Skip to content

দৃষ্টিনন্দন গৌরারং জমিদার বাড়ি

আঠারো শতকের শুরুর দিকে জমিদারি প্রথা চালু হয়। আর তখন ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন এলাকাজুড়ে একেক সময় একেক জন জমিদার রাজত্ব করেন। তখনকার সময় জমিদাররা ব্রিটিশদের কাছ থেকে জমিদারি ক্রয় করে প্রজাদের উপর শাসন করতেন। আর শাসন কাজ পরিচালনা করার জন্য যে বাড়ি বা মহল ব্যবহার করতেন তা সবার কাছে জমিদার বাড়ি হিসাবে পরিচিত হতো। সেইসময়ের জমিদাররা ছিলেন অনেক টাকা পয়সার মালিক তাই তারা তাদের জমিদার বাড়িগুলো অনেক সুন্দর করে সাজাতেন। নানানরকম নকশা আর আল্পনা করা থাকতো বাড়িগুলোতে। দেয়ালগুলোতে থাকতো নানা ধরনের সাজসজ্জা। আর বর্তমানে কালের পরিবর্তনে এইসব জমিদারি শেষ হওয়ার ফলে জমিদার বাড়িগুলো খালি হয়ে পড়ে আছে। অনেক জমিদার বাড়ি হয়েছে ইতিহাস-ঐতিহ্যের নিদর্শন। আর অনেক জমিদার বাড়ি সঠিক পরিচর্যার অভাবে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

গৌরারং জমিদার বাড়ি। ছবি: সংগৃহীত

ঠিক তেমনই এক শতবছরের পুরোনো মোঘল আমলে স্থাপিত বিলাস বহুল পরিত্যক্ত জমিদারবাড়ি নিয়ে আজকের গল্প। সুনামগঞ্জ জেলার গৌরারং গ্রামের সেই গৌরারং জমিদারবাড়িটি এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। জানা যায় সুনামগঞ্জ তথা গৌরারং রাজ্যের প্রতাপশালী জমিদার ছিলেন জমিদার রামগোবিন্দ চৌধুরী। ১৮০০ সালের শুরুর দিকে তিনি এই জমিদারির পত্তন করেন। আর তখনই তিনি এই জমিদার বাড়ি তৈরি করেন।

দু’শো বছরের পুরনো হলেও গৌরারং জমিদার বাড়ির অত্যাধুনিক স্থাপত্যশৈলী এককথায় অসাধারন। সেখানে রয়েছে ৬টি আলাদা ভবন, রংমহলের দেওয়ালে রয়েছে নর-নারী ও লতাপাতার ছবি আকা। অন্দরমহল,জলসাঘর আজও তার অতীত জেল্লার ভগ্নাংশটুকু দিয়েও দেখতে আসা মানুষকে আকৃষ্ট করে। আর রাজমহল, যেখানে বিচারকার্য করা হতো তার তো কোন বর্ণনাই হয় না। রংমহল ভবনের সম্মুখভাগে রয়েছে বিশাল আকৃতির একটি পুকুর, মূল ভবনের ডান পাশে রয়েছে আরও একটি দীঘি, যেখানে জমিদার বাড়ির নারীরা গোসল করতেন। তাদের যাতায়াতে জন্য তৈরি করা হয় জল-বারান্দা। পুকুরপাড়ের জমিদারি ঘাট আজও রয়েছে। দেখলে মনে হয় সেই সময় জমিদার রা এখানে বসে কতোই না গল্পগুজব করেছেন। বর্তমানে ছোট-বড় অনেক গাছগাছালি পুরনো এই বাড়িকে যেন আগলে রেখেছে যেন এককথায় মনোমুগ্ধকর।

জমিদার রামগোবিন্দ চৌধুরী যে কতটা সৌখিন আর বিলাসবহুল ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় দৃষ্টিনন্দন এইসব স্থাপনা দেখলে। আজ ও বাড়ির ভিতর প্রবেশ করলে সেইসময়ের ঐতিহ্য এর কথা মনে পড়বে। তবে বর্তমানে কেউ আর সেখানে থাকেন না বলে রাজ বাড়ির মূল ভবনের ভেতরটা কেমন জানি ভুতুড়ে এক পরিবেশ বলে মনে হয়। আর কোন পরিচর্যার বালাই নেই বলে মনে হয় বড় বড় দালানকোঠার মাঝে যেন ছোট একটি জংগলের সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবেশী অনেকেই রাত্রিকালে ভবনের আশেপাশে প্রয়োজন ছাড়া তেমন একটা চলাফেরা করেন না। একশ’ বছর আগে এক ভূমিকম্পে বাড়িটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেসময় ভূমিকম্পে দালানের নিচে চাপা পড়ে জমিদারের ছোট ভাই মারা যান বলে জানান স্থানীয়রা । এছাড়াও ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযোদ্ধে পাকবাহিনী বাড়ির মূল ফটক সহ বেশ কিছু স্থাপনা ধ্বংস করে দেয়।

জমিদারদের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কেউই এখন সেখানে থাকেন না। জমিদার রাম গোবিন্দ চৌধুরীর কয়েক প্রজন্ম পরের নগেন্দ্র চৌধুরী ছিলেন এই এলাকার সর্বশেষ জমিদার । তার পুত্র নিরঞ্জন চৌধুরী এখন সুনামগঞ্জ শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তাদের পরিবারের একমাত্র ছেলে অঞ্জন চৌধুরীসহ ছেলের বউ লিপি শ্যাম ও একমাত্র নাতি অয়ন চৌধুরী সুনামগঞ্জ শহরে বসবাস করেন। সুনামগঞ্জ শহরে প্রাচীন রাজগোবিন্দ প্রাথমিক বিদ্যালয়টি স্থাপিত হয় উনার নামনুসারেই। একসময় গৌরারং জমিদার বাড়িতে দোল পূর্ণিমা থেকে শুরু করে সব ধরনের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালিত হত। আজ সে বাড়ির সবকিছুই শুধু কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে আশার ব্যাপার, এই প্রাচীন নিদর্শনটির প্রতি নতুন প্রজন্মের পর্যটকদের আগ্রহ দিনদিন বাড়ছে। শীতকালীন ছুটিসহ সবধরনের ছুটির দিনে এতে পর্যটকদের মোটামুটি ভীড়ই হয়ে থাকে। স্থানীয় প্রশাসন সামান্য উদ্যোগ নিলে চমৎকার এক পর্যটনকেন্দ্র হতে পারে শত বছরের পুরনো ঐতিহাসিক এই জমিদার বাড়ি ।

গৌরারং জমিদার বাড়ি যাবার রাস্তা:
গৌরারং জমিদার বাড়ি যেতে হলে আপনাকে প্রথমে সুনামগঞ্জ আসতে হবে ঢাকা-সিলেট-সুনামগঞ্জ­ রুটের বাস ধরে। সুবিধামতো সময়ে হানিফ, মামুন কিংবা শ্যামলী পরিবহনের বাসে চেপে বসলেই হবে। বাসটি সরাসরি আপনাকে নিয়ে আসবে সুনামগঞ্জ সদরে। আর সেখান থেকে গৌরারং জমিদার বাড়ি যেতে হলে আপনি সুনামগঞ্জের আব্দুজ জহুর ব্রিজ পার হয়ে যেতে পারবেন। ব্রিজ দিয়ে সুরমা নদী পার হয়ে সিএনজি, বিদ্যুতচালিত অটোরিকশা বা মোটরসাইকেলে চেপে সরাসরি গৌরারং জমিদার বাড়ি যাওয়া যাবে।

  • লেখা: আসাদুর রহমান ইজাজ
  • সম্পাদনা: মল্লিক ওয়াসি উদ্দিন তামী

x