হাওরে উড়াল সড়ক: পর্যটকদের ভবিষ্যতের মায়াবী গন্তব্য

সুনামগঞ্জ জেলার অনন্য প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও ভৌগলিক অবস্থান সমগ্র বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চল হতে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। জেলার বেশিরভাগ অঞ্চলই হাওর-বাওর ও অপেক্ষাকৃত নীচু অঞ্চল নিয়ে গঠিত। বৎসরের প্রায় ৭/৮ মাস জলমগ্ন থাকে। বর্ষার সময় এখানে সমুদ্রের মতো ঢেউ খেলে এবং গ্রামগুলোকে মনে হয় এক একটি ছোট ছোট দ্বীপ। জেলাটি ধানের রাজধানী হিসেবে খ্যাত হলেও এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রূপ লোভনীয়। এ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় রয়েছে ২৫টির বেশি পর্যটন কেন্দ্র। প্রতিদিন হাজার হাজার ভ্রমণপিপাসুদের পদচারণা পড়লেও এর যাতায়াত ব্যবস্থার অপ্রতুলতা রয়েছে। বর্তমান সরকার সেদিকে দৃষ্টি দিয়েছেন এবং বড় একটি স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে সুনামগঞ্জবাসীদের।

উড়াল সড়ক

প্রায় সাড়ে ১৩ কি.মি. দৈর্ঘ্যের সড়ক নির্মাণ হতে যাচ্ছে, এই দৃষ্টিনন্দন সড়ক প্রকল্পটি হাওরের ভেতর দিয়ে সুনামগঞ্জ থেকে নেত্রকোনা পর্যন্ত যাবে। প্রকল্পব্যয় হিসেবে ধরা হয়েছে তিন হাজার কোটি টাকা। সম্ভাব্য মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৫ সাল পর্যন্ত। এই প্রকল্পে প্রায় ১০৭ কি.মি. দৃষ্টিনন্দন সড়ক হবে। আরও প্রায় ২৮ কি. সড়ক ডুবন্ত নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে আরো কয়েক কি.মি. ডুবন্ত সড়ক, ইউনিয়ন ও উপজেলা সড়ক থাকবে।

উপজেলা সড়কে ২ হাজার ৯৮৭ মিটার ও ইউনিয়ন সড়কে আরো ৬৮৫ মিটার সেতু এবং ৭৭৫ মিটার কালভার্টও নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের সবকিছুই হবে দৃষ্টিনন্দন ও চোখ ধাঁধানো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রকল্পটি এ মাসেই একনেকে অনুমোদন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কারণ হাওরের প্রকৃতি বিবেচনা করেই বিরল উড়াল সড়ক নির্মাণের কাজ প্রধানমন্ত্রীর মাথা থেকেই এসেছে।

সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মানান এমপি বলেছেন, উড়াল সড়কের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে এই অঞ্চল পুরোপুরি ব্যবসা ও পর্যটনের জন্য একটি নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। পর্যটকরা সহজেই সুনামগঞ্জে প্রবেশ করে হাওরের উড়াল সড়ক দিয়ে নেত্রকোনা হয়ে ঢাকা চলে যেতে পারবেন। এই কাজ শেষ হলে বেসরকারি উদ্যোক্তারা হোটেল-মোটেল নির্মাণ, হাওরে ঘুরার জন্য নৌকা-স্পিডবোটসহ নানা ব্যবস্থার আয়োজন করবে। এই অঞ্চল ব্যবসা ও পর্যটনের জন্য পুরোপুরি খুলে দিতে যা প্রয়োজন তাই করবে সরকার। সরকারিভাবে উড়াল সড়কের দুই পাশে কিছু দূর দূর কিছু ‘ইয়ূথ হোস্টেল’ করা হবে। টিনশেডের বাংলো টাইপের হোস্টেল, এর ভবনের নকশায় কোন আভিজাত্য থাকবে না। সেখান থেকে দেখা যাবে হাওরের মনোরম দৃশ্য, ঘুরতে আসা পর্যটকরা উপভোগ করবেন হাওরের বিশুদ্ধ বাতাস। সেই সাথে হোস্টেলগুলোতে পানি ও রান্নাবান্নার ব্যবস্থা থাকবে। পর্যটকরা নিজেরা নিজেরদের সুবিধামতো রান্না করে খাবেন, থাকা বাবদ নেওয়া হবে সামান্য টাকা।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেছেন, সুনামগঞ্জ এতদিন কুমারি ছিল। সম্পদ ও সম্ভাবনা থাকলেও সুযোগের অভাবে সুনামগঞ্জকে ব্যবহার করা যাচ্ছিল না। তাই এখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সময় এসেছে উন্নয়নের। আমরা এখন সুনামগঞ্জকে খুলে দিতে চাই। যাতে সারা দেশ এখানে প্রবেশের সুযোগ পায়। ব্যবসা-বাণিজ্য পর্যটন সম্প্রসারণ হয়।

হাওরের ভেতর দিয়ে উড়াল সড়ক নির্মাণে হাওরের প্রাণবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে কি না বা এ বিষয়টি মন্ত্রী বলেন, হাওরের প্রাণ ও প্রকৃতি রক্ষার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী খুবই আন্তরিক। তিনি আমাদের স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন প্রাণবৈচিত্র্য ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে হাওরের কোনো উন্নয়ন হবে না। তার নির্দেশনা মাথায় রেখেই আমরা হাওরের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য উড়াল সড়কের জন্য পৃথক ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার চিন্তা করছি। উড়াল সড়কে যানবাহনের শব্দ থেকে হাওরে প্রাণবৈচিত্র্যের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সেজন্য শব্দ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উড়াল সড়কের পাশাপাশি যোগাযোগ বিড়ম্বিত হাওরের যোগাযোগ উন্নয়নে ‘হাওর এলাকায় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্প নিয়ে এখন কাজ চলছে। এই প্রকল্পে প্রাথমিক প্রাক্কলন ধরা হয়েছে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। ইতোমধ্যে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠকও সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের বিভিন্ন দিক যাছাই-বাছাই করা হয়েছে।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত চিন্তা-ভাবনা থেকে হাওরে উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হবে।  যার কারণে উড়াল সড়কটির নাম হবে ‘শেখ হাসিনা উড়াল সড়ক’। তবে তার কানে নামকরণের বিষয়টি এখনো জানানো হয়নি। একনেকে অনুমোদনের পরে নামকরণের বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে। প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত পাওয়ার পর নামকরণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। দিরাই থেকে শাল্লা, আজমিরিগঞ্জ-বানিয়াচং-হবিগঞ্জ হয়ে হাওরের বুক চিরে একটি মহাসড়ক নির্মাণ প্রকল্প একনেকে পাশ হওয়ার পর কাজও শুরু হয়ে গেছে। মোহনগঞ্জ-নেত্রকোণার সঙ্গে একটি এবং দিরাই-হবিগঞ্জের সঙ্গে আরেকটি মহাসড়ক হলে হাওরের যোগাযোগ চিত্র পাল্টে যাবে।

প্রকল্প সূত্রে আরও জানা যায়, ১৯০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে উপজেলা সব মৌসুমের জন্য সড়ক ১০৬ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার, উপজেলা সাবমারজিবল সড়ক ২৮ দশমিক ২১ কিলোমিটার, ইউনিয়ন সব মৌসুমের সড়ক ১৯ দশমিক ২০ কিলোমিটার, ইউনিয়ন সাবমারজিবল সড়ক ১৪ দশমিক ৬৯ কিলোমিটার, গ্রাম সাবমারজিবল সড়ক ৮ দশমিক ১৭ কিলোমিটার এবং উপজেলা এলিভেটেড (উড়াল) সড়ক ১৩ দশমিক ৪১ কিলোমিটার। পাশাপাশি উপজেলা সড়কে ২ হাজার ৯৮৭ মিটার ব্রিজ, ইউনিয়ন সড়কে ৬৮৫ মিটার ব্রিজ, উপজেলা সড়কে ৬৬৭ মিটার কালভার্ট, ইউনিয়ন সড়কে ৭৫ মিটার কালভার্ট এবং গ্রাম সড়কে ৩৩ মিটার কালভার্ট নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রকল্প প্রসঙ্গে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খান বলেন, সুনামগঞ্জ বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানের মতো নয়। হাওরের কারণে এই জেলার অধিকাংশ উপজেলা বিচ্ছিন্ন। এসব উপজেলায় যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য এলিভেটেড  এক্সপ্রেসওয়েসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।

মোহনগঞ্জ-নেত্রকোণার সঙ্গে একটি এবং দিরাই-হবিগঞ্জের সঙ্গে আরেকটি মহাসড়ক হলে হাওরের যোগাযোগ চিত্র পাল্টে যাবে। বলতে গেলে খুলে যাবে সুনামগঞ্জের সব সম্ভাবনার দ্বার। ব্যবসা-বাণিজ্য-যোগাযোগ এবং পর্যটনখাতেও বিরাট পরিবর্তন আসবে।

  • সাদিকুল আলম
    তথ্যসূত্র: কালের কণ্ঠ

সুনামগঞ্জমিরর/এসএ

শেয়ার করুন