তৃণমূলের বিজয়: কেন এবং কীভাবে?

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠন করতে না পারলেও ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনে তাদের অর্জন অনেক বেশি। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তারা মাত্র ৩ টি আসন পেয়েছিল। এবার তারা পেয়েছে ৭৭ টি আসন। সুতরাং পাঁচ বছরে এতো বড় উত্থান অবশ্যই তাদের জন্য বিরাট পাওয়া। নির্বাচনের শুরু থেকেই বিজেপি যে ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি করেছিল, সেটার ফলভোগী হয়েছেন মমতা ব্যানার্জি। বিজেপি হিন্দুত্বের দোহাই দিয়ে ভোট চেয়েছে, ফলে রাজ্যের ২৭ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটের প্রায় পুরোটাই গেছে মমতার ভাগে। বিজেপির এই অস্ত্র আপাত দৃষ্টিতে কার্যকরী মনে না হলেও এর সূদুরপ্রসারী প্রভাব আছে। পরের নির্বাচনে এই প্রভাব দেখা যাবে।

পশ্চিমবঙ্গের মানুষ যতোই নিজেদের যতোই অসাম্প্রদায়িক বলুন না কেন, তাঁরা সাম্প্রদায়িকতার উর্ধ্বে নন। কারণ বলছি। প্রথমত, একমাত্র হিন্দুত্ববাদের জিকির তুলেই বিজেপি ৩৭% ভোট পেয়েছে। এতো ভোট পাওয়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি বা কর্মকান্ড এ রাজ্যে তাদের ছিলো না। দ্বিতীয়ত, যে দলগুলো অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি চর্চা করে (সিপিআইএম, কংগ্রেস) তারা এবার কোনো আসনই পায়নি। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, এই ধাঁচের রাজনীতির উপর থেকে জনগণ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। এবারে নির্বাচনে ধর্মীয় মেরুকরণের পাশাপাশি স্থানীয় এবং বহিরাগত তকমা নিয়ে মাঠ সরগরম ছিলো। তৃণমূল নেতারা মোদি, শাহ জুটিকে সব সময়ই বাইরের লোক বলে আক্রমণ করেছেন। বর্গীদের সাথে তুলনা করেছেন। এর কিছুটা প্রভাব ভোটের বাক্সেও পড়েছে। বিশেষ করে মহিলা ভোটাররা স্থানীয় নেতাদের উপরই বেশি আস্থা রেখেছেন। ফলে তৃণমূল ভালো ভোট পেয়েছে।

এখন কথা হলো, ফুরফুরা দরবার শরীফের পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকী জোটে থাকার পরেও বাম কংগ্রেস কেন সংখ্যালঘু মুসলিম ভোটে ভাগ বসাতে পারেনি? কারণটা সহজ। আব্বাস সিদ্দিকী একজন ধর্মগুরু হয়ে জোট করেছেন অসাম্প্রদায়িক বাম কংগ্রেসের সাথে। সুতরাং এটা একধরণের দ্বিচারিতার মতো দেখায়। তাই জনগণ সেটা ভালোভাবে নেয়নি। আমার মনে হয় আব্বাস সিদ্দিকী যদি নিজের দল ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট নিয়ে একা নির্বাচন করতেন, তাহলেও তিনি ভালো ফলাফল করতে পারতেন। সেটা তিনি করেননি। সেটা না করারও কারণ আছে। আব্বাস সিদ্দিকী বক্তা হিসেবে তুখোড় হলেও তাঁর দলের নির্বাচনে জেতার মতো সাংগঠনিক শক্তি বা অভিজ্ঞতা কোনোটাই ছিলো না। তাই তাঁকে ভরসা করতে হয়েছে বাম কংগ্রেসের উপর। কিন্তু বাম কংগ্রেস যে আগে থেকেই হিসেবের বাইরে চলে গেছে, তিনি এ বিষয়টা ধরতেই পারেননি।

আট দফার নির্বাচনে এবার শুরুতে বিজেপি নিয়ে ক্রেজ ছিলো, বিজেপি শেষ পর্যন্ত সেটা ধরে রাখতে পারেনি। তৃণমূল থেকে নেতা ভাগিয়ে সহজে ইলেকশন জেতার ধান্দা ছিলো তাদের। কিন্তু ভোটগুরু প্রশান্ত কিশোর এবং মমতার ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জি এক্ষেত্রে বেশ ভালো রাজনীতি খেলেছেন। একটা এলাকায় দুজন প্রার্থী থাকলে তৃণমূল হাই কমান্ড শক্তিশালী প্রার্থীকে ভোটের টিকেট দিয়েছে। আর দুর্বল প্রার্থী অভিমান করে চলে গেছেন বিজেপিতে। বিজেপি সেই সুযোগ লুফে নিয়েছে। তারা আগপিছু চিন্তা না করেই তৃণমূলের সেই নেতাকে ভোটের টিকেট দিয়েছে। ফলে একটা এলাকায় যেখানে তৃণমূল-তৃণমূল বিরোধ ছিলো, সেই দলত্যাগের পর বিরোধটা হয়ে গিয়েছিল তৃণমূল-বিজেপির। এখানে শক্ত প্রার্থী তৃণমূলের, আর তৃণমূলের টিকেট না পাওয়া দুর্বল প্রার্থী হলেন বিজেপির। বুঝতে পেরেছেন রাজনীতিটা? নির্বাচনের পরে বিজেপি এটা ধরতে পেরেছে। এজন্য তারা কেন্দ্রিয় নেতৃত্বকে দুষছে, কারণ তাঁরা বারবার এসব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছেন। রাজ্যের নেতাদের কথায় কান দেননি। মোট ২৯৪ টি আসনের মধ্যে ১৪১ টি আসনের বিজেপি প্রার্থী ছিলেন দলবদলু।

সুতরাং, ভোটের মাঠে তাঁদের আবেদন নির্বাচনের আগেই কমে গিয়েছিল। এই ১৪১ জনের মধ্য থেকে নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়েছেন খুব সামান্য অংশই। তাই বিজেপির সামগ্রিক ফলাফল খারাপ হয়েছে। বিজেপির খারাপ ফলের আরেকটা কারণ হলো তাদের নতুন পুরাতন দ্বন্দ্ব। অন্য দল থেকে কেউ এসেই প্রার্থী হয়ে যাবেন, এটা দলের পুরাতন কর্মীরা মেনে নিতে পারেননি। ফলে নির্বাচনে অনেকেই নিষ্ক্রিয় থেকেছেন। এই নির্বাচনকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিজেপির হাতেখড়ি বলা চলে। যে ৩৮% শতাংশ ভোট তারা পেয়েছেন, এটা পরের নির্বাচনে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।কেননা জনমত ধরে রাখার চেয়ে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে নেয়া সহজ।

বিজেপি যেহেতু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ভোটগুলো পেয়েছে, সুতরাং এটা নিশ্চিত যে তাঁদের বর্তমান ভোটগুলো পরের নির্বাচনেও থাকবে। এবারের নির্বাচনে যে ২০-২৫ শতাংশ হিন্দু তৃণমূলকে ভোট দিয়েছেন, তাঁদের সিংহভাগই উদারপন্থী। সুতরাং, এঁদের কিছু অংশকেও যদি প্রভাবিত করে বিজেপি নিজেদের দিকে নিতে পারে, তাহলে পরের নির্বাচনে তারা খুব ভালো ফল করবে। তৃণমূলের কথায় আসি। পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের শাসন ভাঙার পরে একচ্ছত্র শাসন চালিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস।দলের নেত্রী মমতা ব্যানার্জী রাজ্যে খুব ভরসাযোগ্য একজন ব্যক্তিত্ব।তাই নির্বাচনেও মমতা ছিলেন তৃণমূলের একমাত্র হাতিয়ার। তোলাবাজি, কাটমানি,গরু পাচার, কয়লা পাচার সব অভিযোগের একমাত্র সমাধান ছিলেন মমতা ব্যানার্জী। তাঁর ক্যারিশমার উপর ভর করে তৃণমূল নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছে। সাথে ভোটগুরু প্রশান্ত কিশোর এবং মমতার ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জির ক্ষুরধার নেতৃত্ব তো ছিলোই। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তৃণমূল নেত্রী ছিলেন খুব সাবধানী। গ্রহণযোগ্য রাজনীতিক, তারকা প্রার্থীর ছড়াছড়ি ছিল সে তালিকায়। সুতরাং, সাধারণ মানুষের আগ্রহ ছিলো সেদিকে।

মমতার বিজয়ের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংখ্যালঘু ভোট। অন্যান্য নির্বাচনে কংগ্রেস সিপিএম কিছুটা সংখ্যালঘু ভোট পেলেও, বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই এবার মমতাই একচেটিয়া সংখ্যালঘু ভোট পেয়েছেন।ফলে কংগ্রেস এবং সিপিএমের ঘাঁটিগুলোতে এবার ঘাসফুল ফুটেছে। তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গে সাংগঠনিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী দল। তাই ভোটের প্রচারে তারা নানা রকম কৌশল ব্যবহার করেছে, সফলও হয়েছে। তবে বেশি আসন পেলেও, তৃণমূলের দুশ্চিন্তার কারণ আছে। বিজেপির হিন্দু মুসলিম মেরুকরণ যতো প্রকট হবে, হিন্দু ভোটগুলো ততো বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।

বিজেপির হিন্দু মুসলিম মেরুকরণ যতো প্রকট হবে, হিন্দু ভোটগুলো ততো বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। তাদেরকে ধরে রাখার জন্য মমতাকে যথেষ্ট কষ্ট করতে হবে। তবে ২০২১ এর বিজয় মমতাকে বাড়তি প্রেরণা যোগাবে। বিজেপি বিরোধী সর্বভারতীয় জোটে তাঁকে নেত্রী করার চিন্তাভাবনা করছেন অনেক বিশ্লেষকই। ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেস এবং সিপিআইএমের কথা বলে শেষ করে দিচ্ছি। দুটো দলই পশ্চিমবঙ্গে বারবার ক্ষমতায় থাকলেও, মানুষের চাহিদার সাথে তারা নিজেকে বদলাতে পারেনি। সিপিএম তো একেবারেই না। তারা চেয়েছে জনগণ তাদের আদর্শে বদলে যাক, যেটা বর্তমান সময়ে অসম্ভব বিষয়। এই পিছিয়ে পড়া এখন তাদের অস্তিত্বকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। একটানা ৩৪ বছর শাসন করা দলটা যখন একটাও আসন পায় না, তখন ধরেই নিতে হয়, তাদের থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সিপিএমের এখনো কিছু কর্মী সমর্থক আছেন যাঁরা লড়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বিজেপি আর তৃনমূল যখন মূল রাজনৈতিক দল হয়ে গেছে, তখন তাঁরা কতটুকু টিকে থাকতে পারবেন সেটা সংশয়ের বিষয়। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতা সবচেয়ে বেশি। সঠিক নেতৃত্ব, ভিশন, পরিকল্পনার অভাবে এক সময়ের দাপুটে দলটা এখন মৃতপ্রায়।

মালদা, মুর্শিদাবাদসহ মুসলিমপ্রধাণ এলাকাগুলো একসময় কংগ্রেসের দখলে ছিলো। এখন সেগুলো তৃণমূলের খাস তালুক হয়ে গেছে। সেটা থেকে উদ্ধার পাওয়ার পথ আপাতত কংগ্রেসের সামনে নেই। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন ভারতের গণতন্ত্রের ঔদার্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসন যথেষ্ট নিরপেক্ষ এবং যৌক্তিক আচরণ করেছে। এই নির্বাচন তৃণমূলকে তৃতীয়বারের ক্ষমতায় এনেছে ঠিক, সাথে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির গুনগত মানও আমূল পরিবর্তন করে দিয়েছে। এক সময়ের অসাম্প্রদায়িক এবং উদারবাদী চেতনার জায়গায় এখন সাম্প্রদায়িক রাজনীতি শুরু হবে যার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী। রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই। একটা নির্বাচন পরবর্তী নির্বাচনী প্রক্রিয়ার শুরু মাত্র। মমতা ব্যানার্জির সেই যাত্রা কোথায় গিয়ে থামবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়!


মোঃ মুয়াজ্জাজুর রহমান, বিভাগীয় সম্পাদক, সুনামগঞ্জ মিরর

শেয়ার করুন