শ্রদ্ধা শাহরিয়ার চাচা

‘এই বিশিষ্ট সাংবাদিক, যিনি কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা মতামতের প্রতি ঝুঁকি না দিয়ে সর্বদা তাঁর লেখায় ভারসাম্য বজায় রেখেছেন।’ উইকিপিডিয়া এভাবে লিখেছে সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ারের পরিচয়।

হাসান শাহরিয়ারকে জানার আগে তাঁর পিতা মকবুল হোসেন চৌধুরীকে জানা খুব জরুরি।
অবিভক্ত আসাম-বাংলার বিশিষ্ট সাংবাদিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, ভাষাসংগ্রামী এবং সমাজসেবক ছিলেন মরহুম মকবুল হোসেন চৌধুরী। ১৯৩৭ সালে আসাম ব্যবস্থাপক সভার সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সুরমা উপত্যকা প্রতিনিধি দলের একজন সদস্য হিসেবে তিনি ১৯২০ সালে ভারতের নাগপুরে অনুষ্ঠিত সর্ব ভারতীয় কংগ্রেস সম্মেলনে যোগদান করেন। সরকার বিরোধী বক্তব্য দেয়ার অভিযোগে ব্রিটিশরাজ তাঁকে দু’বছর কারারুদ্ধ করে রাখে। কিছুদিনের জন্যে তিনি ইন্ডিয়ান জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিভাগের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

মকবুল হোসেন চৌধুরী ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন পত্রিকা সিলেটের ‘যুগভেরী’র (১৯৩২) প্রথম সম্পাদক। এর আগে তিনি সিলেটের ‘যুগবাণী’ (১৯২৫) ও কলকাতার দৈনিক ‘সোলতান’ (১৯৩০)-এর সম্পাদক ছিলেন। তার মেজ ছেলে হোসেন তওফিক চৌধুরী আইনজীবী ও কলামিস্ট; ছোট ছেলে বিশিষ্ট সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার।

মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী একবার এক লেখায় লিখেছিলেন, “প্রয়াত স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী কথা উঠলেই বলতেন, ‘একজন মকবুল হোসেনের ছবি আঁকুন লেখায়, বলায়।’
আমিনুর রশীদ চৌধুরীর কাছে যখনই কেউ সাংবাদিক হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করতেন বা চাকরির জন্য যেতেন, তখন তিনি বলতেন, মকবুল হোসেন চৌধুরীর মতো হতে পারবেন তো?”

হাসান শাহরিয়ার সেই কীর্তিমানের সন্তান। যিনি নিজেও সাংবাদিকতায় বিশ্বখ্যাতি অর্জন করেছেন।

২০১৪ সালে সুনামগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরীতে এক অনুষ্ঠানে তিনি গর্বের সঙ্গে বলেছিলেন ‘ কর্মজীবনে নীতি আর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হইনি’।

অনুষ্ঠান থেকেই প্রয়াত সাংবাদিক এডভোকেট আজিজুল ভাই আমাকে ফোনে জানিয়েছিলেন এ কথাটি।

আজিজুল ভাই আমাকে স্নেহ করতেন। তিনি যেহেতু চাচা ডাকতেন, আমিও চাচা ডাকতাম। সুনামগঞ্জ গেলে আজিজুল ভাই আমাকে নিয়ে যেতেন শাহরিয়ার চাচার বাসায়। অনেকরাত পর্যন্ত গল্প শোনাতেন। সাংবাদিকতার গল্প। রিপোর্টিং কৌশল। বলতেন- ‘বুঝছো, আজকাল রিপোর্ট পড়লে বা টিভিতে রিপোর্ট দেখলে মনে হয়, কেউ প্রেস রিলিজ পড়ে যাচ্ছে। আর শুধু কপি পেস্ট সাংবাদিকতা’।

শাহরিয়ার চাচার ক্যারিয়ার গ্রাফ দেখলে বোঝা যায়- সাংবাদিকতায় কতোটা বর্ণাঢ্য সময় পার করেছেন।

আজিজুল ভাই প্রায়সময় বলতেন, ‘শাহরিয়ার চাচাতো ফোন করলে তোমার কথা জিজ্ঞাস করেন সেজুল। তোমারেতো তানর খুব পছন্দ অইছে।’
আমিও খুব পছন্দ করতাম শাহরিয়ার চাচাকে৷ বেশি পছন্দ করতাম বলেই হয়তো দূরত্বটাও বেশি ছিলো৷ আমি ঢাকায় আসার পর দেখা হয়নি আর। একবার ফোন করে বললেন ল্যাপটপে কী জানি হয়েছে৷ পুরনো লেখা বের করতে পারছেন না। আমি যাবার আগেই বললেন, ওটা ঠিক হয়ে গেছে। বাসায় যেতে চেয়েও আর যেতে পারিনি।

উনার ভাই হোসেন তওফিক চৌধুরীও বর্নাঢ্য জীবনের অধিকারী৷ ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিভাগে এম এ পাস করেন। থাকতেন এস এম হলে। ১৯৬৯ সালে সাংবাদিকতা পেশায় জড়িয়ে যান। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৪ সালে দেশে লবন সংকট দেখা দেয়। দাম হয় আকাশচুম্বি। তিনি এসংক্রান্ত রিপোর্ট করে সাধারন মানুষের প্রশংসা কুড়ান। পড়েন সরকারের রোষানলে। হারান সাংবাদিকতার চাকরী। পরে চাকরী ফিরে পেলেও প্রত্যাখান করেন। সুনামগঞ্জে সিনিয়র ও প্রবীন আইনজীবি হিসেবে প্রশংসা কুড়ান।

শাহরিয়ার চাচা সুনামগঞ্জ গেলে, দুই ভাই মিলে জম্পেশ আড্ডা দিতেন। সেই আড্ডা আর হবে না। নিষ্ঠুর করোনা এভাবে নিজের করে নিচ্ছে কতো মহৎ প্রাণ। আমাদের শুধু বুক চাপড়ে দুঃখ পাবার কষ্ট। শ্রদ্ধা শাহরিয়ার চাচা।


সেজুল হোসেন
কবি, গীতিকার ও সাংবাদিক

শেয়ার করুন