অবসরে যাচ্ছেন পিএসসি’র চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক

১৭ সেপ্টেম্বর অবসরে যাচ্ছেন সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক। আগামী ১৮ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) ড. মোহাম্মদ সাদিকের বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হবে। সে হিসেবে ১৭ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) শেষ কর্মদিবসে অবসরে যাচ্ছেন তিনি।

ড. মোহাম্মদ সাদিক

সুনামগঞ্জের এই কৃতিসন্তান দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক এই সংস্থার ১৩তম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পিএসসি জানিয়েছে, ১৭ সেপ্টেম্বর সংক্ষিপ্ত এক বিদায়ী সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই বিদায় নেবেন কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক। তবে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বড় ধরনের কোনো আয়োজন থাকছে না। অন্যদিকে বিদায়ী চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুস্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুস্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করার পর ড. মোহাম্মদ সাদিক বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের দর্শনার্থী বইয়ে তাঁর অনুভূতি লিপিবদ্ধ করেন।

পিএসসি’র সদস্য হিসেবে শপথগ্রহণ

২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে ড. মোহাম্মদ সাদিককে পিএসসির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় সরকার। সংবিধানের ১৩৮ (১) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি তাকে ওই পদে নিয়োগ দেন। এরপর ২ মে পিএসসির চেয়ারম্যান হিসেবে শপথ নেন ড. সাদিক। বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের সাবেক এই সচিব ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে সরকারি চাকরি থেকে অবসরগ্রহণের পর তার পিআরএল বাতিল করে পিএসসি’র সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। ২০১৪ সালের ৩ নভেম্বর থেকে তিনি কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সংবিধানের ১৩৯ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘পিএসসির চেয়ারম্যান বা কোনো সদস্যের দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ থেকে পাঁচ বছর বা ৬৫ বছর পূর্ণ হওয়া- এর মধ্যে যেটি আগে আসবে সে অনুযায়ী তিনি  কমিশনের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন।’ সে হিসেবে ৬৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় ড. মোহাম্মদ সাদিক চেয়ারম্যান পদ থেকে বিদায় নিচ্ছেন।

ড. মোহাম্মদ সাদিক পিএসসি’র চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন বিসিএস-সহ সবধরনের নিয়োগ পরীক্ষা ও পরীক্ষা পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। এছাড়া তার সময়কালেই সরকার কোটা প্রথা বিলুপ্ত করে। ৩৪তম বিসিএসে প্রিলিমিনারি পর্যায় থেকে কোটাপদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। বিষয়টি জানাজানির হবার পর প্রতিবাদে করেন চাকরিপ্রত্যাশীরা। আন্দোলনের মুখে পিএসসি প্রিলিমিনারি উত্তীর্ণ ১২ হাজার থেকে সংখ্যা বাড়িয়ে প্রায় ৪৬ হাজার পরিক্ষার্থীকে লিখিত পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেয়। সেসময় পিএসসি’র কার্যক্রম নিয়ে কিছুটা আস্থাহীনতা তৈরি হয়। পরবর্তীতে ড. মোহাম্মদ সাদিক দায়িত্বগ্রহণের পর স্বচ্ছতা ও আস্থার বিষয়টি নিশ্চিত করতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। কিছুদিন আগে প্রকাশ হওয়া ৪০তম বিসিএস থেকে কোটাপদ্ধতি বিলুপ্ত করা হয়েছে। এছাড়া নিয়োগে শতভাগ স্বচ্ছতা, বিসিএস উত্তীর্ণদের মধ্য থেকে বিভিন্ন দপ্তরে নন-ক্যাডারে সর্বোচ্চ সংখ্যক নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন তিনি। বিসিএসের দীর্ঘসূত্রিতা কমিয়ে আনা, বিষয়বস্তু ও পরীক্ষা কাঠামোয় পরিবর্তন, তিনজন পরীক্ষকের মাধ্যমে উত্তরপত্র যাচাই— এমন নানা ইতিবাচক পদক্ষেপের জন্য চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের কাছে সততা, আস্থা ও জনপ্রিয়তার প্রতীক হয়ে ওঠেন ড. সাদিক।

ড. মোহাম্মদ সাদিক

২০১৭ সালের জুলাইয়ে সুনামগঞ্জ মিররকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন, চাকরিক্ষেত্রে এই প্রজন্মের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে বিসিএস। সরাসরি দেশসেবায় আত্মনিয়োগ করার পাশাপাশি রয়েছে ঈর্ষণীয় সম্মান। সাম্প্রতিককালে বিসিএস পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তির বিপরীতে প্রতিবারই আবেদনকারীর সংখ্যা বাড়ছে। আগেকার সময়ের বিসিএসের চেয়ে এখনকার বিসিএসে বিষয়বস্তু, মানবণ্টন ও পরীক্ষা কাঠামোয় অনেক পরিবর্তন এসেছে। একসময় বিসিএসের ফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রিতা ছিল। একটি বিসিএসে নিয়োগ হতে বছর তিনেক সময় লাগত। এখন তা উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে। তিনি বলেন, রক্ত দিয়ে স্বাধীন হওয়া এই দেশে যারা প্রজাতন্ত্রের চাকরি করবেন, তারা নিশ্চয়ই দেশমাতৃকার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ

বিসিএস ১৯৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ সাদিক ১৯৫৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জে সদর উপজেলার ধারারগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম আলহাজ্জ্ব মোহাম্মদ মবশ্বির আলী এবং মাতা মরহুমা মাসতুরা বেগমের একমাত্র পুত্র তিনি। পিএসসিতে যোগদানের আগে তিনি সর্বশেষ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে নির্বাচন কমিশন সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এছাড়াও তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট অব অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (বিয়াম) ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক, বিসিএস প্রশাসন একাডেমির পরিচালক, সুইডেনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব হিসেবেও কর্মরত ছিলেন। তিনি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে নজরুল ইনস্টিটিউটের প্রথম সচিব ছিলেন।

সরকারের উচ্চপদস্থ আমলা হলেও ড. মোহাম্মদ সাদিক একজন স্বনামধন্য কবি হিসেবে পরিচিত। ২০১৮ সালে কবিতায় ‘বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন তিনি। তাঁর স্ত্রী জেসমিন আরা বেগম জুডিশিয়াল সার্ভিসের একজন সাবেক সদস্য, যিনি দেশের প্রথম নারী সলিসিটর হিসেবে অবসরগ্রহণ করেন। এর আগে জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। আর পুত্র মোহাম্মদ কাজিম ইবনে সাদিক এবং কন্যা মাসতুরা তাসনিম সুরমাকে নিয়ে তাঁদের সংসার।

শিক্ষাজীবনে সুনামগঞ্জের কৃতিসন্তান ড. সাদিক সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে থেকে উচ্চমাধ্যমিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে পারসোনাল ম্যানেজমেন্টে অধ্যয়ন ও ভারতের আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সিলেটি ‘নাগরী লিপি’ ছিল তাঁর গবেষণার বিষয়। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত আছেন। ‘জাতীয় কবিতা পরিষদ’ ও ‘বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি, বাংলা একাডেমী ও এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ-এর আজীবন সদস্য। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: আগুনে রেখেছি হাত (১৯৮৫), ত্রিকালের স্বরলিপি (১৯৮৭), বিনিদ্র বল্লম হাতে সমুদ্রের শব্দ শুনি (১৯৯১), কে লইব খবর (২০১০), নির্বাচিত কবিতা (২০০৫) এবং শফাত শাহের লাঠি (২০১৭)। এছাড়া ‘কবি রাধারমণ দত্ত: সহজিয়ার জটিল জ্যামিতি (২০১৭)’ নামে একটি জীবনীগ্রন্থও প্রকাশ হয়েছে। নাইজেরিয়ার বিখ্যাত ঔপন্যাসিক চিনুয়া এচিবি-র বিখ্যাত উপন্যাস ‘No Longer at Ease (১৯৬০)’ বাংলায় অনুবাদ করেন ‘নেই আর নীলাকাশ’ নামে।

সুনামগঞ্জমিরর/টিএম/এসএ

শেয়ার করুন