সরকার কা মাল দরিয়া মে ঢাল!

সরকার কা মাল দরিয়া মে ঢাল, এ যেন তার বাস্তব প্রতিরূপ। যে ছবিগুলো দেখতে পাচ্ছেন তা শুধুমাত্র সুনামগঞ্জ শহরের কয়েকটি সরকারি অফিসের পরিত্যক্ত গাড়ির চিত্র। এই দৃশ্য সমগ্র বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, থানার সরকারি অফিসে, প্রতিষ্ঠানে দৃশ্যমান। সারা বাংলাদেশে এমন হাজার, হাজার গাড়ি অযত্নে অবহেলায় রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হচ্ছে। মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। চুরি হচ্ছে গাড়ির মূল্যবান যন্ত্রাংশ, কিন্তু কর্তৃপক্ষ এসব সরকারি সম্পদের ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন।

মিতসুবিশি পাজেরো, ইসুজু ট্রুপার, টয়োটা প্রাডো, নিশান প্যাট্রল বা প্যাথফাইন্ডার, ল্যান্ড রোভার ডিফেন্ডার এর নানা মডেলের এর এই দামী গাড়িগুলো কিন্তু একদিনে অকেজো হয়নি; ছোটখাট দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে ব্যবহার অনুপযোগী হয়েছে তাও নয়। হয়তো গাড়িগুলোতে সামান্য যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল, ইঞ্জিনে সমস্যা ছিল, যা মেরামত করা যেতো।

এভাবে অবহেলায় ডাম্পিং করার আগের দিন পর্যন্ত অনেকগুলো গাড়ি রাস্তায় চলেছে। ছবির কয়েকটি গাড়ি আমি কয়েকমাস আগেও রাস্তায় চলতে দেখেছি।

বিষয়টা হচ্ছে কোন গাড়ির বড়ধরনের যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিলে, ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে গেলে সেটা ডাম্পিং করা যেতে পারে; কিন্তু একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এইগুলা মেরামত করে সচল করারও উপায় ছিল। আজকাল দেশে অনেক ওয়ার্কশপে পুরনো গাড়িকে রিস্টোরেশনের কাজ করা হয়। এইসমস্ত গাড়ির স্পেয়ার পার্ট্স বাজারে সুলভ মূল্যেই পাওয়া যায়। অনেক কম খরচেই প্রতিটি গাড়িকে একেবারে নতুনের মত করে সারানো সম্ভব। অথচ, সরকার নতুন গাড়ি দেয়ামাত্রই এভাবে ছুড়ে ফেলা হয় পুরনো গাড়িগুলো।

রিইউজ, রিডিউস, ও রিসাইকেল – পরিবেশ সচেতনতায় ‘Three R’ বলে একটা তত্ত্ব আছে। কেন খোলা মাঠে বা পুকুর পাড়ে পুরনো গাড়ি ফেলে রাখা হবে? কেন তা মাটিতে মিশবে? চাইলেই তো এদেরকে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী (রিইউজ) করা সম্ভব, অথবা মেটাল স্ক্রাপ বানিয়েও (রিসাইকেল) তা কাজে লাগানো সম্ভব। আর তা করলে অপচয় কমবে (রিডিউস)।

সরকারের পরিবহন পুল পুরনো গাড়িগুলো জমা নিয়ে সেগুলো যত্নের সাথে মেরামত করতে পারে। অথবা অকশন এর মাধ্যমে বিক্রি করা যেতে পারে। এর থেকে সরকারের আয় হবে।

কিন্তু এভাবে অযত্নে, অবহেলায় গাড়িগুলোকে নষ্ট করে ফেলা সরকারি সম্পত্তির অপচয় ছাড়া কিছুই নয়। উন্নত দেশে হয়তো একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর পুরনো গাড়িকে পরিত্যক্ত করে দেওয়া হয়, কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে, এটা বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু নয়। তাছাড়া আমাদের দেশে গাড়ির দামও অনেকবেশি, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।

সরকারি পরিবহন পুলে, বিআরটিসি বাস ডিপোতে, বন্দরে শত শত গাড়ি ফেলে রাখা, যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন মাথাব্যথা নেই। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কোন পদক্ষেপ আলোর মুখ দেখে না। যেখানে প্রাইভেট গাড়িগুলো ১৫ থেকে ২০ বছর, এমনকি ৩০ বছরও অনায়াসে চলে, সেখানে সরকারি দামি গাড়িগুলো ৪ থেকে ৫ বছরের মাথায় অকেজো করে দেয়া হয় কেন?

মন্ত্রী, আমলা, সরকারি কর্মকর্তারা নিয়মিত গাড়ি বদল করেন, সংসদ সদস্যরা বিনা শুল্কে কোটি টাকার গাড়ি আমদানি করেন। যত ক্রয়, যত টেন্ডার তত কমিশন বাণিজ্য, তাই হয়তো গাড়ি পুরনো হওয়া মাত্রই এই বিলাসিতা! প্রশাসন, স্বাস্থ্যসহ নানা দপ্তরে গাড়ির ছড়াছড়ি থাকলেও অনেক সরকারি হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স নেই, জরুরি বিদ্যুৎ অফিসের গাড়ি নেই! বহুবছরের পুরনো লক্করঝক্কর গাড়ি দিয়ে জরুরি সেবা দেয়া হয়, প্রয়োজনের সময় বঞ্চিত হয় সাধারণ মানুষ—যারা এসব গাড়ির প্রকৃত মালিক। অথচ সেই সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকাতেই আমলাদের গাড়ি বদলায় বছর বছর।

আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে— মন্ত্রী-এমপি বা সরকারি কর্মকর্তারা যখন অবসরে যান তখন কি প্রতিবছর গাড়ি বদল করেন? আশা করি উত্তরটা সবার জানা।


মোঃ মাহমুদুর রহমান পীর