১৯৭৪ সালে জুবিলীর প্রধান শিক্ষককে সাংসদ আব্দুর রইছের লেখা চিঠি

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নতুন প্রত্যয়ে বাংলাদেশ বিনির্মাণে আত্মনিয়োগ করেন। ৭০ এর বিজয়ের পর জাতির জনক তাঁর আস্থার মানুষদের নিয়ে গড়ে তোলেন ৭৩ এর জাতীয় সংসদ। সুনামগঞ্জের আব্দুর রইছও তখন একজন সাংসদ। জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আব্দুর রইছ সুনামগঞ্জের সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ফলাফল ও শিক্ষার মানের খুঁটিনাটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। বিদ্যালয়ের মানোন্নয়নের জন্য প্রধান শিক্ষক বরাবরে একটি চিঠি লিখেন তিনি।

সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ের পুরোনো কাগজের স্তুপ থেকে চিঠিটি সংগ্রহ করেছেন বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও বর্তমানে আইনজীবী হিসেবে কর্মরত অ্যাডভোকেট কল্লোল তালুকদার চপল।

চিঠির কপিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তুলে ধরে আব্দুর রইছের সন্তান ফজলুল কবীর তুহিন লিখেছেন, একজন শিক্ষকের কাছে আমার বাবার লেখা একটা আবেদনপত্র দেখে বেশ গর্ববোধ হচ্ছে, একইসঙ্গে সূক্ষ্ম আত্মগ্লানিও অনুভূত হচ্ছে। ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতাটি আমরা সবাই কমবেশি পড়েছি, না পড়লেও আমরা জানি বাবা মায়ের পরেই শিক্ষকের স্থান। জানলেও বর্তমানে কতখানি আমরা সেটি মননের মধ্যে রাখি তা ভাববার বিষয়। বিশেষ করে এ দেশের সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা—এমন যারা রয়েছেন তারা একজন শিক্ষককে আজকের এই দিনে কোন জায়গায় রেখেছেন, সেটি আমরা অনুধাবন করতে পারি। ১৯৭৪ সালে আমার বাবা জাতীয় সংসদ সদস্য থাকাকালীন সময়ে তিনি সুনামগঞ্জ জুবিলী স্কুলের প্রধান শিক্ষকের কাছে যে পত্রটি লিখেছিলেন, সেটি নতুন প্রজন্মের জন্যে রয়ে যাক।

সুনামগঞ্জ মিররের পাঠকদের জন্য সেই চিঠিটি হুবহু তুলে ধরা হল:

মাননীয় প্রধান শিক্ষক,
সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়,
সুনামগঞ্জ, জিলা- সিলেট

জনাব,
সুনামগঞ্জ সরকারী জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় বিরাট জনসমষ্টি অধ্যুষিত ও দেশের এক প্রান্তে অবস্থিত অনগ্রসর সুনামগঞ্জ মহকুমার একমাত্র সরকারী বালক উচ্চ বিদ্যালয়। অতীতে এই বিদ্যালয় দেশের একটি আদর্শ বিদ্যালয় হিসেবে উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব প্রদর্শন করিয়া এতদঞ্চলে শিক্ষার আলো বিতরণ করিয়া আসিয়াছে। ইদানীং এই বিদ্যালয়ের সেই সুনাম আর নাই। নানা কারণে বিদ্যালয়ের সামগ্রিক অবস্থা দিন দিন অবনতির দিকে যাইতেছে, ইহারই ফলে বিদ্যালয়ের বিদ্যালয়ের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের পাশে হার দিন দিন কমিয়া যাইতেছে। এই ক্রমবনতির চরম প্রকাশ ঘটিয়াছে গত মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার ফলের মধ্যে। এই পরীক্ষায় বিদ্যালয়ের ৮৩ জন পরীক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ৩০ জন বিভিন্ন বিভাগে উত্তীর্ণ হইয়াছে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয়ের অবনতির জন্য দায়ী নিম্নলিখিত কারণসমূহের প্রতি আপনার কৃপাদৃষ্টি আকর্ষণ করিতে চাই।

১। বিগত ১৯৬৭ সালে স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ খোলা হইয়াছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত এইজন্য কোন অতিরিক্ত শিক্ষক দেওয়া হয়নাই।

২। বিদ্যালয়ের ৭/৮ জন শিক্ষকের পদ খালি থাকা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইয়াছে। এমনকি প্রধান শিক্ষকের পদও দীর্ঘ আট মাস খালি থাকার পর কয়েকদিন আগে নবনিযুক্ত প্রধান শিক্ষক কার্যভার গ্রহণ করিয়াছেন। নিম্নে খালি পদগুলির নাম দেয়া গেল।
খালি পদসমূহের নাম: ক. বাণিজ্য শিক্ষক, খ. প্রধান মৌলভী, গ. দ্বিতীয় পণ্ডিত, ঘ. দ্বিতীয় মৌলভী, ঙ. বিজ্ঞান শিক্ষক, চ. মাতৃভাষা শিক্ষক, ছ. লাইব্রেরিয়ান, জ. নাইটগার্ড, ঝ. চৌকিদার, হিন্দু হোস্টেল, ঞ. অফিস পিয়ন।

৩। সাধারণ বিজ্ঞান পড়াইবার জন্য বিদ্যালয়ে কোন বিজ্ঞান শিক্ষকের পদ নাই। দীর্ঘদিন ধরিয়া বিএসসি সহকারী শিক্ষক দ্বারা কাজ চালানো যাইতেছে।

৪। ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পর হইতে আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে পড়াইবার জন্য কোন শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করা হয়নাই। ক্লাসিকাল বিষয়ের শিক্ষকদের দ্বারাই কোনমতে কাজ চালানো যাইতেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য হয়, প্রত্যেক শ্রেণিতে দুইটি শাখা থাকায় এবং মুসলমান ছাত্রদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় একই শিক্ষককে ৬০/৭০ জনের ক্লাসে শিক্ষাদানের নিষ্ফল প্রয়াস চালাইয়া যাইতে হইতেছে। কাজেই মুসলিম ধর্মশিক্ষার জন্য একজন অতিরিক্ত শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করা বাঞ্ছনীয়।

৫। স্কুলের সুন্দর ও সমৃদ্ধ লাইব্রেরির সদ্ব্যবহার ও ছাত্রদের পাঠ্যপুস্তক বহির্ভুত জ্ঞান আকর্ষণের সুবিধার জন্য কোন লাইব্রেরিয়ান নাই।

৬। বিদ্যালয়ের ঘরসমূহ দীর্ঘদিন ধরিয়া মেরামতবিহীন পড়িয়া আছে।

৭। বিদ্যালয়ের চতুঃসীমা ঘিরিয়া কোন বেড়া বা প্রাচীর না থাকায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ একটি উন্মুক্ত গোচারণ ক্ষেত্র এবং সাপুড়ে, আনাড়ি ঔষধ বিক্রেতা ও ম্যাজিক প্রদর্শকের ব্যবসার ক্ষেত্রে পরিণত হইয়াছে। এইজন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষা পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হইতেছে।

আমি এই ব্যাপারে আপনার বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছি যে, উপরিউক্ত কারণসমূহ দূরীভূত না হইলে বিদ্যালয়ের জন্য ব্যয়িত সরকারের বিপুল পরিমাণ টাকা শুধু অপচয়েই পর্যবসিত হইবে।
অতএব এই ব্যাপারে আপনার ত্বরিত ও ফলপ্রসূ ব্যবস্থা গ্রহণ একান্তভাবে আশা করিতেছি।

ইতি
বিনীত
আব্দুর রইছ
জাতীয় সংসদ সদস্য

সুনামগঞ্জ
৪ এপ্রিল ১৯৭৪

জুবিলীর প্রধান শিক্ষককে সাংসদ আব্দুর রইছের লেখা চিঠি

জেলা আওয়ামীলীগের আমৃত্যু সভাপতি ছিলেন আব্দুর রইছ। ১৯৩১ সালের ১ মে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির সুনামগঞ্জ মহুকুমার জগন্নাথপুরের পাটলী ইউনিয়নের বনগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ ও জাতীয় সংসদ সদস্য। ১৯৭৩ সালের তিনি ১ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাবেক সিলেট-৩ (বর্তমানে সুনামগঞ্জ-৩) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

আব্দুর রইছ রাজনীতিতে গণতন্ত্রী ও এলডিএফ এর সাথে ছিলেন। তিনি ১৯৬৯ সালে আওয়ামীলীগে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত ১ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের আমৃত্যু সভাপতি। এর আগে সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দ্বায়িত্বও পালন করেন তিনি। তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সুনামগঞ্জ এ সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৮৭ সালে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

আব্দুর রইছের স্ত্রী রফিকা রইছও ছিলেন সুনামগঞ্জ জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের আমৃত্যু সভানেত্রী। এই দম্পতির সন্তান ফজলুল কবীর তুহিন একজন সাংস্কৃতিক সংগঠক ও অভিনেতা। আরেক সন্তান ড. খায়রুল কবীর রুমেন আইনজীবী ও সাবেক পিপি। কনিষ্ঠ সন্তান ব্যারিস্টার এম এনামুল কবীর ইমন বর্তমানে জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও এর আগে তিনি সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

আজ ১৮ ডিসেম্বর এই রাজনীতিবিদের মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮৮ সালের এইদিনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। সুনামগঞ্জ মিরর পরিবার তাঁকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে। 

সুনামগঞ্জমিরর/তাওসিফ/টিএম

শেয়ার করুন