করোনায় স্থবির সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গন

জল জোছনার শহর সুনামগঞ্জ। হাওরের ঢেউ আছড়ে আছড়ে জোছনা খেলা করে। সেই জলের বুকে জোছনার খেলা দেখে চরম বেরসিক মানুষও টান দেয় গানে। এই শহরের সবার প্রাণে প্রাণেই যেন গান, কবিতা, ছন্দ। শহরকে তাই বলা হয় কবির শহর, গানের শহর। পুরো বাংলাদেশের কাছে যা সংস্কৃতির রাজধানী।

সুনামগঞ্জ শহর গান, কবিতা ও নাটকে মেতে থাকে সবসময়। মঞ্চ মাতিয়ে রাখেন সাংস্কৃতিক কর্মীরা। কিন্তু করোনাভাইরাস নামক অদৃশ্য শত্রুর কারণে গত ছয়মাস ধরে স্থবির হয়ে আছে গোটা পৃথিবী, আর তাতে স্থবির হয়ে আছে সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনও।

কেমন কাটছে সময়—প্রশ্নের উত্তরে প্রসেনিয়াম থিয়েটারের নাট্যকর্মী দেবাশীষ তালুকদার শুভ্র বলেন, মার্চ থেকে প্রায় ৬ মাস মঞ্চের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলাম। সুনামগঞ্জের সকল সংস্কৃতিককর্মীরই এমন অবস্থা৷ তবে এর মাঝে শিল্পের সকল মাধ্যমের অনেক কর্মীরাই অনলাইনকে প্লাটফর্ম হিসেবে নিয়েছেন। বিশেষ করে ফেসবুক লাইভে গান, আবৃত্তি, নৃত্য নিয়মিত প্রদর্শিত হয়েছে। কয়েকটি থিয়েটার নাটকও অনলাইনে প্রদর্শনের চেষ্টা করেছেন। তবে মঞ্চভিত্তিক কোনো আয়োজন না থাকার ফলে পেশাদার কর্মীদের অনেকই নিয়মিত উপার্জন থেকে বঞ্চিত। ফেসবুক লাইভে যাদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে, মঞ্চের মত করে যদি তাদের জন্য সম্মানীর ব্যবস্থা করা হয় তবে তাদের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হতো।

শুভ্র বলেন, তিনি নিজের আবৃত্তির ভিডিও, কিছু তথ্যচিত্র নির্মাণ করে ফেসবুক ও ইউটিউবে প্রচার করেছেন। অনলাইনে শিক্ষার্থীদের আবৃত্তির ক্লাসও নিচ্ছেন নিয়মিত।

শুধু নিজেদের কাজ নয়, সাংগঠনিকভাবে সুনামগঞ্জ প্রসেনিয়াম থিয়েটার এই করোনাকালীন দূর্যোগ ও বন্যায় নানান ভাবে আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে বলে জানালেন শুভ্র। আর গত ১৭ অক্টোবর প্রসেনিয়াম থিয়েটারের ১৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শহরের রিভার ভিউয়ে নাটক, গান ও আবৃত্তি প্রদর্শন করা হয়েছে, যা সুনামগঞ্জে করোনা পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর ঘরের বাইরে প্রথম কোনো সাংস্কৃতিক আয়োজন।

উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর নাট্য বিভাগের সম্পাদক পুলক রাজ বলেন, দীর্ঘ সাতমাস যাবৎ কোন মঞ্চে নাটক মঞ্চস্থ করতে পারছি না। প্রায়ই ইচ্ছা হয় একা একা কোন মঞ্চে উঠে সংলাপ দিয়ে আসি। তবে এখন করোনা ভাইরাসের ভয় অনেকটা কমেছে। তাই সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে আগামী ২৯ অক্টোবর ধর্ষণবিরোধী পথনাটক ‘ঝড়’ নিয়ে মঞ্চে আসবেন তারা।

আরেক নাট্যকর্মী তাজকিরা হক তাজিন বললেন, ব্যক্তিগতভাবে আমার সময় ভালো গেলেও সংস্কৃতি কর্মী হিসেবে আমার মাঝেমধ্যেই মন খারাপ হয়। আমরা যারা সংস্কৃতি কর্মী তারা সংস্কৃতি চর্চা করে যেমন আত্মতৃপ্তি পাই, তেমনি আমরা বিশ্বাস করি সংস্কৃতির মাধ্যমে আমরা সাধারণ মনুষের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারি। কিন্তু করোনার কারণে আমরা সাধারণ মানুষের সাথে দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছি।

জেলা কালচারাল অফিসার আহমেদ মঞ্জুরুল হক পাভেল চৌধুরী বলেন, করোনাকালে মঞ্চকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান স্থগিত থাকায় পেশাজীবী শিল্পীরা উপার্জনহীন হয়ে আর্থিক সংকটের মধ্যে জীবন যাপন করছেন। সরকারিভাবে এ জেলার ৯০ জন শিল্পীকে ৫০০০ টাকা করে এককালীন প্রণোদনা দেয়া হয়েছে, যা বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে খুবই সামান্য। জল-জোছনার জনপদ সুনামগঞ্জের শিল্পীর সংখ্যা অন্যান্য জেলার বিপরীতে অনেকগুণ বেশি। এ কারণে বিপুল সংখ্যক পেশাজীবী শিল্পীরা বঞ্চিত হয়েছেন। জেলা প্রশাসন ও জেলা শিল্পকলা একাডেমি নিজস্ব উদ্যোগে জেলা সদরের শিল্পীদের শুভেচ্ছা উপহার দিয়েছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক বন্যাগ্রস্ত শিল্পীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। মহাপরিচালক মহোদয়ের অর্থায়নে ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বন্যার সময় বন্যাকবলিত ১০০ জন শিল্পীকে ঈদ উপহার পৌছে দেওয়া হয়। শিল্পীদের পাশে দাঁড়াতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

  • বর্ষা রায় চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, সুনামগঞ্জ মিরর

সুনামগঞ্জমিরর/টিএম

শেয়ার করুন