Skip to content

১ মার্চ থেকেই বাড়ছে বিদ্যুতের দাম

১ মার্চ থেকেই গ্রাহক পর্যায়ে আর এক দফা বাড়ছে বিদ্যুতের দাম। বিদ্যুতের নতুন মূল্য নিয়ে আগামী ৪, ৫ ও ৬ মার্চ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সম্মেলন কক্ষে গণশুনানির মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। তবে তা কার্যকর হবে পহেলা মার্চ থেকেই। বিতরণ কোম্পানিগুলো গড়ে ১৫ শতাংশেরও বেশি দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। তবে কি পরিমাণ মূল্য বৃদ্ধি পাবে গণশুনানি ছাড়া তা এখনই সঠিকভাবে বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন বিইআরসি চেয়ারম্যান এ আর খান।

পিডিবির সর্বশেষ অভ্যন্তরীণ প্রাক্কলন অনুযায়ী আগামী বছর প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে দাড়াবে ৬ টাকা ২৭ পয়সা। বর্তমানে গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় দাম রয়েছে ৫ টাকা ৭৫ পয়সা। এই খাতে ভর্তুকি কমাতে এখন আর এক দফা দাম বাড়িয়ে বিদ্যুতের খুচরা মূল্য উৎপাদন ব্যয়ের কাছাকাছি নিয়ে যেতে চাচ্ছে সরকার। তবে এখনই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোকে অযৌক্তিক বলছেন, এখাতের বিশেষজ্ঞরা।

পিডিবির পক্ষ থেকে ১৫.৫০ শতাংশ, ওজোপাডিকোর পক্ষ থেকে ৮.৫৭ শতাংশ, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) পক্ষ থেকে ১৫.৯০ শতাংশ, ডিপিডিসির পক্ষ থেকে ২৩.৫০ শতাংশ এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) পক্ষ থেকে ১২.৫৬ শতাংশ হারে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর আবেদন জানানো হয়েছে বিইআরসির কাছে। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আগামী ৪ মার্চ সকাল ১০টা ৩০ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), বেলা ২টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ওজোপাডিকো), ৫ মার্চ সকাল ১০টা ৩০ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি), বেলা ২টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) এবং ৬ মার্চ সকাল ১০টা ৩০ মিনিট থেকে বেলা ১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে। শুনানিতে বিতরণ কোম্পানিগুলো বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি কেন করা হবে এ জন্য যৌক্তিকতা তুলে ধরবে। পাশাপাশি ভোক্তাদের পক্ষ থেকেও এর যৌক্তিকতা পর্যবেক্ষণ করবে। সব কিছু বিবেচনা করে বিদ্যুতের চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ করবে বিইআরসি। তবে বর্ধিত মূল্য যাই হোক না কেন তা ১ মার্চ থেকেই কার্যকরী করা হবে বলে বিইআরসির ওই সূত্রটি নিশ্চিত করেছে।

জানা যায়, বর্তমান সরকারের আমলে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পদক্ষেপ এই প্রথম। তবে ২০১০ সালের মার্চ থেকে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আড়াই বছরে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে ৫ বার করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। ফলে গ্রাহক পর্যায়ে মোট ৪৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ বেড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় মূল্য হয়েছে ৫ টাকা ৭৫ পয়সা। আর প্রতি ইউনিটের উৎপাদন খরচ দাড়িয়েছে এখন ৬ টাকা ২৭ পয়সার মতো। তবে পিডিবির নিজস্ব উৎপাদন ব্যয় এখনও গড়ে ৩ টাকার নিচে রয়েছে। তেলভিত্তিক কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনতে প্রতি ইউনিটের জন্য ক্ষেত্র বিশেষে পরিশোধ করতে হচ্ছে ১৮ টাকা। নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ব্যয় ও কুইক রেন্টাল থেকে বিদ্যুৎ কেনার ব্যয় যোগ করেই পিডিবির গড় ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। এ কারণে পিডিবির বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যয় বেড়ে গেছে।

জানা যায়, দ্বিতীয় দফায় ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত সরকারের আমলে মোট ৫ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। প্রথম দফায় ২০১০ সালের ১ মার্চ বিদ্যুতের দাম খুচরা পর্যায়ে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়ানো হয়। এরপর ২০১১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পাইকারি পর্যায়ে ১১ শতাংশ এবং খুচরা পর্যায়ে ৫ শতাংশ দাম বৃদ্ধি করা হয়। ওই বছরের ১ আগস্ট পাইকারি পর্যায়ে কার্যকর হয় ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। মাত্র তিন মাসের মাথায় ১ ডিসেম্বর খুচরা পর্যায়ে ১৩ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে ১৬ দশমিক ৭৯ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়। ৯ মাসের মাথায় গত ২০১২ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে আবারও খুচরা পর্যায়ে ১৫ শতাংশ এবং পাইকারি পর্যায়ে প্রায় ১৭ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়।

সর্বশেষ ২০১৩ সালের ২৩ জানুয়ারিতে বিইআরসিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ওপর গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গণশুনানি শেষে পিডিবির ১২ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের বিপরীতে ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ, ওজোপাডিকোর ৯ দশমিক ৫৯ শতাংশের বিপরীতে ৪ দশমিক ১৫ শতাংশ, ডেসকোর ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশের বিপরীতে ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ, ডিপিডিসির ১১ দশমিক ৩১ শতাংশের বিপরীতে ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ দাম বাড়ানোর সুপারিশ করে বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি।

২০১২ সালের ১সেপ্টেম্বর বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে করা হয়েছিল পিডিবির জন্য প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ৮৬ পয়সা, ডিপিডিসি ৬ টাকা ৩৫ পয়সা, ডেসকো ৬ টাকা ৪৫ পয়সা, ওজোপাডিকো ৫ টাকা ৮২ পয়সা এবং আরইবির জন্য প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ১৭ পয়সা।

এবার তৃতীয় মেয়াদে ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিদ্যুৎখাতের ভর্তুকি একটা সামঞ্জস্য পর্যায়ে রাখতেই দাম বাড়াতে হচ্ছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে বিদ্যুৎখাতে সরকারের ভর্তুকি ছিল ৯৯৩ কোটি টাকা, যা ২০১০-১১ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার কোটি টাকা, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৬ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৫ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা।

বর্তমানে বিদ্যুতের দাম বাড়ালে অর্থনীতিতে কি ধরনের প্রভাব পড়তে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়েনি। তাই রাজস্বের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দাম বাড়ানো অপরিহার্য নয়। বর্তমানে বিনিয়োগ নেই, উৎপাদন পরিস্থিতি দুর্বল তাছাড়া প্রবৃদ্ধির হার কমে যাচ্ছে, এ অবস্থায় বিদ্যুতের দাম বাড়ালে অর্থনীতি একটা বাড়তি চাপের মুখে পড়বে। দেশে মূল্যস্ফীতি এখন ৮ শতাংশের বেশি। এ অবস্থায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তা সীমিত আয়ের মানুষের ওপর চাপ বাড়াবে। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের দাম বাড়বে। কৃষিকে এই দাম বৃদ্ধির আওতায় রাখা হলে সেখানেও এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। এসব বিষয় সার্বিকভাবে বিশ্লেষণ না করে শুধু ভর্তুকি সুষমকরণের জন্য বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ফল ভালো হওয়ার কথা নয় বলেও মনে করেন তিনি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ম. তামিম বলেন, মূলত তেলভিত্তিক রেন্টালের কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বাড়ছে। সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ না হবে ততদিন এ সমস্যা থাকবেই। সমস্যা সমাধানে কোনো বিকল্প আছে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, উৎপাদন খরচ কমাতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করতে হবে। তেলভিত্তিক রেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিবর্তে কয়লাভিত্তিক (দেশি বা বিদেশ থেকে আমদানি) বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে।

কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, নতুন করে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ফলে দ্রব্যমূল্য ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল উৎপাদন খরচ বাড়বে। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। মূল্যস্ফীতিও বাড়বে। কাজেই বর্তমান পরিস্তিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই।

রেন্টাল-কুইক রেন্টালের কারণেই মূলত বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং তা জনগণের উপর চাপানো হচ্ছে।

বিইআরসির সদস্য ড.সেলিম মাহমুদ বলেন, বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে কমিশনে ৪,৫ ও ৬ মার্চ গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে। শুনানি শেষে নতুন মূল্য নির্ধারিত হবে এবং ১ মার্চ থেকেই তা কার্যকর হবে।

এ ব্যাপারে মতামত জানতে চাইলে বিইআরসির চেয়ারম্যান আর এ খান বলেন, রেন্টাল-কুইক রেন্টাল স্থায়ী কোনো পদ্ধতি নয়, এটি সাময়িক। বিশ্বের কোথাও এটি স্থায়ী নয়। কয়লাভিত্তিক নতুন পাওয়ার প্লান্ট বা পুরনো পাওয়ার স্টেশনগুলো সংস্কার করে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হতে পারে।

x