Skip to content

মাঝে মাঝে মনে হয় করোনার নমুনা সংগ্রহ করতে করতেই মারা যাব

গতকাল সন্ধ্যায় ৩০-৩২ জন রোগীর করোনা সন্দেহে নমুনা সংগ্রহ ও কোভিড এন্টিজেন পরীক্ষা করে ঠিক রাত বারোটায় হাসপাতাল থেকে বের হই। এমন জনমানবহীন রাস্তা, রিকশা তো দূরের কথা একটা কুকুরও চোখে পড়েনি। রাত্রিবেলা, একটু ভয়ও লাগছিল। প্রায় দেড় ঘন্টা হাঁটার পর বাসায় পৌঁছি। এমন বেখেয়ালি ছিলাম কখন যে পায়ে ফোস্কা পড়েছে টেরও পাইনি। বাসার পৌঁছাবার পর বুঝতে পেরেছি পায়ের তলায় খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। লকডাউন সময়ে না হেঁটেও উপায় নেই। তা ছাড়া যাতায়াতের জন্য অফিসিয়ালভাবেও ব্যবস্থা করা হয়নি। তবে কোভিড-১৯ নমুনা সংগ্রহ ও এন্টিজেন পরীক্ষার জন্য ভাতা প্রদান করা হবে এমন আশ্বাস অফিস থেকে দেওয়া হয়। তারপরও কথা থেকেই যায়, আসা-যাওয়াতে যদি শান্তি না পাওয়া যায় কাজ করে কি তৃপ্তি মিলে?

কী যে দুঃসময় যাচ্ছে আমাদের! নাহ আমাদের নয়, দুঃসময় যাচ্ছে আমার, আমার মতো যারা নমুনা সংগ্রহ করছেন তাদের! কারণ যেদিন থেকে কেভিড-১৯ নমুনা সংগ্রহ করা শুরু করি, সেদিন থেকে শুরু হয় জীবনের নতুন এক অধ্যায়, নতুন এক যুদ্ধ। এ যুদ্ধে বেঁচে থাকব না মরে যাব, সেটা সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন। মাঝে মাঝে মনে হয় কোভিড-১৯ এর নমুনা সংগ্রহ করতে করতেই মারা যাব একদিন।

যখন নমুনা সংগ্রহ করতে যেয়ে পিপিই (পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইক্যুইপমেন্ট) পরি, প্রচণ্ড গরমে ঘেমে শার্ট-প্যান্টসহ যা-কিছু আছে সব ভিজে যায়। নমুনা সংগ্রহের প্রতিটি মুহূর্ত মনে হয় নরকের মতো, যদিও কখনও নরক দেখিনি। আর যে জায়গায় নমুনা সংগ্রহ করি, সেখানে একটা ফ্যান পর্যন্ত নেই। গরমে ঘামে শরীর ভেজে শরীর থেকে যে পরিমাণ জল ঝরে তা যদি বুঝানো যেত, সবাই একটু অন্য চোখেই দেখত। শরীর থেকে অতিরিক্ত ঘাম ঝরায় পানিশূন্যতা দেখা দেয়, জিহ্বা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়। তবু মুখ থেকে মাক্স খোলা যাবে না, পানি খাওয়া যাবে না। আর পানি খেলে তো পকেটের টাকা দিয়ে কিনেই খেতেই হয়। অবশ্য এ সময় পানি খাওয়া খুবই বিপজ্জনক, কোভিড-১৯ বীরদর্পে আশেপাশে ঘুরাফেরা করছে। তাই গলনালি শুকিয়ে মারা গেলেও পানি খাওয়া যাবে না।

এসব আমাদের প্রতিদিনের গল্প, যারা নমুনা সংগ্রহ করে যাচ্ছি। তা ছাড়া সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় নমুনা সংগ্রহের সময় রোগীদের মুখ থেকে এমন দুর্গন্ধ আসে যা মাঝেমধ্যে সহ্য করার মতো নয়। মুখে দুর্গন্ধ প্রমাণ করে আমাদের দেশীয় লোকেদের মধ্যে নিয়মিত দাঁত মাজার অভ্যাস এখনও গড়ে ওঠেনি।

করোনাকালীন এই যাতনার কারণে মাঝেমধ্যে মনে হয় চাকুরিটা ছেড়ে দিই। পরে ভাবি চাকুরি ছেড়ে দিলে জীবন চলবে কী করে, তাছাড়া যে কাজ করছি সেটা তো মানবিক কাজ, শুনেছি মানবিক কাজে সৃষ্টিকর্তা খুশি হন। মানবিক কাজে আমিও খুশি হই। এছাড়া কী আর বলি, নমুনা সংগ্রহের স্থানটি প্রতিদিনই নোংরা হয় নমুনা সংগ্রহ করতে যেয়ে। কিন্তু পরিস্কার করার কথা প্রতিদিন বলতে হয়। ঝাড়ুদার দশ পনেরো দিন পর পর একবার ঝাড়ু দিবে। এই পরিছন্নতা নিয়ে রোগীদের কাছ থেকে অনেকদিন বকাঝকাও শুনেছি।

পরিশেষে কথা একটাই, আসুন আমরা সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি, লকডাউন সময়ে ঘরে থাকি। স্বাস্থ্যবিধি মানলে তবেই কোভিড-১৯ এর প্রকোপ থেকে মুক্তি পাব।



শেখ একেএম জাকারিয়া
মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতাল

x