Skip to content

যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম বাংলার ঘোড়ার গাড়ি

একসময় সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলায় ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি বাহনের প্রচলন ছিলো। সর্বত্রই ছিল এই ঘোড়ার গাড়ির কদর। গরুর গাড়ি অথবা ঘোড়ার গাড়ি ছাড়া বিয়ে কিংবা অন্য যেকোনো উৎসবই রয়ে যেত অসম্পূর্ণ। সেই ঘোড়ার গাড়ি হারিয়ে যাচ্ছে আধুনিকতার যান্ত্রিক ছোঁয়ায়। সেই সাথে হারিয়ে যাচ্ছে গাড়িয়াল পেশা এবং গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঘোড়া দৌড়। এখন আর গ্রামে গঞ্জে দেখা মেলে না ঘোড়া গরুর গাড়ির। বর্তমানে গ্রামের ছেলেমেয়েরাও ঘোড়া ও গরুর গাড়ির যানবাহনের সাথে পরিচিত নয়, শহরের কথা তো সেখানে বলাই বাহুল্য।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের কড়ইগড়া, পুরানঘাট, উত্তরবড়দল, টিটিয়াপাড়া, শিমুলতলা, মানিগাও, রাজাই, লাউড়েরগর, বাগলী, লামাগাওসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে কৃষিপণ্য ও নিত্যপণ্য পরিবহনের জন্য ব্যবহার করা হতো ঘোড়া ও মহিষের গাড়ি। এখন আর ওসব এলাকায় দেখা মেলেনা ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ির। আগে অনেকের জন্য এই গাড়িগুলো ছিল উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু আধুনিকতার এই যুগে মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার, বাস ইত্যাদি ব্যবহারের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী গরু, ঘোড়া কিংবা মহিষের গাড়ি। তবে গ্রামগুলোতে এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হাওরাঞ্চলে হাতে গোনা দু-একটা জরাজীর্ণ গাড়ির দেখা এখনো মেলে। তাছাড়া এসব গাড়ি যেন চোখেই পড়ে না।

খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষজন ব্যবহার করাহত ঘোড়া ও মহিষের গাড়ি। জেলার সদর, তাহিরপুর, দিরাই, শাল্লা, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার, ছাতক উপজেলার মানুষজন বৃহত্তম হাওরগুলো থেকে ধান ও পণ্য পরিবহনের জন্য কৃষকদের প্রধান বাহন ছিল ঘোড়া ও মহিষের গাড়ি। একসময় এসব এলাকার বিভিন্ন গ্রামে কৃষিপণ্য ও নিত্যপণ্য বহনে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলো এসব গাড়ি। পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা এই ঘোড়াগুলো বেশিরভাগই ছিল ব্যক্তিমালিকানাধীন। হাওরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খেলা ছিল ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে এসব এলাকার অনেক সৌখিন মানুষ ঘোড়া কিনতেন। কিন্তু এখন যান্ত্রিকতার ছোঁয়ায় কেউই আর ঘোড়া কিনতে আগ্রহী না। ফলে দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে এসব ঘোড়ার গাড়ি এবং ঐতিহ্যবাহী খেলা।

তাহিরপুর উপজেলার উত্তর বড়দল ইউনিয়নের কড়ইগড়া গ্রামের শাহাবুদ্দিন জানান, আমাদের বংশ পরম্পরায় ছিল ঘোড়া পালন ও ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে জীবন জীবিকা নির্বাহ করা, এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেও অনেক টাকা উপার্জন করতো আমার পূর্বপুরুষরা। আগে এলাকার সড়কপথ ভাল ছিল না। তাই ঘোড়ার গাড়ি বেশি চলত। ওই সময়ই ঘোড়া কিনেছিলেন তারা। তবে এখন ঘোড়ার গাড়ি চলে না। এরপরও মাঝেমধ্যে এলাকায় ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে এখনো পরিবহন সেবা দিয়ে যাচ্ছেন অনেকেই।

পুরানঘাট এলাকার কবির গাড়িয়াল বলেন,আগে আমার বাপ-দাদারা এই গাড়ি চালিয়ে আমাদের সংসার চালাতো। কিন্তু এখন গরুর গাড়ি চলে না কিংবা চললেও সংখ্যায় খুবই নগণ্য । এখন এসব গাড়ি প্রায় বিলুপ্তির পথে। দু-একটা গ্রামে ১-২টা ঘোড়ার গাড়ি পাওয়া যায় তাছাড়া তো চোখেই পড়ে না। এখন ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে অল্প অল্প করে মালামাল বহন করে জীবন-জীবিকা নির্বাহ করি। যান্ত্রিকতার যুগে এখন গরু ও ঘোড়ার গাড়ি বিলুপ্তির পথে। বাংলা এবং বাঙালির ঐতিহ্যগুলোকে আমাদের ধরে রাখা প্রয়োজন।

সমাজ সেবক মাসুক মিয়া জানান, একটা সময় ছিল যখন ঘোড়াই ছিল মানুষের একমাত্র বাহন। বিশেষত হাওরাঞ্চলে ধান ও নিত্যপণ্য আনা নেওয়ার কাজে গরু ও ঘোড়ার গাড়ির উপর নির্ভরশীলতা ছিল। এখন আর সেই কদর নেই। আগামী প্রজন্মের জন্য অতীত ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া, তাহিরপুর প্রতিনিধি

সুনামগঞ্জমিরর/ডব্লিউটি/বিএস

x