৩ বছরেও পূর্ণাঙ্গ হয়নি সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের কমিটি

২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের ৩০ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটিকে এক বছরের জন্য অনুমোদন দেন। এতে দীপঙ্কর কান্তি দে-কে সভাপতি ও আশিকুর রহমান রিপনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। ২০১৮, ১৯ ও ২০ পেরিয়ে ২০২১ সালের ২৪ এপ্রিল আজ। তিন বছর অতিবাহিত হলেও এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ হয়নি সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের কমিটি।

তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন দায়িত্ব থেকে বিদায় নেয়ার পর সভাপতি হিসেবে আল নাহিয়ান জয় ও সাধারণ সম্পাদক পদে লেখক ভট্টাচার্য দায়িত্ব নেন। এদিকে সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির নির্ধারিত একবছর পেরিয়ে গেছে আরও আগেই। তবুও এই কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায় জেলা ছাত্রলীগের রাজনীতিতে একধরনের স্থবিরতা তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন নেতাকর্মীদের অনেকে। তারা বলছেন, তিনবছরেও কমিটি পূর্ণাঙ্গ না হওয়া দুঃখজনক। এতে যেমন কর্মীদের মনোবল নষ্ট হচ্ছে, তেমনি সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

জেলা ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটি

বর্তমান কমিটিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়াও সহসভাপতি হিসেবে রয়েছেন ১২ জন, যুগ্ম-সম্পাদক হিসেবে আছেন ৮ জন ও সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে আছেন ৮ জন। এধরনের সংক্ষিপ্ত কমিটি অনুমোদনের পর স্থানীয়ভাবে পূর্ণাঙ্গ কমিটি নির্ধারণের দায়িত্ব থাকে উপরিউক্ত পদপ্রাপ্তদের।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, জেলা শাখায় ১৫১ সদস্য বিশিষ্ট নির্বাহী সংসদ থাকবে। এতে সভাপতি ১ জন, সহসভাপতি ২১ জন, সাধারণ সম্পাদক ১ জন, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ৯ জন, সাংগঠনিক সম্পাদক ৯ জন থাকবে। এছাড়া প্রচার সম্পাদক ১ জন, দপ্তর সম্পাদক ১ জন, গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ১ জন, শিক্ষা ও পাঠচক্র বিষয়ক সম্পাদক ১ জন, সাংস্কৃতিক সম্পাদক ১ জন, সমাজসেবা সম্পাদক ১ জন, ক্রীড়া সম্পাদক ১ জন, পাঠাগার সম্পাদক ১ জন, তথ্য ও গবেষণায় ১ জন, ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদক ১ জন, অর্থ সম্পাদক ১ জন, আইন বিষয়ক সম্পাদক ১ জন, পরিবেশ সম্পাদক ১ জন, স্কুল ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক ১ জন, ছাত্রবৃত্তি বিষয়ে ১ জন, মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা বিষয়ে ১ জন থাকবে। বিভাগীয় উপ-সম্পাদক থাকবে ২৫ জন ও সহ-সম্পাদক ২৫ জন। সদস্য থাকবে ৩৫ জন।

গঠনতন্ত্রে আরও উল্লেখ আছে, জেলা শাখার কার্যকাল ১ বছর। এরমধ্যে নবনির্বাচিত কমিটিকে কার্যভার বুঝিয়ে দিতে হবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রের অনুমতিক্রমে ৯০ দিন সময় বাড়ানো যেতে পারে। এই সময়ের মধ্যে সম্মেলন না হলে কমিটি বিলুপ্ত বলে গণ্য হবে।

২০১৮ সালের ২৪ এপ্রিল সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সংক্ষিপ্ত কমিটি গঠনের পর দীর্ঘদিন ধরে সময়ক্ষেপণ হওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক ভিত। গ্রুপিং ও বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি সাংগঠনিক কোনো কর্মকাণ্ডে আগের মতো সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করছেনা নেতাকর্মীরা। অনেকেই ছোট ছোট অংশে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। আর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন না হওয়ায় তৃণমূল থেকে নুতন মুখ উঠে আসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

জানা যায়, এখন পর্যন্ত সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক স্বাক্ষরিত ৪টি উপজেলা কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। সুনামগঞ্জ জেলার অন্তর্গত ছাতক, মধ্যনগর ও জামালগঞ্জ উপজেলার কমিটি ৩ মাস এবং ধর্মপাশা উপজেলা কমিটি ১ বছরের জন্য ঘোষণা করা হলেও সেগুলোও পূর্ণাঙ্গ হয়নি। এরইমধ্যে পেরিয়ে গেছে মেয়াদ।

তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, উপজেলাগুলোতে কমিটি ঘোষণা করা হলেও অনেকটা নির্জীব ও স্থবির তাদের কার্যক্রম। এই ব্যর্থতার কারণ হিসেবে জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি জিসান এনায়েত রেজা দাবি করেন, বর্তমান কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বিভক্ত হয়ে কাজ করছেন। এমনকি তারা বিগত প্রায় ৩ বছরে ৩০ সদস্যের কমিটির পরিচিতি সভা কিংবা কোন বর্ধিত সভাও আয়োজন করেননি। তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সংগঠনে বিবাহিত, অছাত্র ও বখাটে ছেলেরা জায়গা পাচ্ছে। যেখানে অনেক ত্যাগী ও যোগ্য নেতাকর্মীদের নিয়ে কাজ করতে অনীহা পরিলক্ষিত হয়েছে অনেকবার।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জানান, বর্তমান কমিটির সহসভাপতি আবুল হাসনাত কাওছার পৌরসভার নির্বাচিত কাউন্সিলর। নির্বাচনে অংশ নিলে ছাত্রলীগের সদস্যপদ থাকেনা। সহসভাপতি আবু সাইদ আপন, ওয়াসিম মাহমুদ, তৌহিদ ইনসাফ বিবাহিত। আশরাফুল ইসলাম ইউপি সচিব হিসেবে চাকুরিরত।

ওই যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, সাংগঠনিক সম্পাদক শাহিন মিয়া চাকরিজীবী। মাহমুদুল হাসান বর্তমানে নারী সাংসদ শামীমা শাহরিয়ারের পিএস। ইশতিয়াক আহমেদ পিয়াল লন্ডন প্রবাসী ও কে.এম. তানভীর রশিদ ইমন বিবাহিত। ফলে দেখা যাচ্ছে এই কমিটির অনেক সদস্যই বর্তমানে ছাত্রলীগে থাকার কথা নয়। তাছাড়া পরিচিতি সভা না হওয়ায় অনেকেই অনেককে চেনে না।

অন্যদিকে সহসভাপতি লিখন আহমেদ বলেন, তিনবছরেও ছাত্রলীগের কমিটি পূর্ণাঙ্গ হয়নি, এটি সত্যি কথা। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে জেলা শাখার পূর্ণাঙ্গ কমিটির তালিকা জমা দেয়া হয়েছিল। কমিটি অনুমোদন করাতে তদবির করতে হয়। কিন্তু পরবর্তীতে করোনা পরিস্থিতির কারণে সেটি আটকে যায়। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে আমরা আবারও কেন্দ্রে যাব।

তবে জেলা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আসিফ বখত রাদের দাবি, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অনেকটা ব্যক্তি রাজনীতির দিকে ঝুঁকে আছেন। সুনামগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনেও সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা ছিলো না। ছাত্রলীগের ব্যানারে দেখা যায়নি বর্তমান সভাপতি অথবা সাধারণ সম্পাদককে। তিনবছরেও দলের কর্মসূচীকে বেগবান করতে ব্যর্থ হয়েছেন তারা। বর্তমান কমিটিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে নতুন কমিটি ঘোষণা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা, এমনটাই বলছেন রাদ।

জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান রিপন সুনামগঞ্জ মিররকে বলেন, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে কোনো বিভক্তি নেই। আমরা একসঙ্গে কাজ করছি। কেন্দ্রের কাছে ২৮১ সদস্য বিশিষ্ট পুরো কমিটির প্রস্তাব করা হয়েছিলো। বর্তমান কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার ব্যাপারে তেমন কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তবে আমরা আশা করছি অতিসত্বর কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হবে।

পরিচিতি সভা না হবার ব্যাপারে জিসান এনায়েত রেজার অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, পরিচিতি সভা হয়েছে। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদককে সাথে নিয়েই একটি বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে সুনামগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সুনামগঞ্জ-৪ আসনে আওয়ামী লীগ ও মহাজোট প্রার্থীদের বিজয়ের লক্ষ্যেও প্রেসক্লাবে এক বিশেষ বর্ধিত সভা করেছে জেলা ছাত্রলীগ।

এদিকে সাধারণ সম্পাদক ২৮১ সদস্যের কমিটির কথা বললেও সভাপতি দীপঙ্কর কান্তি দে বলছেন, ২০১৯ সালের ২৬ জুলাই কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কাছে জেলা কমিটির জন্য ২০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির প্রস্তাব করা হয়েছিলো। ৪টি উপজেলা কমিটির বাইরে কোন কমিটি হয়েছে কিনা—জানতে চাইলে দীপঙ্কর কান্তি দে বলেন, ধর্মপাশা উপজেলা কমিটি পূর্ণাঙ্গ করার ব্যাপারে কাজ চলছে। বাকিগুলো নিয়েও যথাসম্ভব চেষ্টা চলছে, স্থানীয় সক্রিয় নেতাকর্মীদের সাথে নিয়েই উপজেলা কমিটিগুলো গঠন করা হবে। বর্তমান কমিটির বিবাহিত সদস্যদের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ কমিটি হলে বিবাহিত ও চাকরিজীবী সদস্যরা বাদ পড়বেন। এছাড়া পৌরসভা নির্বাচনে ছাত্রলীগের অংশগ্রহণ না থাকার বিষয়টি ঠিক নয়। সংগঠনের ব্যানারে না হলেও ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় কর্মীরা সক্রিয় ছিল।

সুনামগঞ্জমিরর/আরএ/এসএন/এসএ/টিএম

শেয়ার করুন