বঙ্গবন্ধু অমর, চিরঅম্লান

আজ থেকে উনপঞ্চাশ বছর আগে বাঙালী জাতি ছিল পরাধীন, দ্বিধাগ্রস্থ। এই বাঙালীকে ঐক্যবদ্ধ করা মোটেও কোন সহজ কাজ ছিলনা। আর স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করা তো ছিল আরো কঠিন। দূরদর্শী নেতৃত্ব দিয়ে এই প্রায় অসম্ভব কঠিন কাজটিই সম্ভব করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বাঙালী জাতির পিতা। বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়ে তিনি পথ দেখালেন স্বাধীনতার। অতঃপর, দেশ স্বাধীন হবার পর তাঁকে সামনে নিয়ে পুরো দেশ নতুনভাবে গড়ে উঠবার যে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল, ইতিহাসের একটি ১৫ আগস্ট থমকে দিল সেই স্বপ্নযাত্রা। জাতির ললাটে এঁকে দিল কলঙ্কের তিলক। নৃশংস, নির্মম একটি হত্যাকাণ্ড অপূরণীয় ক্ষতি করল পুরো জাতির।

আজ শোকাবহ ১৫ আগস্ট। বাঙালী জাতির সবচেয়ে বেদনার দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিন সপরিবারে কাকডাকা ভোরে একদল বিপথগামী সেনাসদস্য সপরিবারে হত্যা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। আজ তাঁর ৪২তম শাহাদতবার্ষিকী। বিশ্বের ইতিহাসে আরও অনেক রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়ক আততায়ীর হাতে প্রাণ দিয়েছেন, কিন্তু কাউকেই বঙ্গবন্ধুর মত করে সপরিবারে নির্মমতার শিকার হতে হয়নি। বাংলার প্রতিটি মানুষই যেন ছিলেন বঙ্গবন্ধুর স্বজন। জনগণের জন্য নিজের সবকিছু উজার করে দিতেন। রাষ্ট্রপতি হয়েও তিনি বঙ্গভবনে থাকেননি, থেকেছেন ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের অরক্ষিত বাড়িতে। সেখানেই তিনি প্রাণ দিলেন, শ্রাবণ মাসের সেদিনের প্রকৃতির বর্ষণ যেন ছিল বাঙালির দুঃখের অশ্রুপাত। ১৫ আগস্ট আরো যারা প্রাণ হারান, তাঁরা হলেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশুপুত্র শেখ রাসেল, পুত্রবধূ সুলতানা কামাল, রোজী জামাল, ভাই শেখ নাসের ও কর্ণেল জামিল, বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে মুক্তিযোদ্ধা শেখ ফজলুল হক মনি, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত সহ আরো অনেকে। জাতি তাঁদের সবাইকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। বুলেটের গুলিতে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ির জানালার কাঁচ, দেয়াল ঝাঁঝরা হয়ে গেছিল। সিড়িতে পড়ে ছিল জাতির পিতার লাশ। সেদিন জাতি এ ঘটনার আকস্মিকতায় শোকে বিহ্বল হয়ে পরেছিল, সেই শোকের দহন চিরদিন চলবেই।

বঙ্গবন্ধু যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটাকে নতুন করে সাজাবার জন্য কাজ করছিলেন, তখনই এই হত্যাকাণ্ড ঘটে গিয়ে আমাদেরকে পিছিয়ে দিয়েছে শতবছর। কারণ যে মানুষটা তিলে তিলে একটা দেশকে গড়বার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সে স্বপ্ন যখন থমকে যায় তখন থমকে যায় সময়, স্রোত। সেই স্রোত হয়তো অচিরেই একটা সাজানো-গোছানো দেশ তৈরি করতে পারতো, তা না হয়ে বরং বিশৃঙ্খলতাই রয়ে গেল। দীর্ঘসময়ের জন্য শাসন ক্ষমতা চলে গেল উর্দিপরা শাসকদের হাতে। সেই ধাক্কা জাতি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। স্বাধীনতার ছেচল্লিশ বছর পরও দুঃখ-দুর্দশার গল্প শেষ হয়নি। তবে বাঙালী শোককে শক্তি হিসেবে পুঁজি করে নিয়েই এগোবার স্বপ্ন দেখে। একদিন শেষ হবে সব দুর্দশা, পূরণ হবে জাতির পিতার স্বপ্ন।

বঙ্গবন্ধু স্মরণে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের ছবিটি এঁকেছে রিদওয়ান ইবনে সামাদ (১২)। সে সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামটি একটি ইতিহাস। সংগ্রামের মধ্যেই বড় হন তিনি। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ৫২’র ভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন সংগ্রামী নেতা। বাঙালি জাতির মুক্তি সনদ ৬ দফার প্রণেতাও ছিলেন তিনি। ৭০’র নির্বাচনে অংশ নিয়ে বঙ্গবন্ধু আওয়ামীলীগকে এদেশের গণমানুষের আশা প্রতীকে পরিণত করেন। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তুলে ষাটের দশক থেকেই তিনি জাতীয়তাবাদের উত্থানের অগ্রনায়ক হয়ে ওঠেন। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাত্রিতে যখন পাকিস্তানি হানাদাররা ধ্বংসযজ্ঞ চালালো এবং পরে মুজিবকে গ্রেফতার করলো, সেসময় তিনি স্বাধীনতার ডাক দিয়ে যান। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উত্তাল সমুদ্রে বঙ্গবন্ধু তাঁর শাণিত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই ঘোষণায় পুরো জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতা, জন্ম হয়েছিল নতুন রাষ্ট্রের।

ঘাতকদের বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে লুটিতে পড়ে আছেন বঙ্গবন্ধু। মাথা হেঁট করে আছে পুরো বাংলাদেশ। কলঙ্কময় স্মৃতির সেই দৃশ্য কল্পনা করে এঁকেছে রিদওয়ান ইবনে সামাদ (১২)। সে সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।

পরাজিত হায়েনারা বাঙালীর উত্থান ও স্বাধীনতা মেনে নিতে না পেরেই ষড়যন্ত্রের নীলনকশা তৈরি করে, হত্যা করে জাতির পিতাকে। সাময়িক সময়ের জন্য সবকিছু থমকে গেলেও বঙ্গবন্ধুর নাম তো কখনো মুছে ফেলা যাবেনা, তা তারা করতে পারেওনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অমর, অক্ষয় তাঁর কীর্তি। তাঁর কীর্তি প্রতিটি বাঙালীর হৃদয়ে, ইতিহাসের পাতায় চিরঅম্লান হয়ে থাকবে। জাতীয় শোক দিবসে জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলী।

  • সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার, সম্পাদক, সুনামগঞ্জ মিরর
শেয়ার করুন