অজানা সেই শিখা সতেরো

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পৃথিবীর বুকে জন্ম নেয় নতুন একটি রাষ্ট্র। বিশ্ব মানচিত্রে যুক্ত হয় বাংলাদেশের নাম। টানা ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে ত্রিশ লক্ষ শহীদের প্রাণ আর দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা। শহীদের আত্মত্যাগ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নিখাদ দেশপ্রেমের চূড়ান্ত ফসল হলো আমাদের এই বাংলাদেশ। যা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনার অন্যতম উদাহারণ। অপূরণীয় ত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই অজানা। দেশের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে অবসর সময়ে পরিবার পরিজন নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান থেকে। এসব দর্শনীয় স্থান ভ্রমণের মাধ্যমে চিত্তবিনোদনের পাশাপাশি নিজ দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক জানা অজানা বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা যায়। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত দর্শনীয় স্থান নিয়ে আজকের লেখা।

ছাতক-সিলেট সড়কের মাধবপুর-লালপুর সেতু সংলগ্ন স্থানে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিজড়িত ১৭ জন তরতাজা যুবকের স্মৃতিগাঁথা ‘শিখা সতেরো’ নামক স্মৃতিসৌধ। আর এই সম্পর্কে এখনও দেশের অনেক মানুষের কাছে অজানা। মহান বিজয়ের মাসে দলমত নির্বিশেষে অনেকেই ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে ভিড় করেন সেখানে। বর্তমানে নতুন আঙ্গিকে সাজানো দৃষ্টিনন্দন শহীদ স্মৃতিসৌধটি মুক্তিপাগল সব শ্রেণি-পেশার মানুষের নজর কাড়ে। এ স্থানটি ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে।

‘শিখা সতেরো’ স্মৃতিসৌধ

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর দেশকে হানাদারমুক্ত করার সংকল্প নিয়ে আগস্ট-সেপ্টেম্বরের মাঝা-মাঝি সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ১৮ জন উদ্যমী যুবক দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে সমবেত হয়। তার ছাতকের নোয়ারাই এলাকার সুরমা নদী হয়ে ভারতের চেলায় ট্রেনিংয়ের জন্য রওনা দেন। নোয়ারাইয়ের বেতুরা এলাকা দিয়ে পথ অতিক্রমের সময় এই এলাকার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর রাজাকার স্থানীয় সাবেক চেয়ারম্যান মতছির আলী ওরফে ফকির চেয়ারম্যান এ খবর পেয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে কৌশলে যুবকদের তার বাড়িতে নিয়ে যায়। তার মিষ্টি কথায় সরল বিশ্বাসে যুবকরা ট্রেনিংয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করতে থাকে। কিন্তু সেই সময় ফকির চেয়ারম্যান তাদের ভারত না নিয়ে পাক হানাদার বাহিনীকে খবর দিয়ে এনে টগবগে যুবকদের পাক হানাদার বাহিনীর হাতে তোলে দেয়। যুবকরা কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই তাদের হাত-পা বেঁধে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী তাদের ছাতক থানায় নিয়ে যায়। এ সময় ছাতক বাজারের বাসিন্দা জাফর আহমদ কাবেরী নামের এক যুবক পালাতে সক্ষম হয়। তিনি বর্তমানে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। ঐ দিন বেঁধে রেখে তাদের রাতভর অমানবিক নির্যাতন করা হয়।

পরের দিন সন্ধ্যায় ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের লালপুল নামক স্থানে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে স্থানীয় কতিপয় লোক দিয়ে বড় একটি গর্ত খনন করা হয়। মুক্তিপাগল যুবকদের সেখানে নানাভাবে কষ্ট দিতে থাকে, কষ্ট আর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে তাদের কান্নার ভয়ংকর প্রতিধ্বনি। ভারি হয়ে উঠে এলাকার বাতাস। মূহুর্তের মধ্যে গর্জে উঠে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর মেশিনগান। তাজা রক্তে রঙ্গিন হয়ে উঠে লালপুল এলাকার সবুজ ঘাস। গুলি করার পর টেনে হেঁচড়ে তাদের যখন গর্তের মধ্যে ফেলে দেয়া হয় তখনও কারো মৃত্যু নিশ্চিত হয়নি। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় জীবন্ত ১৭ জন দামাল যুবককে নিমর্মভাবে মাটিচাপা দিয়ে নরপশুরা উল্লাসে মেতেছিল। পর দিন রাতে গ্রামের কিছু মানুষ এসে রক্তাক্ত দেহগুলো মাটি দিয়ে ঢেকে দেন। সেই সাথে দেশের আরো ১৭ জন সূর্যসন্তানের এখানে জীবন্ত সমাধি রচিত হয়। যা আজ ছাতক তথা দেশের মানুষের কাছে ‘শিখা সতের’ নামে পরিচিত। তাদের আত্মত্যাগ মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত করছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিভিন্নভাবে ব্যাপক অনুসন্ধানের পরও তাদের নাম-ঠিকানা খুঁজে পাওয়া যায় নি। নাম না জানা এই ১৭ যুবকের স্মৃতিসৌধকে পর্যটনের উপযোগী করে তুললে নতুন প্রজন্ম এখানে এসে স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারবে। তারা স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত হবে। স্বাধীনতাযুদ্ধে এ অঞ্চলের যেমন বীরত্বগাঁথা ইতিহাস রয়েছে, তেমনি রয়েছে কিছু কালো অধ্যায়, ‘শিখা সতেরো’ তারই একমাত্র সাক্ষী।

  • আসাদুর রহমান ইজাজ, স্টাফ রিপোর্টার

সুনামগঞ্জমিরর/এসএ

শেয়ার করুন