এক অদৃশ্য শক্তি আমাদেরকে তাড়া করছে

করোনাভাইরাসের কারণে স্থবির হয়ে আছে গোটা বিশ্ব। এক অদৃশ্য শক্তি আমাদেরকে তাড়া করছে, আমরা নিরাপদে বাঁচতে নিজেদেরকে গৃহবন্দী করে রেখেছি। বিশেষ করে আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে পরিস্থিতি খুবই নাজুক, কারণ একে আমাদের জনসংখ্যা বেশি, এই বৃহৎ জনসংখ্যাকে যেকোনো পরিস্থিতিতে সচেতন করা অনেক কঠিন কাজ। অন্যদিকে নিম্নআয়ের মানুষরা ‘লকডাউনের’ কারণে ঘরে বসে অনাহারে – অর্থের অভাবে আছেন। এই বিষয়গুলো খুব ভাবাচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে খুবই অস্থিতিশীল এক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যারা কর্মজীবী মানুষ, দীর্ঘদিন ঘরে বসে থাকার ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাদের মধ্যেও মানসিক অস্থিরতা কাজ করছে। তবে এমন অনেকগুলো নেতিবাচক দিক থাকলেও এই ‘লকডাউন’ বেশকিছু ইতিবাচক বিষয় আমাদের সামনে এনেছে। বিশেষ করে আমরা যারা শিক্ষার্থী, পড়াশোনার জন্য আমাদের অনেককেই নিজের পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়। কিন্তু এইসময়টায় প্রায় সকলেই পরিবারের সঙ্গে আছেন, যাতে করে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় হচ্ছে। অবস্থানগত দূরত্বের কারণে যে মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়, সেটিও ঘুচে যাচ্ছে। নিজেদের মধ্যে কাজ ভাগ করে নিয়ে সবাই মিলে একসঙ্গে বাসার কাজ করার অভ্যাসও হচ্ছে।

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে যদি বলি, এই মুহূর্তে আমার অবস্থান অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে। এখানকার একটা স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপের উদ্দেশ্যে আসা। ফেব্রুয়ারি থেকে সিডনিতে আছি, আমার বড় ভাই এখানে থাকেন, উনার সঙ্গেই আছি। আমার ভাইয়ের স্ত্রী-সন্তান জাপানে একটি কাজে গিয়ে সেখানে আটকা পড়েছেন, আবার এদিকে ইন্টার্নশিপ শেষ করার পরও আমি দেশে ফিরতে পারিনি সব ফ্লাইট বন্ধ থাকার কারণে। অন্যদিকে আমার বাবা-মা বাড়িতে একা। সবমিলিয়ে এবারের পুরো রমজান মাস, ঈদও উদযাপন করতে হল ঘরে বসে, প্রায় একাই বলে চলে। এবারের ঈদকে অস্বাভাবিক বা নিরানন্দের ঈদ বলে আখ্যা দিলেও আমি মনে করছি এটা আসলে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। আর তাই মন খারাপ না করে বরঞ্চ সময়টা উপভোগ করাই ভাল।

এপ্রিলের শেষদিকে আমার ইন্টার্নশিপ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করলেও এর আগে প্রায় পুরো একমাস ঘরে বসে কাজ করেছি। এখানকার পরিস্থিতিটা সরকার ভালোভাবে সামলে নিয়েছে। প্রায় বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা ঘরে বসে কাজ করেছেন, বাইরে জনসমাগমে নিষেধাজ্ঞা ছিল। অনলাইন অর্ডার এবং ডেলিভারি চালু থাকায় মানুষ ঘরে বসেই কেনাকাটা ও বাজার সদাই করেছে। দীর্ঘদিনের লকডাউনের কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা গেছে, এবং একটা পরিস্থিতির পর সেই সংখ্যাটা আর বাড়েনি। ঘরে থাকাকালীন সময়টার অভিজ্ঞতার কথা যদি বলি, আমি ঘরে বসে অফিসের কাজের পাশাপাশি বিভিন্ন অনলাইন কোর্স করেছি। দৈনিক ইত্তেফাক ও অনন্যা ম্যাগাজিনে সাংবাদিকতা করছি বেশকিছুদিন যাবত; আর এই লকডাউনের সময়টাতে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতার বিভিন্ন বিষয়, উদ্যোক্তাদের গল্প, বর্তমান প্রেক্ষাপটের নানা বিষয়ে আলোচনা আয়োজন করব। সেই আয়োজনগুলোর একাংশ সঞ্চালনা ও পরিচালনা করেও আমার ভাল সময় কাটছে। অন্যান্য সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস থাকলে পড়াশোনার ব্যস্ততায় অনেক কাজ করা হয়ে ওঠে না, সেই কাজগুলোকে এখন গুছিয়ে নিতে পারছি। পাশাপাশি নিয়মিত সিনেমা দেখছি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়শই নেতিবাচক অনেক খবর ছড়িয়ে পড়ে যা আমাদেরকে নেতিবাচকতায় আচ্ছন্ন করে কিংবা মনকে বিষণ্ণ করে, তাই যথাসম্ভব সেই বিষয়গুলোকেও এড়িয়ে যাচ্ছি। এইসময়টায় যারা ঘরে বসে কাটাচ্ছেন, তারাও নিজেদের সময়টাকে কিছু সৃজনশীল কাজের মধ্য দিয়ে উপভোগ করতে পারেন। যার যেটা শখ, যেমন- ছবি আঁকা, গান গাওয়া, আবৃত্তি করা, অথবা ভাল বই পড়া বা সিনেমা দেখার মাধ্যমেও সময়টা সুন্দর হতে পারে। একটু ভাবা যেতে পারে, কোন কোন কাজগুলো করার জন্য ছুটির অপেক্ষা করা হত। এই লম্বা বন্ধে এক এক করে তেমন অনেক কাজ করে নেয়া যেতে পারে। সামনের দিনগুলোর জন্য সুন্দর পরিকল্পনা সাজিয়ে নেয়া যেতে পারে। নিয়মিত শরীরচর্চা, মেডিটেশনের অভ্যাসও করা যেতে পারে। শরীরের সাথে সাথে মনও ভাল থাকবে। বর্তমান সময়ে সফট স্কিল ডেভোলাপ করার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখন যেহেতু হাতে অনেক সময়, তাই অনলাইনে বিভিন্ন ওয়েবসাইটে স্কিল ডেভোলাপমেন্ট কোর্স করা যেতে পারে। প্রযুক্তিতে আগ্রহী হলে বিভিন্ন সফটওয়্যারের কাজও শেখা যেতে পারে। মোটকথায়, যথাসম্ভব ইতিবাচক চিন্তা করা উচিত। যেহেতু এই পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই এবং স্বাভাবিক হবার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়াও কোন বিকল্প নেই, তাই বিষণ্ণ না হয়ে কোনো কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখাই ভাল। এছাড়া করোনা আমাদেরকে আরও কিছু বিষয় শিখিয়েছে, পরিবেশের প্রতি যত্নবান হওয়া, পরিচ্ছন্নতা মেনে চলা, একে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া -এই চর্চাগুলো যেন আমরা বজায় রাখি। স্থাপত্যের শিক্ষার্থী হিসেবে বলব, এই সময়টা অন্যসবার মতই স্থপতিদের জন্যও চ্যালেঞ্জিং।

সবক্ষেত্রেই যেমন করে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে, তেমনভাবে স্থাপত্যচর্চার জায়গাটিতেও হয়তো নতুন ও ধারণা ও ভাবনার উদ্ভব হবে। শিক্ষার্থী হিসেবে নিজেকে বিশ্বের প্রেক্ষাপটে প্রস্তুত করার জন্য একসঙ্গে অনেক বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করাও জরুরি। যেহেতু এখন ঘরে বসে সময় কাটাতে হচ্ছে, তাই বসে ইন্টারনেটে বিশ্বখ্যাত স্থপতিদের কাজগুলো দেখা যেতে পারে। তাদের দর্শন, ভাবনা নিয়ে পড়াশোনা করা যেতে পারে। করোনা সংক্রমণ এড়াতে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টায় জোর দেয়া হয়েছে, সেটি হল সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। আমরা যদি আমাদের শহরগুলোর দিকে তাকাই, তবে দেখব পর্যাপ্ত গণপরিসরের অভাব। খোলা জায়গায় নিজের মত করে সময় কাটানো, একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নেবার মত জায়গা নেই। গণপরিবহনে অতিরিক্ত যাত্রী। দালান বা ভবনগুলো ঘিঞ্জি। বাজারগুলোতে দোকানপাটগুলো এমনভাবে সাজানো, যেখানে দোকানিরা গাদাগাদি করে পণ্যের পসরা নিয়ে বসেন। ক্রেতার সংখ্যা বেশি হলে তিল ধারণের জায়গা থাকেনা। অন্যদিকে, আমরা যতই নতুন ঘরবাড়ি তৈরি করছি, ততই আমাদের মাঝ থেকে সবুজ হারিয়ে যাচ্ছে। গাছ কমছে, মাঠ কমছে। জলাশয় ভরাট হচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে স্থাপনা তৈরি করা হলে নকশাটি যথাযথ না হওয়ায় জায়গা নষ্ট হচ্ছে বেশি। এমন করেই আমাদের ছোট ছোট অসতর্ক আচরণ প্রকৃতির সৌন্দর্য এবং ভারসাম্যকে নষ্ট করছে। বর্তমানে স্থপতিরা যেকোনো স্থাপনা তৈরিতেই সবুজ ও টেকসই (সাস্টেইনেবল) রূপে গড়বার নকশা প্রণয়নে জোর দেন। এটি বাধ্যতামূলকভাবে করতে হবে। দেশের যে শহরগুলো এখন উন্নয়নের দিকে এগোচ্ছে, সেগুলোর যথাযথ পরিকল্পনা প্রণয়নে স্থাপত্যের শিক্ষার্থী ও তরুণ স্থপতিদের ভূমিকা রাখা প্রয়োজন বলে মনে করি। সঠিক পরিকল্পনা ও নকশা মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে, হোক সেটি ছোট কোনো ভবন কিংবা শহর।

সবশেষে বলব, আমরা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে একটা অন্ধকার ঘরে আটকে আছি। ঘরের দরজার চাবিটা ঘরেই কোথাও লুকিয়ে আছে। যেদিন আমরা প্রকৃতির প্রতি যত্নবান হবো, একে অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হবো, নিজেদের মধ্যে একাত্মতা এবং একাগ্রতার মাধ্যমে সুন্দর কিছু করবার স্বপ্ন দেখব, সেদিনই সেই চাবিটা খুঁজে পাব; দরজা খুলে আমাদের সামনে উন্মুক্ত হবে একটা সুন্দর পৃথিবী।

  • সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার
শেয়ার করুন