শহর আজ কাঁদছে

আমাদের শহর আজ বিষণ্ণ। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, একজন বড়ভাই, একজন শান্ত-জ্ঞানী বিচক্ষণ মানুষ আজ আচমকাই চলে গেলেন। পৃথিবী নামক ভূমিতে কার ভ্রমণ কত দীর্ঘ হবে তা আমরা কেউই জানি না। আমরা শুধু আশাই করি যে আমরা সকলেই দীর্ঘ দিন সুখে শান্তিতে জীবন যাপন করবো। তবে কেউ গ্যারান্টি দিতে পারি না জীবনের স্থায়িত্বের। বিবাহজীবনে মানুষ সুখী হতে চায়। কেউ সুখী হয় কেউ হয় না। এদিক দিয়ে খসরু ভাই-মুনমুন ভাবী ছিলেন পরিপূর্ণ সুখী হাসিখুশী জুটি।

১৯৫২ সালে সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘরে জনাব বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু জন্মগ্রহণ করেন। শহরের জুবিলী হাইস্কুল থেকে মেট্রিক পাস করে সুনামগঞ্জ কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়া অবস্থায় ১৯৬৯ সালে সাংবাদিকতা শুরু করেন। যুগভেরী পত্রিকার মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। স্বাধীনতার পর তিনি দৈনিক সংবাদের সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত হন। পূর্বদেশ পত্রিকা বন্ধ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি এর দায়িত্ব পালন করেন।

সাংবাদিকতার পাশাপাশি সুনামগঞ্জ কলেজ থেকে বিএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি পশ্চিম জার্মানী চলে যান; সেখানে তিনি অনিয়মিত পত্রিকা ‘স্ট্রাগলস’ সম্পাদনা করে। ১৯৮৩ সালে তিনি দেশে ফেরার পর পুনরায় সাংবাদিকতা শুরু করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি দৈনিক কিষাণের সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। ১৯৮৪ সালেই তিনি সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হন। সুনামগঞ্জ মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত হওয়ার প্রথম দিন থেকেই তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক সুনাম। জনাব শহীদুজ্জামান চৌধুরী, আইনুল ইসলাম বাবলু, হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী, বিজন সেন রায়, শাহনেওয়াজ জাহান, জিয়াউল ইসলামের সম্পৃক্ততায় সাপ্তাহিক সুনাম যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করে।

খসরু ১৯৮৯ সালে ‘৭১-এর সুনামগঞ্জ’ সম্পাদনা করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রইউনিয়নের সঙ্গে ছাত্রাবস্থায় জড়িত ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সেক্টর-৫ এর অধীনে চেলা সাব-সেক্টরে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব খসরু মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি ট্রাস্টের ট্রাস্ট্রি, ক্যাপ্টেন হেলাল শিক্ষা ট্রাস্টের সম্পাদক, মুক্তিযুদ্ধ চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্রের আহ্বায়ক ও হাওর বাঁচাও কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন। আইনজীবী হিসেবেও অ্যাডভোকেট খসরুর জীবন ছিলো বর্ণাঢ্য। ১৯৯১ সালে সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ২০০০ সালে সভাপতি পদে নির্বাচিত হন। তার পাশাপাশি তিনি পাবলিক প্রসিকিউটরের দায়িত্বও পালন করেছেন। এছাড়াও তিনি রাইফেলস ক্লাবের সম্পাদক, জগৎজ্যোতি পাঠাগারের সম্পাদক ও শিল্পকলা একাডেমির যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ১৯৯৬ সালে দোয়ারাবাজার উপজেলার লক্ষ্মীপুরে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন হেলাল খসরু হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে এক পুত্র ও এক কন্যার জনক খসরুভাই। তার একমাত্র ছেলে সউদ ফারহান চৌধুরী দীপ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী সম্পন্ন করে যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছে। একমাত্র মেয়ে সারাফ ফারহীন চৌধুরী দীয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে এখন বাবার মতোই আইনজীবী। তার স্ত্রী মুনমুন চৌধুরী একজন কবি।

২০১৮-তে যখন দেশে এসেছিলাম- তখন আমার হাতে তাঁর দুটো বই তুলে দেন। যেকোন তথ্যের জন্য যোগাযোগ করলে সাথে সাথে জানাতে চেষ্টা করতেন। তাঁর মৃত্যুতে সুনামগঞ্জের শহরে আজ শোকের ছায়া নেমেছে। আমি তার মৃত্যুর খবর জানতে পেরেই তাঁর ষোলঘরের বাসায় যাই। যেয়ে দেখলাম মেয়র নাদের বখত সহ শহরের অসংখ্য মানুষ সেখা উপস্থিত। জাতীয় পতাকা দিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে রাখা ছিলো এই বীর মুক্তিযোদ্ধার দেহ। এ শহর যেন আজ সেই পতাকার তলে কাঁদছে।

  • রোমেনা লেইস
শেয়ার করুন