পাল্টে যাচ্ছে চিরপরিচিত সুনামগঞ্জ

পুকুর ছিল, খাল ছিল, খেলার মাঠ ছিল, এখন নেই। হয়তো একদিন হাওরও থাকবে ন। চারিদিকে কেবল শূন্যতার আগমনী বার্তা হাতছানি দিয়ে ডাকছে।

কতবছর পর হাওর শূন্য হবে সুনামগঞ্জ সেই সময়কাল এখন হয়তো সঠিকভাবে বলা যাবে না। তবে শূন্য হওয়ার সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেয়া যায় না। হয়তো সেদিন আমি বা আমরা থাকবো না। নতুন এক প্রজন্ম আসবে যাদের কাছে পুকুর, খালবিল, মাঠ, হাওর এই শব্দগুলো নতুন মনে হবে। প্রবীণদের অনেকেই এখন বলেন, কী দেখলাম আর কী হলো, জানিনা বেঁচে থাকলে আরও কত কি দেখতে হবে!

আমাদের বয়সেও তো কম দেখিনি। বুলচান্দ স্কুলের মাঠ আজ অট্টালিকায় ঠাসা, ব্যক্তিমালিকাধীন সব বাসার পুকুর ভরাট হয়ে গেছে, কামারখাল সহ অন্যান্য খালগুলো আজ স্মৃতির ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে, মরাটিলার কবর স্থানের চারদিকে গড়ে উঠেছে অসংখ্য বসত ভিটা। হাওরে নির্মাণ হচ্ছে বড় বড় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিমালিকাধীন ভবন। কি হবে ভবিষ্যতে? হয়তো এমন এক সময় আসবে যেদিন ধান রোপণ করার জায়গাও থাকবে না হাওরে।

এখন সামান্য বৃষ্টির জলে শহরের মানুষ জলবন্দী হন, মাঠের অভাবে খেলাধুলা করতে না পেরে দূরন্ত কিশোর মোবাইলে ফ্রি ফায়ারে আসক্ত হচ্ছে, কারো বাসার সামনে এক ইঞ্চি খোলা জায়গা নেই, শীত মৌসুমে টিউবওয়েলে পানি আসে না। জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পেতে রাস্তা থেকে ৫/৬ ফুট উঁচুতে বাসার ভিটে তৈরি করছেন অনেকেই। অনেকেই ভাবছেন ভবিষ্যতে একতলা পর্যন্ত পানিতে ডুবে যাবে।

পৌর শহরের আবাসিক এলাকা ঘড়ির কাটার নিয়ম মেনে বাণিজ্যিক এলাকায় রূপান্তরিত হচ্ছে। অনেকেই বাসার সামনে গেট না দিয়ে গড়ে তুলছেন মার্কেট। সুনামগঞ্জ শহর তৈরি হচ্ছে বাণিজ্যিক শহরে। হয়তো একদিন ছাদ বাগানে সবজির বদলে ধান চাষ করবে মানুষ।

উঠোনে আর আসেনা ভোরের মিষ্টি সূর্যের আলো। অট্টালিকায় বাধাপ্রাপ্ত হয়। বর্ষায় সবুজ মাঠে জমে থাকা জলে ফুটবল নিয়ে যায় না দূরন্ত কিশোরের দল। কামারখাল দিয়ে যায় না মাটির হাঁড়িপাতিল কেনাবেচার নৌকা। মাঝির কণ্ঠে নেই উদাসী ভাটিয়ালি সুর। সময়-সভ্যতা এগিয়ে যাচ্ছে। কালের বিবর্তনে রূপ বদলাচ্ছে চিরপরিচিত সুনামগঞ্জ।

শুনেছি আমাদের বাসার পাশে বুলচান্দ স্কুলের মাঠে নামীদামী ফুটবল দলের খেলা হতো, যাত্রা আসতো, পুতুল নাচ আসতো, সার্কাস হতো। স্বপ্নের মতো মনে হয়, যখন এসব শুনি। একদিন শাহ আব্দুল করিমের গানের সুরে মন কাঁদবে–“আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম।”

  • অণীশ তালুকদার বাপ্পু, সাবেক অধ্যক্ষ, আলহাজ্ব মতিউর রহমান কলেজ, সুনামগঞ্জ।

সুনামগঞ্জমিরর/টিএম

শেয়ার করুন