শহরের ফুসফুস হতে পারে জুবিলীর মাঠ

স্থপতির নকশায় জুবিলীর মাঠটির পরিবর্তিত রূপ কল্পনা করা হয়েছে

একটা সবুজ মাঠ মানে শহরের ফুসফুস। সবুজ ঘাসে ছেয়ে থাকা মাঠের ওপরে খোলা আকাশ—সেটি তার চারপাশের বাসিন্দাদের জন্য প্রশান্তির নিঃশ্বাস নেবার জায়গা। অথচ সেই মাঠ যদি কালো দেয়ালে ঘেরা থাকে, তা যেন জানালাবিহীন অন্ধকার ঘরের মত। যেমনটা দেখুন, সুনামগঞ্জ ষোলঘর কলোনির বিশাল মাঠটিকে সামনে থেকে উঁচু দেয়ালে ঢেকে দেয়া হয়েছে। পথচারীরা স্রেফ একটি কালো দেয়াল দেখতে পান, মাঠের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক স্থাপন হয়না।

সুনামগঞ্জ শহরকে আমরা বলি মানবিক শহর। নানাভাবে অপরিকল্পিত উন্নয়ন করে ধীরে ধীরে এই শহরকে আমরা ইটপাথরে ঢেকে দিচ্ছি। যে প্রসঙ্গে কথা বলছি তার থেকে খানিকটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও বলি- সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘরের সামনে সবুজ ঘাসের যে উঠোন ছিল, সেটিও কংক্রিটে ঢেকে দেয়া হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি’র সবুজ ঘাস যেমন হাজারো শিক্ষার্থীর প্রশান্তির স্থান, তেমনি ঐতিহ্য জাদুঘরের সবুজের সৌন্দর্য হতে পারতো বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার—অর্থাৎ শহরের সচেতন তরুণদের আড্ডার অসাধারণ জায়গা। দুঃখজনক হলে সত্যি, এমন করে আমরা প্রতিনিয়তই সবুজ হারাচ্ছি সংবেদনশীল পরিকল্পনার অভাবে। বড় শহরে যেখানে প্রাণহীন ইটসুরকির ভীড়ে সবুজের জন্য হাঁসফাঁস, সে তুলনায় আমাদের প্রকৃতিকে স্পর্শ করার অনেককিছু থাকার পরও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা হারাচ্ছি। অন্যদিকে, আমাদের খেলার মাঠও দখল-বেদখল হচ্ছে নানাভাবে। যেমন দেখুন, আমাদের জুবিলীর মাঠটির আয়তন বিশাল। একটা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ হিসেবে এত বড় মাঠ থাকাটা ভাগ্যের ব্যাপার। অথচ এই মাঠে প্রায়ই বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠান, কনসার্ট, বাণিজ্য মেলা আয়োজন করা হয়; এমনকি কোরবানি ঈদের সময়ে গরুর বাজারও বসে এই মাঠে৷ ফলে এতে যেমন খেলাধুলা ব্যাহত হয়, তেমনই ক্ষতিগ্রস্থ হয় মাঠটি। তাছাড়া, বাজার বসার কারণে মাঠের ঘাস উঠে গিয়ে অল্প বৃষ্টিতেই এটি কর্দমাক্ত হয়ে খেলাধুলার অনুপযোগী হয়ে পড়ে৷ ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এটির চেহারা যেন অনেকটা পরিত্যক্ত জমির মত। আর রাত বাড়লে মাঠের কোনায় অন্ধকার জায়গায় বসে মাদকসেবীদের আনাগোনা।

বা দিকের ছবিটি জুবিলীর মাঠের বর্তমান অবস্থা। ডানপাশের ছবিতে স্থপতির নকশায় এটির পরিবর্তিত রূপ কল্পনা করা হয়েছে।

ভেবে দেখুন, একটু সদিচ্ছা থাকলেই হয়তো এই মাঠটিকে আমরা আমাদের জন্য অন্যরকম সম্ভাবনার জায়গায় পরিণত করতে পারি। সুনামগঞ্জ শহরে কোনো পার্ক নেই। কবে হবে, জানিনা। কিন্তু একটা মাঠকে বদলে ফেলার মাধ্যমে শহরকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করা সম্ভব। একটা মনোরম সুন্দর মাঠের জন্য পুরো এলাকার চেহারাই বদলে যাবে। স্থাপত্য ও পরিকল্পনার শিক্ষার্থী হিসেবে স্বভাবতই এমন নানা ভাবনা মাথায় আসে। সুনামগঞ্জ শহরকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পছন্দ করি। মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, আমরা সকলে মিলে এই শহরকে নিয়ে ভাবলে আমরা একে পুরো দেশের কাছে মডেল হিসেবে উপস্থাপন করতে পারব। শুধু প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা। ছোট ছোট বিষয়গুলোকে নিয়ে কাজ শুরু করলেই একসময় সবকিছু বদলাবে। আর তাই যখন দেখেছি সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ থেকে বাজার ও দোকানপাট উচ্ছেদ করে মাঠ সংস্কার ও সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্ররা, তখন মনেপ্রাণে এর সঙ্গে একাত্ম হয়েছি। তখনই সিদ্ধান্ত নিই, বাস্তবে কাজে লাগুক বা না লাগুক এই মাঠের জন্য একটা নকশা তৈরি করব। স্থাপত্যে আমার সহপাঠী-সহকর্মী বন্ধু মারুফের সহযোগিতা ও অক্লান্ত পরিশ্রমে গেল তিনদিন কাজ করে আমরা একটি নকশা তৈরির চেষ্টা করেছি। সুনামগঞ্জের সন্তান এবং একজন জুবিলীয়ান হিসেবে এ নিয়ে ভাবাও তো দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

স্থপতির নকশায় জুবিলীর মাঠটির পরিবর্তিত রূপ কল্পনা করা হয়েছে

একটা অপরূপ সুন্দর মাঠ শুধু খেলোয়াড়দের খেলার জন্য নয়, যারা খেলা দেখবেন তাদেরকেও চিত্তবিনোদন যোগাবে৷ পাশাপাশি এর চারপাশজুড়ে হাঁটার পথ, সবুজের বেষ্টনী ও ফুলের বাগান তৈরি করে একে বিকেলে বেড়াতে যাবার জায়গায় পরিণত করা যাবে৷ সবুজে ঘুরে বেড়াবে প্রজাপতি আর বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। অল্পকিছু বেঞ্চ বা বসার জায়গা স্থাপন করলে সুন্দর আড্ডার জায়গা হতে পারে। লাইটপোস্ট লাগালে রাতের বেলায়ও নিরাপদে যে কেউ এখানে এসে শরীরচর্চা করতে পারবেন৷ রাতে ফুটবল খেলার সুযোগ থাকলেই বা মন্দ কী! আর ইটের দেয়ালের পরিবর্তে যদি গ্রিল বা জালি ব্যবহার করা হয়, রাস্তার পথচারীদের কাছেও উপভোগ্য হয়ে উঠবে মাঠের সবুজ। আমরা ভেবেছি, মাঠে যারা খেলবে তারা ছাড়াও বাইরের মানুষের জন্য একটা ‘ওয়েলকামিং এনভায়রনমেন্ট’ তৈরি করতে হবে। শহরের যারা সিনিয়র সিটিজেন আছেন, সাবেক জুবিলীয়ান আছেন, তাঁরা যদি মাঠে হাঁটতে আসেন, স্কুলের সাথে তাঁদের আবার সম্পর্ক তৈরি হবে৷ স্কুলজীবনের স্মৃতি মনে পড়বে৷ উন্নত বিশ্বের শহরগুলোতে প্রতিটি এলাকায় অনেক ভবনের মাঝে একটা পকেট পার্ক থাকে, যেন মানুষ সেখানে বিকেলবেলা সুন্দর সময় কাটান। আমাদের প্রেক্ষাপটে তেমন চর্চা তৈরি হয়নি কিন্তু অন্তত একটা মাঠকে তো সাজাতেই পারি, যেখানে থাকবে ব্যায়াম করার জায়গা, বাচ্চাদের খেলার জায়গা, কফি শপ, বুক শপ, পাবলিক টয়লেট ও প্লাজা। এখানে রাস্তার পাশ ঘেষে কিছু ছোট ফুড কর্ণার ভাড়া দেবার ব্যবস্থা করলে স্কুলের আয় হবে। সেই টাকায় মাঠ রক্ষণাবেক্ষণ করা যাবে। তাছাড়া খেলাধুলা কিন্তু সারাক্ষণ হবে না। বরং আমরা যদি সুন্দর করে একে ল্যান্ডস্কেপিং করি, রিভারভিউয়ের মতোই এখানে এসে বসে আড্ডা দেয়া বা সময় কাটানোর চমৎকার সুযোগ তৈরি হবে৷ ছোটখাটো পিকনিকও হতে পারে। আর রিভারভিউয়ের অবস্থান যেহেতু মাঠের ঠিক পেছনে, তাই এর সঙ্গে ইটের দেয়ালের পরিবর্তে জালি ব্যবহার করে ‘ভিজ্যুয়াল কানেকশন’ তৈরি করলে পুরো জায়গাটি আরও অনেকবেশি প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।

বা দিকের ছবিটি জুবিলীর মাঠের বর্তমান অবস্থা। ডানপাশের ছবিতে স্থপতির নকশায় এটির পরিবর্তিত রূপ কল্পনা করা হয়েছে।

মাঠ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একমত হয়েছেন সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র। মেয়র মহোদয়সহ শহরের সুধীজনদের বিনীত দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। বিদ্যালয়ের সব শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও প্রত্যাশা করেন তাদের এই খেলার মাঠটি ভালো থাকবে। সুনির্দিষ্ট নকশায় পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে জুবিলীর মাঠ হয়ে উঠবে সুনামগঞ্জের আইকন। সেই অপেক্ষায় রইলাম।

ছবিতে স্থপতির নকশায় মাঠের পরিবর্তিত রূপ কল্পনা করা হয়েছে

ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন

  • সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার
শেয়ার করুন