বাউল সম্রাট স্মরণে

বাংলা বাউল গানের কিংবদন্তি, একুশে পদকপ্রাপ্ত বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর)। দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগে ২০০৯ সালের এই দিনে সিলেটের নুরজাহান জেনারেল হাসপাতালে ৯৩ বছর বয়সে তিনি মারা যান। তার ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে উজানধল গ্রামে তার স্ত্রীর কবরের পাশে সমাহিত করা হয়।

করোনা ভাইরাসের কারণে এরছর তার মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে সুনামগঞ্জে তেমন কোনো আয়োজন নেই। স্মরণসভার আয়োজনও করা হয়নি। তার জন্মস্থান দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামেও নেই তেমন কোনো আয়োজন। শাহ আব্দুল করিমের পরিবার ও শাহ আব্দুল করিম স্মৃতি পরিষদ দিরাইর উদ্যোগে তার গ্রামের বাড়িতে সীমিত পরিসরে দোয়া-মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া জেলার ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বাউল সম্রাটের ভক্তরা এসে জড়ো হবেন তার মাজার প্রাঙ্গণে। সেখানে তারা নিজেদের মতো করে গুরুকে স্মরণ করবেন। সারা রাত ধরে তারা গাইবেন করিমের গাওয়া ও লেখা সব গান।

অসংখ্য গণজাগরণের গানের রচয়িতা বাউল শাহ্ আব্দুল করিম উজানধল গ্রামে জন্মগ্রহণ করে আমৃত্যু তিনি উজানধল গ্রামেই ছিলেন। অত্যন্ত সহজ-সরল জীবন-যাপন করতেন তিনি। ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে গানে-গানে অর্ধ শতাব্দিরও বেশি লড়াই করেছেন। এজন্য মৌলবাদীদের দ্বারা নানা লাঞ্চনারও শিকার হয়েছিলেন তিনি। বাউল সম্রাটের ভক্ত রণেশ ঠাকুর জানান, আমরা চাই বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের যে গানগুলো এখনও সংরক্ষণ করা হয়নি সেগুলো সংরক্ষণ করা হোক। তার স্মৃতি ধরে রাখতে যে সাংস্কৃতিক জাদুঘর নির্মাণের কথা রয়েছে তা দ্রুত করা হোক।

বাউল সম্রাট শাহ্ আব্দুল করিম স্মৃতি পরিষদ দিরাই শাখার সভাপতি আপেল মাহমুদ বলেন, করোনার কারণে আমরা এবছর কোনো আয়োজন করিনি। তবে সীমিত পরিষরে মিলাদ-মাহফিল ও দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া বাউল সম্রাটের ভক্তরা উনার বাড়িতে এসে জমায়েত হলে সেখান কিছু গান হতে পারে।

জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল আহমেদ মঞ্জুরুল চৌধুরী পাভেল জানান, যেহেতু দেশে এখন করোনা প্রকোপ চলছে, তাই জেলা শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে অনলাইনভিত্তিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে বাউলকে স্মরণ করা হবে। সেখানে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও বাউল শিল্পী সূর্য লাল দাস ও বশির উদ্দিনসহ আরও কয়েকজন শিল্পী অংশ নেবেন।

১৯১৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নের উজানধল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই গুণী ব্যক্তি। তার পিতার নাম ইব্রাহিম আলী ও মাতার নাম নাইওরজান। দারিদ্র ও জীবন সংগ্রামের মাঝে বড় হওয়া শাহ আব্দুল করিমের সঙ্গীত সাধনা শুরু ছোটবেলা থেকেই। বাউল সম্রাটের প্রেরণা তার স্ত্রী আফতাবুন্নেসা, যাকে তিনি আদর করে ‘সরলা’ নামে ডাকতেন।

অভাব-অনটন, দুঃখ-দারিদ্রে বেড়ে ওঠা বাউল করিমের বয়স যখন ১২ তখন রাখালের চাকরি ছেড়ে পার্শ্ববর্তী ধল বাজারের এক মুদি দোকানে কাজ নেন, দিনে চাকরি আর রাতে হাওর-বাঁওড় ঘুরে গান গাইতেন। গ্রামের নৈশ বিদ্যালয় ভর্তি হলেও পড়াশোনা হয়নি তার। গ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাউল ভাটিয়ালি, পালাগান গাইতেন তিনি। পুরো ভাটি এলাকায় নাম ছড়াতে থাকে তার। এরপর বিভিন্ন আন্দোলনে গণসংগীত গেয়ে মানুষকে উজ্জীবিত করেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তিনি পথে পথে ঘুরে গান গেয়ে মানুষর মধ্যে গণজাগরণ সৃষ্টি করেছেন। ভাটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম-ভালোবাসার পাশাপাশি তাঁর গান কথা বলে সকল অন্যায়-অবিচার, কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। তিনি তাঁর গানের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন প্রখ্যাত বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ, পুঞ্জু শাহ, দুদ্দু শাহ এর দর্শন থেকে। যদিও দারিদ্র তাকে বাধ্য করে কৃষিকাজে তার শ্রম ব্যয় করতে কিন্তু কোন কিছু তাকে গান সৃষ্টি করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিনি বাউল গানের দীক্ষা লাভ করেন সাধক রশিদ উদ্দিন, শাহ ইব্রাহীম মাস্তান বকশ এর কাছ থেকে। তিনি শরীয়তী, মারফতি, দেহতত্ত্ব, গণসংগীতসহ বাউল গান এবং গানের অন্যান্য শাখার চর্চাও করেছেন।

শাহ আবদুল করিম জীবনভর তার গানে অবহেলিত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির কথা বলে গেছেন। তার গানে যেমন প্রেম-বিরহ ছিল, তেমনি ছিল খেটে খাওয়া মানুষের কথা। একই সঙ্গে আধ্যাত্মিক ভাবনাও রয়েছে তার সৃষ্টিকর্মের বিশাল অংশজুড়ে। শাহ আব্দুল করিম চুয়ান্নর নির্বাচন, ঊনসত্তরের গণআন্দোলন, সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানসহ প্রতিটি পর্যায়ে, স্বরচিত গণসঙ্গীত পরিবেশন করে জনতাকে দেশমাতৃকার টানে উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করেছেন।

তার গণসঙ্গীতে মুগ্ধ হয়ে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী তাঁর পিঠে হাত রেখে বলেছিলেন বেটা- গানের একাগ্রতা ছাড়িও না তুমি একদিন গণমানুষের শিল্পী হবে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গণসংগীত শুনে ১৮৫ টাকা দেন। শেখ মুজিব ১১ টাকা দিয়ে বলেন, তোমার মত শিল্পীকে উপযুক্ত মর্যাদা দেওয়া হবে। ১৯৬৯ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে করিমের গণসংগীত শুনে আবেগে আপ্লুত হয়ে শেখ মুজিব দাঁড়িয়ে মাইকে বলেছিলেন, শেখ মুজিব বেঁচে থাকলে করিম ভাইও বেঁচে থাকবেন। ১৯৭০ এর নির্বাচনে শেখ মুজিবের ভাটি অঞ্চলের প্রচারাভিযানে একমাত্র মধ্যমণি ছিলেন শাহ আব্দুল করিম।
১৯৮৬ সালে শেখ হাসিনা যখন এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারাভিযান চালাতে ভাটি অঞ্চলে আসেন তখন তার সফর সঙ্গী ছিলেন শাহ আব্দুল করিম। ১৯৯৫ সালে শেখ হাসিনা সুনামগঞ্জের দিরাই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের জনসভায় শাহ আব্দুল করিমকে বলেছিলেন, ’আমার বাবা যার গানের ভক্ত ছিলেন, আমি তাকে উপযুক্ত সম্মান দেব। ২০০১ সালে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউসে এক কর্মী সভায় বলেছিলেন, সুনামগঞ্জে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠায় শাহ আব্দুল করিমের ভূমিকা অন্যতম।

‘কোন মেস্তরি নাও বানাইলো কেমন দেখা যায়, ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নায়’, ‘গাড়ি চলে না, চলে না, চলে না রে’, ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’, ‘সখী কুঞ্জ সাজাও গো’সহ অসংখ্য গানের রচয়িতা আব্দুল করিম এ পর্যন্ত প্রায় দেড় সহস্রাধিক গান লিখেছেন এবং সুরারোপ করেছেন। বাংলা একাডেমির উদ্যোগে তার ১০টি গান ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। কিশোর বয়স থেকে গান লিখলেও কয়েক বছর আগেও এসব গান শুধুমাত্র ভাটি অঞ্চলের মানুষের কাছেই জনপ্রিয় ছিল। তার মৃত্যুর কয়েক বছর আগে বেশ কয়েকজন শিল্পী বাউল শাহ আব্দুল করিমের গানগুলো নতুন করে গেয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করলে তিনি দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেন।

শাহ আবদুল করিমের গানের বিভিন্ন বই প্রকাশিত হয়েছে। ১৯৪৮ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় আফতাব সঙ্গীত, ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত হয় গণসংগীত, ১৯৮১ সালে কালনীর ঢেউ, ১৯৯০ সালে ধলমেলা, ১৯৯৮ সালে ভাটির চিঠি, ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয় শাহ আবদুল করিম রচনা সমগ্র।

উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে সাউন্ড মেশিন নামের একটি অডিও প্রকাশনা সংস্থা তার সম্মানে জীবন্ত কিংবদন্তীঃ বাউল শাহ আবদুল করিম নামে বিভিন্ন শিল্পীর গাওয়া তার জনপ্রিয় ১২ টি গানের একটি অ্যালবাম প্রকাশ করে। এই অ্যালবামের বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ তার বার্ধক্যজনিত রোগের চিকি‍ৎসার জন্য তার পরিবারের কাছে তুলে দেয়া হয়। ২০০৭ সালে বাউলের জীবদ্দশায় শাহ আবদুল করিমের জীবন ও কর্মভিত্তিক একটি বই প্রথমবারের মতো প্রকাশিত হয়, ‘শাহ আবদুল করিম সংবর্ধন-গ্রন্থ’ (উৎস প্রকাশন) নামের এই বইটি সম্পাদনা করেন লোকসংস্কৃতি গবেষক ও প্রাবন্ধিক সুমনকুমার দাশ। শিল্পীর চাওয়া অনুযায়ী ২০০৯ সালের প্রথম দিকে সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের উদ্যোগে বাউল আব্দুল করিমের সমগ্র সৃষ্টিকর্ম নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

শাহ আবদুল করিমের জনপ্রিয় কিছু গান: বন্দে মায়া লাগাইছে, পিরিতি শিখাইছে, আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম, গাড়ি চলে না, রঙের দুনিয়া তরে চায় না, তুমি রাখ কিবা মার, ঝিলঝিল ঝিলঝিল করেরে ময়ুরপংখী নাও, তোমার কি দয়া লাগেনা, আমি মিনতি করিরে, তোমারও পিরিতে বন্ধু, সাহস বিনা হয়না কভু প্রেম, মোদের কি হবেরে, মানুষ হয়ে তালাশ করলে, আমি বাংলা মায়ের ছেলে, আমি কূলহারা কলঙ্কিনী, কেমনে ভুলিবো আমি বাঁচি না তারে ছাড়া, কেন পিরিতি বাড়াইলারে বন্ধু, মন মিলে মানুষ মিলে, সময় মিলেনা, সখী তুরা প্রেম করিওনা, কাছে নেওনা দেখা দেওনা, মন মজালে, নতুন প্রেমে মন মজাইয়া, বসন্ত বাতাসে সইগো, আইলায় না আইলায় নারে বন্ধু, মহাজনে বানাইয়াছে ময়ুরপংখী নাও প্রভৃতি।

বাউল শাহ আবদুল করিমের এ পর্যন্ত ৭টি গানের বই প্রকাশিত হয়েছে। তার মৃত্যুর কিছুদিন আগে সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে তার রচনাসমগ্র (অমনিবাস)-এর মোড়ক উন্মোচিত হয়েছে। এছাড়াও সুমনকুমার দাশ সম্পাদিত শাহ আব্দুল করিম স্মারকগ্রন্থ (অন্বেষা প্রকাশন) তার মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। এর আগে-পরে শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে সুমনকুমার দাশের ‘বাংলা মায়ের ছেলে : শাহ আবদুল করিম জীবনী’ (অন্বেষা প্রকাশন), ‘সাক্ষাৎকথায় শাহ আবদুল করিম’ (অন্বেষা প্রকাশন), ‘শাহ আবদুল করিম’ (অন্বেষা প্রকাশন), ‘বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম’ (উৎস প্রকাশন), ‘গণগীতিকার শাহ আবদুল করিম’ (উৎস প্রকাশন) প্রকাশিত হয়। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ঢাকার প্রখ্যাত প্রকাশনাসংস্থা প্রথমা থেকে প্রকাশিত হয় সুমনকুমার দশের ‘শাহ আবদুল করিম : জীবন ও গান’ বইটি। এ বইটি ইতোমধ্যেই একটি প্রামণ্য জীবনী হিসেবে বোদ্ধামহলে স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছে। এ বইটিতে করিমের নির্বাচিত বেশ কিছু গানও সংকলিত হয়েছে। শাহ আবদুল করিমের জীবনভিত্তিক প্রথম উপন্যাস সাইমন জাকারিয়া রচিত “কূলহারা কলঙ্কিনী” প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে।

বাউল শাহ আব্দুল করিম ২০০১ সালে একুশে পদক লাভ করেন। শাকুর মজিদ তাকে নিয়ে নির্মাণ করেছেন ভাটির পুরুষ নামে একটি প্রামাণ্য চিত্র। এছাড়াও সুবচন নাট্য সংসদ তাকে নিয়ে শাকুর মজিদের লেখা মহাজনের নাও নাটকের ৮৮টি প্রদর্শনী করেছে।
প্রতিবার প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে তার উজানধলের সমাধি ও বাড়ি ঘিরে জড়ো হন অসংখ্য ভক্ত। বাড়িতে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, স্মরণসভা এবং রাতভর চলে বাউল করিমের গানের আয়োজন। তবে এবার করোনা পরিস্থিতিতে অনেকটা নীরবেই যাবে এই বাউলসম্রাটের মৃত্যুবার্ষিকী।

  • সাদিকুল আলম

সুনামগঞ্জমিরর/এসএ

শেয়ার করুন