করোনার দ্বিতীয় ঢেউ থেকে বাঁচতে সতর্ক থাকুন

গত বছরের শেষের দিকে চীনের উহান থেকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়া কোভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাসের আক্রমণের এক বছর পেরিয়ে গেলেও সংক্রমণ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ইউরোপ, আমেরিকাসহ শীত প্রধান দেশগুলো করোনা ভাইরাসের আক্রমণে পর্যুদস্ত। লকডাউনের মতো কঠোর পদক্ষেপও কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারছে না। দেশগুলোতে এখন নতুন করে সংক্রমণের হার বাড়ছে। গতকাল আমেরিকায় চব্বিশ ঘন্টায় প্রায় দুই লাখ মানুষ আক্রান্ত এবং ২৮৬৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, সংক্রমণের বাড়তি হার করোনার দ্বিতীয় আক্রমণ বা সেকেন্ড ওয়েভকে নির্দেশ করছে।

বাংলাদেশে চলতি বছরের মার্চ মাসে প্রথম করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ে। এরপর এর হার ক্রমান্বয়ে বাড়তেই থাকে। মে মাস পর্যন্ত লকডাউন থাকার পরও রোগী শনাক্তের হার ছিল প্রায় বিশ শতাংশ। লকডাউন খোলার পর জালিয়াতির বিভিন্ন ঘটনা প্রকাশ পেলে করোনা পরীক্ষায় জনগণের আগ্রহ কমে যায়। ফলে শনাক্তের হারও কমে যায়। তবে শনাক্তের হার কখনোই ১১-১২ শতাংশের নিচে আসেনি। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। মধ্য নভেম্বরের পর থেকে হঠাৎ করেই আবার করোনা শনাক্তের হার বাড়ছে। গত এক সপ্তাহে রোগী শনাক্তের হার ছিলো প্রায় ১৫ শতাংশ। শনাক্তের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মৃত্যু। মাঝখানে মৃত্যু কমে এলেও, এখন দৈনিক ৩০ জন বা তার কাছাকাছি লোকের মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে। সংক্রমন এবং মৃত্যুর উর্ধ্বগতি স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টকে নতুন করে ভাবাচ্ছে।

কেউ কেউ বলছেন, করোনা দ্বিতীয় ঢেউ ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। তবে, আরো কয়েকদিনের ফলাফল পর্যালোচনা না করে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা যাবে না। করোনা ভাইরাসের উপর শীত বা গ্রীষ্ম ঋতুর কোনো প্রভাব আছে কিনা এ নিয়ে বিজ্ঞানীরা সন্দিহান। কিন্তু যেহেতু কোভিড-১৯ শ্বসনতন্ত্রের রোগ এবং শীতকালে শ্বসনতন্ত্রের রোগী বাড়ে, তাই এটা ধারণা করা হয় যে, শীত বাড়লে করোনার প্রাদুর্ভাবও বাড়বে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো টিকার অনুমোদন দেয়নি। ফাইজার নামক কোম্পানির টিকা ব্রিটেন এবং বাহরাইন অনুমোদন দিলেও, জনগণের মধ্যে প্রয়োগ শুরু হতে অনেক সময় লাগবে। বাজারে টিকা এলেও সেটা সহজলভ্য হতে বেশ দেরী হবে। তাই ততদিন পর্যন্ত করোনা থেকে বাঁচার জন্য মেনে চলতে হবে কিছু নিয়মকানুন। চলুন দেখে নিই সেসবের কিছু:

১. সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। গণজমায়েত হয় এমন জায়গা এড়িয়ে চলতে হবে। প্রয়োজন না হলে বাড়ির বাইরে যাওয়া উচিত নয়।

২. অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করুন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে দিয়েছে যে বাতাসের মাধ্যমে করোনা ভাইরাস ছড়াতে পারে। তাই নিজ এবং অন্যের সুরক্ষার জন্য বাইরে বের হলেই মাস্ক পরিধান করুন। মাস্ক পরিধানের উপর সরকার বেশ জোর দিচ্ছে। তাই এই মাস্ক ব্যবহারের বিষয়টা সতর্কভাবে খেয়াল রাখুন।

৩. আইসোলেশন এবং দ্রুত টেস্ট: করোনা কোনো লক্ষণ (জ্বর, সর্দি, শুকনা কাশি, শ্বাসকষ্ট, স্বাদ ও গন্ধ চলে যাওয়া) দেখা দিলে অবশ্যই আইসোলেশনে চলে যান। অন্যের সংস্পর্শে এসে তাকেও ঝুঁকিতে ফেলবেন না। দ্রুত টেস্ট করিয়ে নিশ্চিত হোন। হাসপাতাল গেলে টেস্ট করানোর পাশাপাশি আপনাকে ঔষধও দেয়া হবে। তাই হাসপাতালে সেবা নিন।

৪. শিশুদের জন্য বাড়তি সতর্কতা: আমাদের সবার মাঝে একটা ধারণা আছে যে শিশুদের করোনা কম হয়। আসলে কথাটি সঠিক নয়। বিদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। যদিও আমাদের দেশে এই হার কম, তবুও সাবধান থাকতে হবে। শিশুকে অকারণে বাইরে যেতে নিরুৎসাহিত করুন। বের হলে অবশ্যই মাস্ক পড়িয়ে নিন। নিয়মিত গোসল এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার উপর জোর দিন।

৫. বৃদ্ধ এবং রোগাক্রান্তরা বেশি ঝুঁকিতে: যাঁরা বৃদ্ধ অথবা দীর্ঘ মেয়াদি রোগে (ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, হাঁপানি, হেপাটাইটিস, এইডস) ভুগছেন, তাঁদের জন্য করোনার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। তাই বাড়ির বয়োবৃদ্ধ বা রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য নিতে হবে বাড়তি ব্যবস্থা। তাঁদেরকে নিরাপদ দূরত্বে রাখতে হবে, স্যানিটেশন, পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত চেকআপ এবং নিয়মিত ঔষধ খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। বাইরে থেকে কেউ এলে অবশ্যই বাইরের জামাকাপড় বাইরেই রেখে অন্য কোনো জামা পড়ে ঘরে ঢুকতে হবে। জামাকাপড় বা মানুষের শরীর করোনা ভাইরাসের বাহক হিসেবে কাজ করে।

৬. ভয় নয়, চাই সচেতনতা: করোনা একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ। একটু সতর্ক হলেই এর প্রতিরোধ সম্ভব। তাই ভয় না পেয়ে সচেতন হতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি নিজে মেনে চলতে হবে, অন্যকে মানতে উৎসাহিত করতে হবে।

৭. শীতে কি করবো? শীতকালে করোনা থেকে একটু বাড়তি সাবধান থাকতে হবে। শীতকালে অনেকে প্রতিদিন গোসল করেন না, সেটা বাদ দিতে হবে। কুসুম গরম পানি দিয়ে নিয়মিত গোসল করতে হবে। বাইরে থেকে এসেই হাতমুখ ধুতে হবে। বুকে যাতে (বিশেষত শিশু ও বৃদ্ধদের) ঠান্ডা না লাগে সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। সর্দি বা কাশি থাকলে গরম পানি পান করুন। সকাল বেলা গরম পানিতে সামান্য লবণ মিশিয়ে কুলকুচা করলে সর্দি কাশি কিছুটা কমবে। গলাব্যথা বা গলা ভাঙার জন্য গরম আদা বা লেবুর চা খেতে পারেন। আইসক্রিম, কোল্ড ড্রিংকস অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে। শীতকালে প্রচুর ফল এবং শাকসবজি পাওয়া যায়। সেগুলো নিয়মিত খেতে পারেন। তাহলে দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পাবে।

৮. ভুলবেন না মনের কথা: এই দীর্ঘ মহামারির সময়ে হতাশা বা দুশ্চিন্তা আসা অস্বাভাবিক নয়। তাই সেগুলো থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার জন্য ব্যস্ত থাকতে হবে। নিজের পছন্দের কাজ যেমন ছবি আঁকা, বাগান করা, বই পড়া, লেখালেখি করতে পারেন। এগুলো একদিকে যেমন মন ভালো রাখবে, তেমনি বাড়াবে ব্যক্তিগত দক্ষতা।

করোনা মহামারি একসময় কেটে যাবে। মানুষ আশা নিয়ে বাঁচে। তাই আমরাও চাই সবাই আশা নিয়ে বাঁচুক,সুন্দরভাবে বাঁচুক। এতক্ষণ ধৈর্য্য ধরে যাঁরা পড়েছেন তাঁদের ধন্যবাদ। আগামীকাল একটি সুন্দর দিন দেখার জন্য আসুন সবাই সতর্ক থাকি।

  • মোঃ মুয়াজ্জাজুর রহমান মুয়াজ, বিভাগীয় সম্পাদক, সুনামগঞ্জ মিরর
শেয়ার করুন