদের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয় ছিলেন।

ভাষার অকাল মৃত্যুতে সুনামগঞ্জসহ সিলেটের আওয়ামী পরিবারে শোকের ছায়া বইছে। সামাজিক মাধ্যমে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা শোক জানাচ্ছেন। এছাড়া রাজনীতিবিদ, আইনজীবী, সামাজিক সংগঠক, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিকসক সুনামগঞ্জের অসংখ্য মানুষ দিনভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শোক প্রকাশ করেছেন।

সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ লিখেছেন, ভাষার সাথে সবার ভাল সম্পর্ক ছিল। খুব মায়া করে মামা বলে ডাক দিত। প্রশাসন ক্যাডারের স্বামীকে নিয়ে তার দাম্পত্য জীবন সুখের ছিল, আনন্দের ছিল। ঢাকায় থাকতে কতদিন তার বাসায় খাবারের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। যাওয়া হয়নি। আর হবেও না। করোনা আক্রান্ত হবার আগে সে সন্তানসম্ভবা ছিল। হয়তো অনাগত সন্তানকে নিয়েও অনেক স্বপ্ন ছিল। করোনায় সব শেষ। রাজনীতি, সামাজিক সংগঠন সর্বত্র সরব পদচারণা ছিল তার। ছিল উজ্জল ভবিষ্যৎ। সুন্দর আগামীর জন্য মেধা, পরিশ্রম, সবই ছিল।ভাষা সফল হতো, বেঁচে থাকলে ভাল কিছু করত। কয়েকদিন ধরে হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিরব ছিল। তারপর শুনি সে করোনায় আক্রান্ত। শাহানা আপার সাথে কথা বলি। আপা শুধু কাঁদেন, কথা বলতে পারেন না। লাকি আপা ফোনে বললেন ভাষার অবস্থা বেশী ভালনা। স্মরণ শুধু বলে দোয়া করবেন মামা। … ছোট শহরের সামাজিক বন্ধনে সবার আদরের ভাষা বড় অকালে চলে গেল। কিছু মৃত্যু খুব ভারী, ভাষার মৃত্যুও তাই। অকাল প্রয়াত স্নেহের ভাষাকে আল্লাহ জান্নাত দান করুন। তাঁর পরিবারকে এই কঠিন শোক সহ্য করার শক্তি দান করুন।”

সাংবাদিক উজ্জ্বল মেহেদী লিখেছেন, লিখতে পারছি না, সইতেও পারছি না! হাত কাঁপছে! গত ৩০ জুন আমার জন্মদিন নিয়ে পরদিন একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়েছিল ভাষা। আমাকে ট্যাগ করায় সহজে চোখে পড়ে। আমি লেখা পড়ে এতটা আপ্লুত ছিলাম যে, তাকে আর ফোন করতে পারিনি। সেই লেখায় অনেক মন্তব্য। আমিও শেয়ার করি, আমার প্রতিক্রিয়াসমেত। লেখাটি কথাসাহিত্যিক আকমল হোসেন নিপু, রম্যলেখক মাহবুবুল আলম কবীরকেও স্পর্শ করে। নিপুভাই ফোন করে জানতে চান। ভাষা ও তার আশপাশ নিয়ে বলি। তিনিও মুগ্ধ হন। ভাষা এই বর্ষায় সবাই মিলে আড্ডা দিতে চেয়েছিল। করোনা আক্রান্ত হয়েও চৈতন্য প্রকাশনার কর্ণধার রাজীব চৌধুরীর কাছে ফোন করে সেই সব আকুতিভরা কথা বলেছিল। ইচ্ছে ছিল, করোনা কাটলে একদিন বাসায় গিয়ে জমাট আড্ডা দেব। আজ ফোন করে ঘুম ভাঙাল নিয়ামুল ইসলাম খান। খবরটা জানানোর পর বিমূঢ় আমি; নাটাই হাতে পড়ে রইল, ইচ্ছের ঘুড়িটা কাটা পড়ল!”

বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের সদস্য কাজী সায়েমুজ্জামান লিখেছেন, “পহেলা জুলাই জানিয়েছিলো খুব জ্বর৷ বলেছিলাম, টেস্ট করাতে৷ এরপর আমার ব্যস্ততায় আর কথা হয়নি৷ ওর সাথে পরিচয় হয়েছিল বারো বছরেরও বেশি সময় আগে। তখন ছোট ছিল৷ মজা করে ভাসা বেগম ডাকতাম৷ পরিচয়ের সূত্রটা ছিল তার বাবাও সাংবাদিক ছিলেন৷ আমিও তখন সাংবাদিক ছিলাম৷ এরপর বলতে গেলে ভাষা আমার মেনটর হয়ে যায়৷ কোন কাজ করার আগে তার কাছ থেকে পরামর্শ নিতাম৷ অনেক উপকৃত হয়েছি৷ আমার মেনটর আজ চলে গেলো৷”

ভাষার মৃত্যুতে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশের স্ত্রী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট নাহিদ সুলতানা যুথি। তিনি লিখেছেন, “কীভাবে কী লিখব, কী বলব কিছুই বুঝতে পারছি না। … তুমি নাই…। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। বেশি কঠিন কোনো কিছুতে মাথা কাজ করে না। তাই ভাবতেও পারছি না। ভাষা, কী বলব তোমাকে জানিনা, তুমি কি ভালো থাকবে একা একা? আল্লাহ এ পৃথিবী বাসযোগ্য করে দাও মানবকূলের জন্য, আমাদের না বুঝা পাপের প্রায়শ্চিত্ত অনেক তো হলো, আর কত? মৃত্যুর বোঝা ভারি হতে হতে আর বহনযোগ্য হচ্ছে না। স্বাভাবিক মৃত্যুই মানতে পারি না, আর এ কেমন…!”

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারপ্রাপ্ত গীতিকার সেজুল হোসেন লিখেছেন, “ঘুম থেকে উঠে শুনি ‘ভাষা’ আর নেই। ভাষা রেহনুমার এই না থাকার খবরে স্তব্ধ, বাকরুদ্ধ। বুকের ভিতরে শীতল একটা বেদনার স্রোত বইছে। এই খবরের জন্য মন কোনওভাবেই প্রস্তুত ছিলো না। এতো মায়ার মানুষ, আপন মানুষ কম দেখেছি। তাঁর মা শাহানা আপা বড় বোনের মতো, অভিভাবক আমাদের। আমার খুব প্রিয় ভাগ্নী ভাষার জন্য গভীর কান্না। প্রার্থনা।”

সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক সংগঠক তুলিকা ঘোষ চৌধুরী লিখেছেন, “বয়স যখন তার চার বা পাঁচ হবে, তখন আমার কাছে নাচ শিখতো, একদম পুতুল একটা মেয়ে, গোল গোল হাত পা, সাদা ধবেধবে। তার প্রথম শেখা নাচ, প্রয়াত সাব্বির আহমেদ সোহেল ভাইয়ের লেখা ও সুর করা গান ‘গাঁয়ের পথে টুকটুকে বউ জল ভরিতে যায়’ কী যে ভালো নাচতো, চোখ মুখের ভাষাই ছিলো অন্যরকম! একবার আদর্শ শিশু শিক্ষা নিকেতন থেকে বাৎসরিক সাংস্কৃতিক আয়োজনে প্রয়াত অঞ্জলি মাসীমা আয়োজন করলেন ‘তুষার কন্যা’ নাটকটি, ভাষার বয়স ছিলো পাঁচ কিংবা ছয়, সে তুষার কন্যার ভূমিকায় অভিনয় করলো। কী যে প্রাণবন্ত অভিনয় শৈলী তার! দর্শক মোহিত ছিলো ভাষার অভিনয়ে। … আমার মিঠা মেয়েটাকে ভয়ঙ্কর করোনা কেড়ে নিলো!”

আদরের বড় মেয়ের মৃত্যুর আকস্মিকতায় শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন মা শাহানা রব্বানী। মায়ের কান্না যেন থামছেই না। ভাই স্মরণ, ছোটবোন ডা. কনিজ কথা, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্খীসহ পুরো সুনামগঞ্জ শহরের মানুষই যেন নীরবে কাঁদছেন। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা জানান, ভাষার মায়ের কথা চিন্তাই করা যাচ্ছেনা। সন্তান হারানোর শোক তিনি কেমন করে সইবেন!

করোনার থাবায় গত কয়েকদিন ধরে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে যেন আর কোনো প্রিয়জনকে এভাবে অকালে হারাতে না হয়, সেজন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাসহ সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করার কথা বলছেন অনেকে।

সুনামগঞ্জ মিরর/তাওসিফ মোনাওয়ার/টিএম

x