পাহাড়ের পাদদেশে সৌন্দর্যের লীলাভূমি

প্রকৃতির সান্নিধ্য মানুষকে বরাবরই আকর্ষণ করে। প্রকৃতির সাথে আনন্দময় মুহূর্ত কাটানোর জন্য কেউ ছুটে যান পাহাড়ের কাছে, কেউ নদী বা সাগরের কাছে, কেউবা অরণ্যে। ঠিক তেমনি মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অপরূপ শোভায় শোভিত এক নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হলো আমাদের সুনামগঞ্জ। সুনামগঞ্জ জেলার নারায়ণতলা মিশন ও সীমান্ত ঘেঁষা ডলুরা শহীদ মিনার যেন সৌন্দর্যের লীলানিকেতন।

সুনামগঞ্জ শহর সুরমা নদীর তীরে অবস্থিত। সুরমা নদী পাড়ি দিয়ে মাত্র সাত কিলোমিটার উত্তরে নারায়ণতলা এলাকা। আর সেখানে গেলে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোন অভাব হবে না। যতদূর চোখ যাবে ততদূর পর্যন্ত দেখতে একই মনে হবে। সবুজে সবুজ যেদিকে চোখ যাবে সেদিকেই চোখ আটকে যাবে ফেরাতে মনই চাইবে না। নারায়ণতলায় রয়েছে খ্রিষ্টানদের মিশন চার্চ —যেখানে তারা প্রার্থনা করে থাকেন। পাহাড়ের পাদদেশের নারায়ণতলা মিশন এক দেখার মতো জায়গা। সাজানো সুন্দর সে চার্চ প্রাঙ্গন পর্যটকদেরও বেশ আকৃষ্ট করে। আর তা দেখার জন্য অনেক দর্শনার্থীই সেখানে যান। মেঘালয় খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশে নারায়ণতলায় অসংখ্য পাহাড়ি পরিবারের বসবাস। সেখানে অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বসবাস করে থাকে। তাদের জীবনযাপন বেশ আলাদা ধাচের। তারা তাদের ধর্মীয় রীতি অনুসারে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানগুলো নিজেদের মতো করে পালন করে থাকেন —যা বেশ আগ্রহোদ্দীপক একটা ব্যাপার।

ডলুরা, নারায়ণতলা, সুনামগঞ্জ

এই এলাকার মানুষদের জীবিকা নির্বাহের জন্য এলাকার বাইরে তেমন একটা যায় না। এখানকার সবচেয়ে বড় অর্থকরী ফসল সবজি চাষ করেই সাধারণতা তারা জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। এসব শাকসবজি সুনামগঞ্জের চাহিদা পূরণ করে বাইরের জেলাতেও প্রচুর পরিমাণে সরবরাহ করা হয়। আপনি যদি নারায়ণতলায় যান আর বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা ডলুরা শহীদ মিনার ঘুরে না আসেন তবে অনেক কিছু মিস করে ফেলবেন। যেতে যেতে ধানক্ষেত, বিভিন্ন ফলমূলসহ গাছগাছড়া দেখে আপনি ভ্রমণের অর্ধেক সার্থকতা পেয়ে যাবেন। সীমান্তবর্তী ডলুরা এলাকায় পৌঁছালে দেখতে পারেব ৪৮ জন শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতির উদ্দেশ্যে অপরূপ সৌন্দর্যে নির্মাণ করা স্মৃতিসৌধ। স্মৃতিসৌধের গায়ে কষ্টি পাথরে খোদাই করা ৪৮ জন সূর্যসন্তানের নাম লেখা রয়েছে। সীমান্তবর্তী হওয়ায় এই এলাকা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রচুর লোকজন ভারতে পালিয়ে যান। ফলে পাকবাহিনী সুরমা নদীর তীরে ক্যাম্প করে ভারতে লোকজনের গমন প্রতিরোধ করতে থাকে। এক পর্যায়ে ডলুরা এলাকায় পাকিস্তানীদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখযুদ্ধ শুরু হয় আর এতে শহীদ হন অনেকে। সে যুদ্ধে যারা শহিদ হন তাদের সকলের সমাধি রয়েছে এখানে। এ সমাধিতে যারা শায়িত আছেন তাদের অনেকের নামই জানা যায় নি। নাম জানা ৪৮জনের নাম ফলকে লিপিবদ্ধ আছে। ১৯৭৪ সালে ৮২ফুট দৈর্ঘ্য ৮১ফুট প্রশস্থ ও ৫ফুট উঁচু চতুর্দিক ঘেরা একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। এ স্মৃতিসৌধের সামনে রয়েছে সবুজ ঘাসের ছাওয়া একটি মাঠ। উত্তর-পূর্ব কোণে আছে ‘ছায়াকুঞ্জ’। তার পাশে রয়েছে রেস্ট হাউজ। ছায়াকুঞ্জ থেকে পাহাড় একেবারে কাছেই মনে হয়। মাঝখানে শুধু সীমান্তের কাটাতার। তাই হাত দিয়ে নয়, মন দিয়ে পাহাড় ছুয়ে নিতে হয়।

মাঠের দক্ষিণ দিকে মুক্তিযুদ্ধ ভাস্কর্য। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্রহাতে দাঁড়িয়ে আছেন। সামনে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। তার সামনের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পুরোটাই উপভোগ করার মত। ডলুরা শহীদ মিনারের পশ্চিম পাশে পাহাড়ি ‘চলতি নদী’ বয়ে চলেছে। বালি আর নুড়ি পাথর সামান্য পানির তলদেশে স্পষ্ট দেখা যায়। শীত মৌসুমে মানুষ পিকনিকে দল বেঁধে যাচ্ছে, বিনা পয়সায় উপভোগ করছে সৌন্দর্যকে। সরকারি ছুটির দিনগুলোতে প্রচুর দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে এখানে। এছাড়াও নারায়ণতলায় একটি বিজিবি ক্যাম্প রয়েছে। তাই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করলেও নিরাপত্তাজনিত কোন অসুবিধায় পড়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। স্থানীয় প্রশাসনের নিকট জেলাবাসী দীর্ঘদিন যাবত দাবি জানিয়ে আসছে ডলুরা এলাকাকে পিকনিক স্পট হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। প্রশাসন একটু আন্তরিক ও সচেষ্ট হলে সেখানে গড়ে তোলা যেতে পারে সুন্দর একটি পিকনিক স্পট যার দ্বারা এই এলাকা ও জনগণ সকলেই নিশ্চিতভাবে লাভবান হবে।

  • লেখা: আসাদুর রহমান ইজাজ
  • সম্পাদনা: ওয়াসি তামী
শেয়ার করুন