শনিবার পৌর নির্বাচন

শনিবার ১৬ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ পৌরসভায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরই মধ্যে নির্বাচনের প্রায় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। তবে এ নির্বাচনে ভোটাররা মনে করছেন আওয়ামীলীগের প্রার্থীর তুলনায় অন্য দুই প্রার্থী মোটেও শক্তিশালী নন। ফলে মেয়র পদের ভোট নিয়ে তেমন আলোচনা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। তবে কাউন্সিলর পদের নির্বাচনী মাঠ জমে উঠেছে। নির্বাচনকে ঘিরে শহর ছেয়ে গেছে পোস্টারে। শহরের বিভিন্ন পয়েন্ট, অলিগলি, পাড়া-মহল্লায় প্রার্থীদের সাদাকোলো বিভিন্ন ডিজাইনের পোস্টার টাঙ্গানো হয়েছে। কে কার চেয়ে কে বেশি পোস্টার লাগাবেন— তা নিয়ে এক প্রকার অলিখিত প্রতিযোগিতাই চলছে বলা যায়।

মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী নাদের বখত, বিএনপি’র মুর্শেদ আলম ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মোহাম্মদ রহমত উল্লাহ।

জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জ পৌরসভার নয়টি ওয়ার্ডে তিনজন মেয়র প্রার্থী, ৪৮ জন সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ১৩ জন সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলরসহ মোট ৬৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ২৩টি কেন্দ্রের ১২৬টি ভোটকক্ষে ৪৭ হাজার ১৫ ভোটারের ভোটগ্রহণ করা হবে। ভোটারদের মধ্যে ২৩ হাজার ২৩৮ জন পুরুষ এবং ২৩ হাজার ৭৭৭ জন নারী।

সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত পৌরসভার অলিতে গলিতে প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন। প্রত্যেক পাড়া মহল্লায় ঝুলছে তাদের ছবিযুক্ত পোস্টার। কেউ মিছিল দিয়ে জানান দিয়েছেন, ‘১৬ তারিখ সারাদিন ধানের শীষের ভোট দিন’, ‘নৌকায় ভোট দিলে উন্নয়নের জোয়ারে ভাসবে সুনামগঞ্জ পৌরসভা’ বলে ভোটারদের বাড়িতে গিয়ে দিচ্ছেন নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি।

ভোটাররা বলছেন, অন্যান্য জেলার পৌরসভা থেকে সুনামগঞ্জ পৌরসভা উন্নয়নে অনেকটাই পিছিয়ে আছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই পৌরসভায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এমনকি শিশুদের বিনোদনের জন্য নেই কোনো পার্ক বা খেলার মাঠ। তাই সততার সঙ্গে যে পৌরসভার উন্নয়নে কাজ করবে এবং শহরকে সাজাবে- এমন প্রার্থীকে বেছে নিতে চান তারা।

আওয়ামীলীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী ও বর্তমান মেয়র নাদের বখত্ বলেন, ‘বিগত দুই বছর চার মাস যাবত জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সুনামগঞ্জ পৌরসভায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করেছি। প্রতিটি এলাকায় উঠান বৈঠকের আয়োজন করেছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে আমাকে মনোনয়ন দিয়েছেন। আমি দৃষ্টিনন্দন পৌরসভা গঠন করতে চাই। সবাই মিলে ভোটকেন্দ্রে যাবেন। আনন্দ উৎসবের মধ্য দিয়ে নৌকা প্রতীকে ভোট দেবেন।’

বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী মুর্শেদ আলম বলেন, ‘সড়ক, ড্রেনেজ, সড়কবাতি সমস্যার সমাধান এবং ইভটিজিং ও মাদকমুক্ত পৌরসভা গঠন করবো। মানুষ বিশুদ্ধ পানির সমস্যায় রয়েছেন, নিয়মিত সাপ্লাইয়ের পানি পাচ্ছেন না। বর্ষায় শহরে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। ময়লা আবর্জনা মানুষের বাড়ি-ঘরে ঢুকে যায়। শহরের বর্ধিত এলাকায় নেই কোনো আলোকবাতি। নির্বাচিত হলে এই সমস্যাগুলোর সমাধান করবো।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্কুল কলেজের ছাত্রীদের জন্য খেলার মাঠ তৈরি করবো। কারণ আমাদের শহরে মেয়েদের কোনো খেলার মাঠ নেই। ধানের শীষ মার্কায় ভোট দিয়ে আমাকে নির্বাচিত করলে আমি সব নাগরিক সমস্যার সমাধান করবো।’

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচনের জন্য আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। ইতোমধ্যে যারা নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবেন তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। আশা করি সুনামগঞ্জ পৌরবাসীকে সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে পারব।’

বৃহস্পতিবার (১৪ জানুয়ারি) আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার কাজ শেষ করেন প্রার্থীরা। শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন তারা। বড় দুই দলের প্রার্থীরা ভোটারদের মন জয় করার জন্য দিয়েছেন নানা প্রতিশ্রুতি।

এদিকে গত বুধবার (১৩ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় নাদের বখ্ত এর সমর্থনে শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে মঞ্চ তৈরি করে পথসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেছে জেলা আওয়ামী লীগ। শহরের হোসেন বখত চত্বর এলাকায় এই পথসভার মাধ্যমে নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের প্রশ্ন উঠেছে। সভা শুরুর পর ওই সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আপ্তাব উদ্দিন আহমদ এতে সভাপতিত্ব করেন। আয়োজনের উদ্যোক্তা ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এনামুল কবির ইমন। পথসভায় নাদের বখত উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও তিনি শেষ পর্যন্ত সভায় যোগ দেননি।

পৌরসভা (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা-২০১৫–এর ৭ ধারার খ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী জনগণের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে, এমন কোনো সড়কে পথসভা করতে পারিবেন না বা সভা করার উদ্দেশ্যে মঞ্চ তৈরি করতে পারবেন না।’ ব্যারিস্টার এনামুল কবির ইমন এ প্রসঙ্গে বলেন, হোসেন বখত চত্বর এলাকার যে সড়কে পথসভার জন্য মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল, তাতে মানুষের চলাচলের কোনো অসুবিধা হয়নি। চত্বর থেকে দক্ষিণ দিকে হাসপাতালে যাতায়াতের জন্য বিকল্প সড়ক আছে। বরং চত্বরে পথসভার আয়োজন করলে সমস্যা হতো বেশি।

এদিকে বিএনপি’র প্রার্থীও বিধি ভেঙ্গে শোভাযাত্রা করেছেন বলে জানা গেছে। বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী মুর্শেদ আলমের সমর্থনে পৌর শহরে শোভাযাত্রা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৪ ডিসেম্বর) বিকেলে শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া নেতা-কর্মীরা দল ও ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে স্লোগান দেন। প্রার্থীদের প্রচারণার শেষ দিনে ‘বড় জমায়েত’ নিয়ে শহরজুড়ে এই প্রচার মিছিল করেন তাঁরা।তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার নেতা-কর্মী ও সমর্থক এতে অংশ নেন। শহরে লিফলেট বিতরণ করেন তারা।

পৌরসভা (নির্বাচন আচরণ) বিধিমালা-২০১৫-এর ৭ ধারার ক অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁরা শোভাযাত্রা করতে পারেন না। এই অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, কোনো প্রার্থী ঘরোয়া ও পথসভা ছাড়া কোনো জনসভা বা শোভাযাত্রা করতে পারবেন না।

সুনামগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম বললেন, সড়কের ওপর মঞ্চ তৈরি করে কেউ পথসভা করতে পারবেন না। মিছিল, শোভাযাত্রা করারও নিয়ম নেই। এমন কার্যক্রম করলে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করা হবে। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবে প্রশাসন।

  • লিপসন আহমেদ

সুনামগঞ্জমিরর/টিএম

শেয়ার করুন