প্রেমের শহর যেন যান্ত্রিক শহরে পরিণত না হয়

সুনামগঞ্জের পুরাতন কোর্ট নামক জায়গাটা একসময় একটা ভুতুড়ে জায়গা ছিল। জীর্ণশীর্ণ ভবন, রাত বাড়লে বসতো মাদকাসক্তদের আনাগোনা। পিএসসি’র সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিকের সৃজনশীল ভাবনা ও প্রচেষ্টায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এটি জাদুঘরে রূপ নেয়। এরপর এটি হয়ে ওঠে নানা উপলক্ষে উৎসব আয়োজনের অন্যতম কেন্দ্র। পুরো প্রকল্পটি যত্নের সাথে ব্যবস্থাপনা করেন জেলা প্রশাসনের তৎকালীন কর্মকর্তারা। জাদুঘরের আঙিনায় সামিয়ানা টাঙিয়ে নানাধরনের অনুষ্ঠান, মঞ্চনাটক, বিজ্ঞানমেলা, উদ্ভাবনী মেলা, লোকগানের উৎসব শুরু হয়।

দুই বছর আগেও সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘরের জায়গাটা আমার খুব পছন্দের ছিল। টিনের চালের সুন্দর ঘরটার উঠোনজুড়ে সবুজ ঘাস আমার ভীষণ ভালো লাগত। আমি প্রায়ই এই ঘাসে বসেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটিতে বাড়ি গেলে একবার এই জাদুঘর ঘুরে আসা আমার রুটিন ছিল। আমাদের সুনামগঞ্জ ডিবেটিং সোসাইটির ছেলেমেয়েরাও নিয়মিত সেখানে এসে আড্ডা জমাতো। আমি প্রায়ই টিকিট কেটে জাদুঘরের ভিতরে ঢুকতাম। শহরের ছোট একটা ফুসফুস ছিল এই সবুজ জায়গাটা।

স্থাপত্যের শিক্ষার্থী হিসেবে এসব খুঁটিনাটি বিষয়গুলো আমাকে অনেকখানি স্পর্শ করে। জানিনা কেন, হঠাৎ একদিন রাতে দুঃস্বপ্ন দেখলাম—জাদুঘরটা উঁচু দেয়ালে ঘিরে দেয়া হচ্ছে, তা দেখে আমি ছটফট করছি; খানিকক্ষণ পর আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো শ্বাসকষ্টের কারণে! আপনাদের মনে আছে কিনা জানিনা, আমাদের প্রিয় জুবিলী স্কুলও একবার উঁচু দেয়ালে ঢেকে দেয়া হচ্ছিল। পরে সেটি ভেঙ্গে আধখানা দেয়ালের উপর গ্রিল স্থাপন করা হয়। সে কারণে রাস্তা থেকে স্কুল ভবনটা দেখা যায়৷ একটা ভবনকে দূর্গের মত ঘিরে ফেললে সেটি কখনোই তার চারপাশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে না।

না, ঐতিহ্য জাদুঘরে উঁচু দেয়াল দেয়া হয়নি। তবে একপাশে একটি স্থায়ী কংক্রিটের মঞ্চ তৈরি হয়েছে। এই মঞ্চ জাদুঘর ভবনটার সৌন্দর্য অনেকটাই ম্লান করেছে। আমি জানিনা এটি আদৌ খুব প্রয়োজন ছিল কিনা। এখানে উঁচু দেয়াল নিয়ে দেখা আমার দুঃস্বপ্ন আক্ষরিক অর্থে সত্যি হয়নি, কিন্তু ঠিকই কয়েকদিন পর দেখলাম পুরো ঘাসের চাদরটা কংক্রিটে ঢেকে দেয়া হলো।

এখন সেখানে এক বিন্দু ঘাস নেই। আমার প্রিয় সেই সবুজের আচ্ছাদন ঢাকা পড়ে গেছে পাথরের নিচে। জাদুঘরটা এখন আর আগের মত কথা বলে না।
ইদানীংকালে কোর্ট মসজিদের পাশের সুন্দর টলমলে জলের পুকুরটা ভরাট করে সেখানেও নতুন আরেকটা মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। শহরের খালবিল জলাশয় কমছে। ড্রেজারের বালু খাল দিয়ে ভরাট হচ্ছে। সবশেষে সবকিছুর উপর বসছে কংক্রিটের প্রলেপ। উঁচু দেয়ালে ‘সুরক্ষিত’ করা হচ্ছে সব স্থাপনা, ঘর, বাড়ি।

মাত্র একটা উদাহরণ টেনেছি। শহরজুড়ে এমন অসংখ্য উদাহরণ। এককেন্দ্রিক উন্নয়নের সংস্কৃতির ফলে প্রতিনিয়ত শহরে মানুষ বাড়ছে। দ্রুতই শহরের উপর চাপ বাড়ছে। বাড়ছে যত্রতত্র স্থাপনা

আমার খুব কষ্ট হয়। আমাদের প্রেমের, গান ও কবিতার, ভালোবাসার শহরকে আমরা ইটপাথরে ঢেকে দিয়ে যান্ত্রিক শহরে পরিণত করতে হয়তো খুব বেশি বাকি নেই। এখনো সময় আছে, একটু সংবেদনশীল হোন। মানবিক পরিকল্পনা করুন, ভবিষ্যতের কথা ভেবে সুপরিকল্পিত স্থাপনা তৈরি করুন।

  • সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার
শেয়ার করুন