মহেশখলা মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ

হাওর-পাহাড়-নদী আর সীমান্ত সংলগ্ন স্থানে নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষার্থে দৃষ্টিনন্দন মহেষখলা স্মৃতিসৌধটি পর্যটকদের মনেও অন্যরকম দোলা দিচ্ছে। আর এই স্মৃতিসৌধটি পর্যটকদের নজর কাড়ছে দিন দিন। সুনামগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের যতগুলো স্মৃতিসৌধ রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও আকর্ষণীয় হলো এটি। দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিসৌধটি সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার মধ্যনগর থানার গারো পাহাড়তলি এলাকা নির্মিত।

দৃষ্টিনন্দন এ স্মৃতিসৌধটি দেখতে মেঠোরঙা। কংক্রিটের তৈরি। এর পূর্ব-পশ্চিম দিকে সমান্তরাল দুটি উঁচু দেয়ালের ৯ ফুট বেদির ওপর দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতিসৌধের মূল কাঠামো। এর পূর্বদিকে রয়েছে মহেশখলা নদী। উত্তর-দক্ষিণের ২৭ ফুট উঁচু দেয়ালের দুই দিকে প্রায় ২৪টি ছোট-বড় জানালা হাট করে খোলা থাকে। ১৮ হাজার ৭০০ বর্গফুট জায়গার ওপর নির্মিত স্মৃতিসৌধ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকা। স্মৃতিসৌধটির ভেতর দিয়ে অনায়াসে যাতায়াত করা যায়। ভেতরের নিচের অংশে বসানো আছে টাইলস। উঠতে নামতে আকর্ষণীয় সিঁড়ি ব্যবহার করা হয়েছে। এর আশেপাছে রয়েছে কয়েকটি তালগাছ। দেখে মনে হয় মাথা উঁচু করে নিয়ত শহীদদের শ্রদ্ধা জানাচ্ছে।

আরও জানা যায়, ১৯৭১ সালে এখানে ১১নং সেক্টরের ১নং ‘মহেশখলা’ সাব সেক্টরের প্রধান কার্যালয় ছিল। মুক্তিযুদ্ধের প্রোজ্জ্বল স্মৃতিধারণকারী এই স্থানে সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক ব্যারিস্টার এম. এনামুল কবির ইমনের পরিকল্পনায় জেলার ছাতক উপজেলার সন্তান স্থপতি রাজন দাস এই স্মৃতিসৌধটির আকর্ষণীয় নকশা করেছিলেন। আর ২০১২-২০১৩ সালে সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদ দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেছিল।

স্থপতি রাজন দাশের এই কাজটি সুইজারল্যান্ডের বেসেল শহরের ভুবনবিখ্যাত সুইস আর্কিটেকচার মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হয় ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে। বাংলাদেশের বিগত দিনের সেরা ৩০টি স্থাপত্যকর্মের মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হয়।

স্থানীয় সাংবাদিক মিঠু আহমেদ জানান, দৃষ্টিনন্দন স্মৃতিসৌধটি নির্মাণ করায় আগামী প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের অনেক স্মৃতি বহন করবে। কারন ১৯৭১ সালে এখানে ১১নং সেক্টরের ১নং ‘মহেশখলা’ সাব সেক্টরের প্রধান কার্যালয় ছিল। দৃষ্টিনন্দন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক স্থানটি পড়ন্ত বিকেলবেলা আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। আর দিন দিন বাড়ছে পর্যটকদের আগমন।

স্থপতি রাজন দাস বলেন, মহেশখলা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক স্থান। আমি জানতে পারি মহেশখলা নদীর পশ্চিমপাড়ের এই স্থানে শহিদ মুক্তিসেনারা ঘুমিয়ে আছেন। মুক্তিযুদ্ধের এই সৌধ নির্মাণের আগে ঘরের ধারণা মনে আসে। তাদের স্মৃতি চিরজাগরুক রাখতেই ‘সব কটা জানালা খুলে দাওনা’ ভাবনাটি আমার মাথায় আসে। এই ভাবনা থেকেই আমি বদ্ধ ঘরের বদলে সবসময় আলো-হাওয়া চলাচল করে এমন ভাবনা নিয়েই সৌধটি নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করি।

তিনি বলেন, ঘুমন্ত এই শহিদ সেনাদের প্রাণের জাগ্রত চেতনার রূপ দিতেই আমি ‘আশ্রয়স্থল’ এর মতো স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা করি। জুড়ে দেই জানালা। নদীটিও রূপ নেয় রূপকে। পরস্পরে স্বাধীনতা কথা বলা শুরু করে। স্থপতি জানালেন মাটিরঙা স্থাপনাটি দূর থেকে দেখলে মাটিরই মনে হবে।

সুনামগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত সবচেয়ে আকর্ষণীয় এই স্মৃতিসৌধটি প্রসঙ্গে স্থানীয় এলাকাবাসী ও পর্যটকগন জানান, স্থাপত্যশিল্পটি দেখতে সেতু বা ঘরের আদলে গড়া। স্মৃতিসৌধের উপরে আছে প্রশস্ত ছাদ; তার দুই দিক খোলা যার দুই দিকে দেয়াল। দেয়ালে জুড়ে দেয়া হয়েছে বেশ কিছু জানালা। এখানে ঘুমিয়ে থাকা একাত্তরের শহিদ সেনাদের হাওর ও বুনো পাহাড়ের নির্মল হাওয়া রাতদিন যেন মমতায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় যা অসাধারণ।

ধর্মপাশা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেন রুকন জানান,মুক্তিসেনাদের স্মৃতির উদ্দেশ্যেই নির্মিত দৃষ্টি নন্দন ও আকর্ষণীয় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্মৃতিসৌধটি জেলার অন্যান্য স্থাপনার চেয়ে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। দিন দিন এর আকর্ষণে বিভিন্ন স্থানের পর্যটকগণ আসছেন।

যেভাবে যাবেন: সুনামগঞ্জ থেকে সিএনজি বা মোটরসাইকেলে তাহিরপুর উপজেলায় যেতে হবে। সেখান থেকে নৌকা বা স্পিডবোটে করে মহেশখলা যাওয়া যায়। এছাড়া তাহিরপুরের বাদাঘাট ইউনিয়ন হয়ে ট্যাকেরঘাট হয়ে বাগলীর পর মোটরসাইকেল যোগে মহেশখলা যাওয়া যায়।

  • জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া

প্রিয় পাঠক, সুনামগঞ্জ মিরর সুনামগঞ্জের পর্যটন খাত নিয়ে কাজ করতে চায়। জেলার আনাচে কানাচের দৃষ্টিনন্দন স্থানগুলোর গল্প এক এক করে তুলে আনবে সুনামগঞ্জ মিরর। এ যাত্রায় সঙ্গে থাকবেন। এছাড়া, পর্যটন বিষয়ক যেকোনো তথ্যের জন্যও সুনামগঞ্জ মিররের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন; সঙ্গে আপনাদের মূল্যবান পরামর্শ ও মতামত জানাতে ভুলবেন না।

শেয়ার করুন