৭ বছর কোমায় থাকা দেওয়ান তাছাওয়ারকে কর্ণেল পদে পদোন্নতি

সাতবছর ধরে কোমায় আছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা দেওয়ান মোহাম্মদ তাছাওয়ার রাজা। গত ১২ অক্টোবর ছিল তার চাকরির মেয়াদের শেষ দিন। সেই দিনটি এক অভাবনীয় আনন্দের ক্ষণ বয়ে আনে তার পরিবারের জন্য। গর্বিত করে সেনাবাহিনীকে। কোমায় থাকা লেফটেন্যান্ট কর্ণেল তাছওয়ারকে কর্ণেল পদে পদোন্নতি দেয় সেনাবাহিনী।

সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) ৩১৪ নম্বর কেবিন নন্দকুজায় চিকিৎসাধীন তাছাওয়ারকে কর্ণেলের র‍্যাংক ব্যাজ পরিয়ে দেওয়া হয় সেদিন। শয্যাশায়িত অবস্থাতেই পরানো হয় ইউনিফর্ম। এমন ঘটনা বিশ্বের কোনো দেশের সেনাবাহিনীর ইতিহাসে বিরল বলে জানা গেছে। সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের মহানুভবতায় এমন অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হল।

যখন সুস্থ ছিলেন, তখন বাহিনীতে সুনামের সঙ্গে দায়িত্বপালন ও বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন দেওয়ান তাছাওয়ার।

২০১৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে, পদোন্নতি পাবার কিছুদিন আগেই কর্মরত অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হন মরমী শিল্পী হাছন রাজার বংশধর দেওয়ান তাছাওয়ার। এরপর গভীর কোমায় আচ্ছন্ন হয়ে তিনি আট বছর ধরে সিএমএইচে আছেন। তাকে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনতে চেষ্টার কমতি করেননি চিকিৎসকরা। এরই মধ্যে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তাকে বিদেশেও পাঠিয়েছিল। কিন্তু স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেননি দেওয়ান তাছাওয়ার। হার্ট অ্যাটাকের পর তার হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতা ফিরে এলেও, সচল হয়নি মস্তিষ্কের চেতনা। তবে চিকিৎসকরা এখনো আশা করেন, তাছাওয়ার একদিন জেগে উঠবেন।

প্রিয় মানুষটির চেতনা ফিরে আসার দীর্ঘ ক্লান্তিহীন অপেক্ষায় তার স্ত্রী মোসলেহা মুনিরা রাজা, ছেলেমেয়ে ও সহকর্মীরা। এর মধ্যে এমন পদোন্নতির ঘটনা সবার চোখে আনন্দের জল এনে দেয়। কৃতজ্ঞতার বাঁধনে আবদ্ধ করে সবাইকে।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, তাছাওয়ার ৩১ বছর ৩ মাস চাকরিজীবনের সমাপ্তি ঘটল এই পদোন্নতির মধ্য দিয়ে। ‘কিং অব দ্য ব্যাটেল’ বা সাঁজোয়া কোরের এই চৌকস কর্মকর্তার ছিল বর্ণাঢ্য কর্মজীবন। প্রশিক্ষক, অধিনায়ক হিসেবে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তার রয়েছে গবেষক ও লেখক হিসেবে খ্যাতি। সহকর্মীদের মধ্যে ছিলেন সদালাপী, জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য কর্মকর্তা। চাকরিজীবনে দেশ-বিদেশে ‘স্টাফ কোর্স’সহ সম্পন্ন করেছেন বেশ কয়েকটি প্রশিক্ষণ।

সিলেট ক্যাডেট কলেজের সাবেক এই ছাত্র ১৯৮৯ সালে ২০তম লং কোর্সের সঙ্গে সাঁজোয়া কোরে কমিশন লাভ করেন। তিনটি সাঁজোয়া রেজিমেন্টে বিভিন্ন পদে চাকরিসহ ঘাটাইল সেনানিবাসে একটি রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। তার অধীন ইউনিটটি ২০০৮ সালে ডিভিশনে সেরা ইউনিট হওয়ার গৌরব অর্জন করে।

এ ছাড়া ‘আর্মার্ড স্কুল’ ও ‘পদাতিক স্কুলের’ (এসআইএন্ডটি) রণকৌশল প্রশিক্ষক ছিলেন দেওয়ান তাছাওয়ার। প্রশিক্ষক হিসেবেও তার ছিল বিশেষ খ্যাতি।

কর্নেল তাছাওয়ার রাজা ইরাক, কুয়েতে শান্তিরক্ষা মিশনে বিশেষ অবদানের জন্য ‘পিস মেডেল’ এ ভূষিত হন। তিনি বাংলাদেশ ও পাকিস্তান স্টাফ কলেজ সম্পন্ন করেন এবং চায়না-আমেরিকা থেকে সাঁজোয়া যানের ওপর প্রশিক্ষণ নেন। এ ছাড়া তিনি মিরপুর স্টাফ কলেজের একজন গ্র্যাজুয়েট এবং সেখানকার প্রশিক্ষক হন।

মরমী সাধক হাছন রাজার এই বংশধর কর্মজীবনে লিখেছেন একাধিক বই। এর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো ‘হাছন রাজা’, ‘জেনারেল ওসমানি: ও জেনারেল মাই জেনারেল’, ‘বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাস’, ইত্যাদি।

কর্ণেল তাছওয়ারের স্ত্রী মুনিরা রাজা বলেন, সাতবছরের বেশিসময় ধরে তিনি অচেতন। কঠিন সংগ্রাম করে চলেছি আমরা। তাছাওয়ার রাজাকে তার কর্মের যোগ্য প্রতিদান দিয়েছে সেনাবাহিনী, যা আমাদের আজীবন কৃতজ্ঞতার বাঁধনে আবদ্ধ করে রাখবে। পদোন্নতির মাত্র কিছুদিন আগেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। সেসময় খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। কিন্তু সেনাবাহিনী যে সম্মান দেখালো, সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যাবেনা।

তথ্যসূত্র: ঢাকাটাইম্স২৪

সুনামগঞ্জমিরর/টিএম

শেয়ার করুন