জাউয়াবাজারে বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা, দুর্ভোগ

সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের এক অংশে জেলার ছাতক উপজেলাধীন বৃহত্তম জাউয়াবাজার অবস্থিত। যুগ যুগ ধরে ঐতিহ্য আর প্রসিদ্ধতা থাকায় জেলার মানুষের দৈনন্দিন নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ও পণ্য কেনাবেচার চাহিদা পূরণের অন্যতম ভরসাস্থল এই বাজার। ফলে প্রতিদিনই বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটে এই বাজারে।

জানা যায়, সরকার প্রতিবছর জাউয়া বাজার ইজারা দিয়ে দেড় কোটি টাকা নিলেও বাজার অব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ সংকট, অপ্রতুল স্যানিটেশনসহ নানান জটিলতা দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। ফলে বাজারে আসা সাধারণ ক্রেতা-বিক্রেতাসহ সবধরনের মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। 

একটু বৃষ্টি হলেই এইধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে মশা। ছবি: পীর জুবায়ের, সুনামগঞ্জ মিরর

সরেজমিনে দেখা যায়, বাজারের গরুর হাটে জমে আছে ময়লা দুর্গন্ধযুক্ত পনি। চতুর্দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আবর্জনা। ড্রেনে পানি জমে জলবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সেখানে ডেঙ্গু মশাসহ নানারকম বিষাক্ত কীটপতঙ্গের বসবাসস্থল তৈরি হয়েছে।

এদিকে করোনা মহামারীর মাঝেও সম্প্রতি দেশে নতুন করে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। করোনা রোগীর পাশাপাশি শহর কিংবা গ্রাম—সবজায়গায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছে অনেকে। বৃষ্টি বা অন্য কোনো কারণে বদ্ধ জায়গায় জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে এডিস বা ডেঙ্গু মশা, যার ফলে ঝাঁকেঝাঁকে মশা উৎপন্ন হয়। আর এই মশার কামড়ে মারাত্মক অসুস্থতার পাশাপাশি মৃত্যু ঝুঁকিও থাকে।

সুনামগঞ্জের জাউয়াবাজারে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার ফলে যেমনি ডেঙ্গু ছড়ানোর আশঙ্কা করছেন অনেকে, তেমনি নারী, শিশু ও বয়স্কদের এখানে এলেই পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ। সর্বোপরি, জমে থাকা ময়লা-আবর্জনায় ব্যাঘাত ঘটছে বাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রমে। আর তাছাড়া মূল সড়কটি আরসিসি হওয়ায় অনেক ক্ষুদ্র-ব্যবসায়ীরাই কাঁদাপানি এড়াতে তাদের ভ্রাম্যমাণ দোকান নিয়ে সড়কে উঠে আসেন। এতে সৃষ্টি হয় যানজট।

জেলার অন্যতম বৃহত্তম বাজার হবার পরও এই বাজারের আনাচে-কানাচে এইধরনের নোংরা-আবর্জনার দেখা মেলে। ছবি: পীর জুবায়ের, সুনামগঞ্জ মিরর

বাজারের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখা যায়, অনেক দোকানীরাই দোকানের সামনে হাঁটাচলার পথের এক পাশে ময়লার স্তূপ জমিয়ে রাখেন। সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বালাই তো নেই-ই, নেই কোনো গণশৌচাগার। আর দোকানকোঠার ফাঁকে খোলা আকাশের নিচে মূত্র ত্যাগ করার সৃষ্টি হচ্ছে দুর্গন্ধযুক্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। আর যথাযথ ব্যবস্থাপনায় ড্রেন না থাকার কারণে প্রায়ই পানি উপচে রাস্তায় চলে আসে।

জাউয়াবাজারের নতুন সেতুটির অ্যাপ্রোচ সড়কের পাশের অংশে, যেটিতে পুরাতন বেইলি ব্রিজ সংযুক্ত ছিল, সেই অংশের অবস্থা বেশি নাজুক বলে চোখে পড়ে।

দোকানের সামনের দীর্ঘদিনের আবর্জনার স্তূপ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বালাই নেই। ছবি: পীর জুবায়ের, সুনামগঞ্জ মিরর

ব্যবসায়ী আব্দুল আলিম জানান, আমি অস্থায়ী সবজি ব্যবসায়ী। প্রতি বাজারবারে এখানে আসি পণ্য বিক্রি করতে। কিন্তু যেখানে বসি সেখানে অপরিষ্কার থাকার কারণে ভয় হয় কখন যেন কোন অসুখে আক্রান্ত হই! সমির আলী নামের এক গরু ব্যবসায়ী জানান, গরু বিক্রি করতে প্রতি বাজারবারে এখানে আসি। কিন্তু এসব দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা পানির উপর দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এতে পা চুলকায়। আর জলাবদ্ধতার কারণে মশা তৈরি হওয়ায় মশা কামড়ায়, এতে ডেঙ্গুর ভয় পাই।

বাজারের ব্যবস্থাপকদের একটি সূত্র জানায়, প্রতিবছর যে পরিমাণ টাকায় বাজার ইজারা দেয়া হয় তা থেকে ১৫ শতাংশ বাজার সংস্কারের জন্য এবং ২ শতাংশ পরিচ্ছন্নতার ব্যায়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। বাজারের ইজারা থেকে সংস্কারের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা বাজার উন্নয়নের জন্য খরচ করা হলেও বিগত তিন বছরের ইজারা থেকে বরাদ্দকৃত টাকা বাজারের কোনো সংস্কারে ব্যবহার হচ্ছে না।

গণশৌচাগারগুলো ব্যবহারের অযোগ্য। ছবি: পীর জুবায়ের, সুনামগঞ্জ মিরর

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দেড় কোটি টাকায় বাজার ইজারার যে পরিমাণ টাকা সংস্কারের জন্য বরাদ্দ রয়েছে তা বাজারের উন্নয়নের স্বার্থে খরচ করা হচ্ছে না। যার ফলে বাজার অব্যবস্থাপনা, অপরিচ্ছন্নতাসহ নানান সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।

জাউয়াবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আছাদুর রহমান জানান, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সংকট থাকায় বৃষ্টি হলে বাজারের প্রতিটি গলিতে পানি জমে যায়। যার ফলে ময়লা পানিতে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়। এখানে স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে ব্যবসাবাণিজ্য পরিচালনা করতে হচ্ছে। তিনি আরও জানান, ব্যবসায়ীদের কথা চিন্তা করে বাজারে অনেক উন্নয়নের প্রয়োজন। বাজারের ভেতর মাত্র ২টি শৌচাগার, তাতেও একটি ব্যবহারের অনুপোযোগী আর অন্যটিও পানির সংকটের কারণে অকেজো।

জাউয়া বাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জানায়, ইজারা থেকে বাজারের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা থেকে বাজারের ভেতরে ইউনিয়ন পরিষদের সমন্বয়ে একটি স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নির্মাণসহ কিছু উন্নয়ন কাজ করা হয়েছে। নির্মাণ করা শৌচাগারে যদি পানি সংকট থাকে তাহলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। 

ইজারাদার শাহীন তালুকদার বলেন, আমরা সবসময় চেষ্টা করি বাজার পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার। আগামী সাপ্তাহখানেকের মধ্যে বালু ও মাটি ফেলে জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসন ও ড্রেনের পানি আটকে থাকার সমস্যার সমাধান করবো।

ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মামুনুর রহমান বলেন, বর্তমানে ডেঙ্গুর বিস্তার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবদ্ধতার কারণে যেন ডেঙ্গু না ছড়ায় সেদিকে খেয়াল রেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রশাসনের পাশাপাশি সকলকেই এ ব্যাপারে সচেতন ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান তিনি।

  • পীর জুবায়ের, সহকারী বার্তা সম্পাদক, সুনামগঞ্জ মিরর

সুনামগঞ্জমিরর/জুবায়ের/টিএম

x