বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিশিষ্ট আইনজীবী বজলুল মজিদ খসরু আর নেই

সুনামগঞ্জের বিশিষ্ট আইনজীবী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু আর নেই (ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন)।

বুধবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ২টা ৫০ মিনিটে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান তিনি।

দুপুর সোয়া ৩টায় সিনিয়র আইনজীবী মল্লিক মঈন উদ্দিন সোহেল বিষয়টি নিশ্চিত করে সুনামগঞ্জ মিররকে বলেন, ‘আমাদের খসরু ভাই আর নেই। আমরা খসরু ভাইয়ের বাসায় যাচ্ছি। সেখানে মরদেহ নিয়ে আসা হচ্ছে।’ সেসময় আইনজীবী সমিতির একটি বৈঠক চলছিল। বৈঠক স্থগিত করে ছুটে আসেন আইনজীবীরা।

‘হাওর বাঁচাও আন্দোলন’ এর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু। আইনপেশা চর্চার পাশাপাশি একাধারে তিনি একজন লেখক, গবেষক, কলামিস্ট ছিলেন। ২০০০ সালে জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন। জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগতজ্যোতি পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

বজলুল মজিদ চৌধুরীর আদি নিবাস জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলায়। তবে তাঁর জন্ম শহরের ষোলঘরেই। ১৯৫২ সালের ২ এপ্রিল জন্ম নেয়া এই বীর মুক্তিযোদ্ধা সুনামগঞ্জ কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে ৫ নং সেক্টরে যোগদান করেন। ক্যাপ্টেন (পরবর্তীতে কর্ণেল) হেলালের অধীনে যুদ্ধ করেন চেলা সাব-সেক্টরে। ছাত্রজীবনে দৈনিক পূর্বদেশ ও দৈনিক সংবাদ-এর সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন। সুনামগঞ্জ জেলার প্রথম সাপ্তাহিক সুনাম তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। ‘একাত্তরের সুনামগঞ্জ’ ও ‘বরুণ রায় স্মারকগ্রন্থ’ সম্পাদনা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণার ফলস্বরূপ ‘রক্তাক্ত ৭১: সুনামগঞ্জ’ বইটি লিখেন। মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন হেলাল-খসরু হাইস্কুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি।

মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক পুত্র, এক কন্যাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও আত্মীয়স্বজন রেখে গেছেন। স্ত্রী মুনমুন চৌধুরী ছড়াকার ও গৃহিণী। পুত্র প্রকৌশলী ড. সউদ ফারহান দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্রে ইন্টেল কর্পোরেশনে কর্মরত। মেয়ে সারাফ ফারহিন দিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে এলএলবি ও এলএলএম সম্পন্ন করেছেন।

বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরুর সঙ্গে সবার সুসম্পর্ক ছিল। মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরপরই তাঁকে এক নজর দেখতে বাসায় ভীড় করেন শহরের বিশিষ্টজনসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি, সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল হুদা মুকুট, পৌর মেয়র নাদের বখত, আইনজীবী সমিতি, সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাব, সুনামগঞ্জ রিপোর্টার্স ইউনিটির সদস্যবৃন্দসহ সকলে গভীর শোক ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে হাঁটতে বের হয়ে খানিকটা অসুস্থ বোধ করেন তিনি। এসময় প্রাতঃভ্রমণকারীদের সংগঠন ‘সোনালী সকাল’-এর সদস্যরা তাঁকে বাসায় নিয়ে আসে। সুস্থ বোধ করার পর বুধবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) সকালে কোর্টেও যেতে চেয়েছিলেন তিনি।

বজলুল মজিদ চৌধুরীর গাড়িচালক বলেন, ‘চাচা সকালে কোর্টে যেতে চেয়েছেন। তবে উনাকে কিছুটা দুর্বল মনে হওয়ায় বললাম আজকে বিশ্রাম নিতে। পরে তিনি আমাকে বাড়ি চলে যেতে বলেন। দুপুর আড়াইটায় খবর পাই চাচা অসুস্থ হওয়ায় তাঁকে সদর হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে। ছুটে গিয়ে তাঁকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেখি। পরে সিলেট নেবার প্রস্তুতি নিতে আবার বাসায় ফিরি। গাড়ি নিয়ে হাসপাতালে যাবার পথেই খবর আসে চাচা আর নাই।’

পরিবারের বরাত দিয়ে সাংস্কৃতিক সংগঠক জাহাঙ্গীর আলম জানান, বৃহস্পতিবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টায় বজলুল মজিদ চৌধুরীর মরদেহ রাখা হবে আইনজীবী সমিতি চত্বরে। বেলা ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত শহীদ মিনারে এবং দুপুর ১২টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত পৌরসভা চত্বরে রাখা হবে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধার নিবেদনের জন্য। দুপুর ২টায় সুনামগঞ্জ পুরাতন কোর্ট জামে মসজিদে তাঁর প্রথম নামাজে জানাজা ও ষোলঘর জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে আড়াইটায় দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ষোলঘর কবরস্থানে দাফন করা হবে তাঁকে।

সুনামগঞ্জমিরর/টিএম

সুনামগঞ্জের প্রথম ইন্টারনেট সংবাদপত্র সুনামগঞ্জ মিরর ডটকম প্রতিষ্ঠাকালে উপদেষ্টা হিসেবে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু। পরম শ্রদ্ধেয় এই অভিভাবকের মৃত্যুতে সুনামগঞ্জ মিরর পরিবার গভীরভাবে শোকাহত। সুনামগঞ্জ মিরর তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছে ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছে। — সম্পাদক

শেয়ার করুন