মানুষ স্টেডিয়াম চিনেছে, কিন্তু চেনেনি জহুর আহমদকে

মিজানুর রহমান। চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। ১৮ মার্চ নেপালের বিপক্ষে বাংলাদেশের খেলা চলাকালীন জানতে চেয়েছিলাম, বাংলাদেশ ইংল্যান্ডকে হারিয়েছে কোন ভেন্যুতে? নিমিষেই জবাব দিলেন জহুর আহমদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে।

ভাবখানা এমন এ আর এমন কি? এ ধরণের হাজারো ক্রিকেটীয় পরিসংখ্যান যেন ঠোটস্থ। কিন্তু যখনই জানতে চাইলাম এ স্টেডিয়াম যার নামে নামকরণ করা হয়েছে তিনি কে জানেন কি না? এবার আমতা আমতা করতে লাগলো।

শুধু মিজানই নন। খেলা দেখতে আসা অন্তত অর্ধশতাধিক দর্শকের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিলো জহুর আহমদ চৌধুরী সম্পর্কে। কিন্তু কেউ সদুত্তর দিতে পারেননি আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, পথিকৃৎ শ্রমিক নেতা, ভাষাসৈনিক, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার এ সদস্য সম্পর্কে।

নগরীর মনসুরাবাদ এলাকা থেকে সপরিবারে খেলা দেখতে এসেছেন মো. জাহাঙ্গীর। জহুর আহমদ চৌধুরী নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘জহুর আহমদ চৌধুরী আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন।’ এর বাইরে আর কিছু বলতে পারেননি তিনি।

নগরীর একটি সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী মো. ইউসুফ বলেন,‘স্টেডিয়ামের প্রধান ফটকে একটি ভাস্কর্য দেখেছি। কিন্তু এটি কার ঠিক জানি না। হুড়োহুড়ি’র মধ্যে স্টেডিয়ামে ঢুকতে গিয়ে ওভাবে খেয়াল করিনি।’

স্টেডিয়ামের নামকরণ করেই দায় সেরেছেন কর্তৃপক্ষ। অবশ্য ফটকে জহুর আহমদ চৌধুরীর একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু কোনো জীবনবৃত্তান্ত অংকিত করা হয়নি। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ উপলক্ষে ডিজিটাল ব্যানারে অস্থায়ী সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত দেওয়া হয়েছে। তাও চোখে পড়ার মতো নয়। স্টেডিয়ামে প্রবেশের সময় কারো ভ্রুক্ষেপও নেই ওদিকে।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় উপ উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন,‘১৯৭১ পূর্ববর্তী যারা প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলো তারা ভালো করেই জানেন জহুর আহমদ চৌধুরী কে? তিনি কত বড় মাপের রাজনীতিবিদ ছিলেন। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে সুদৃঢ় করেছিলেন তিনি। তরুন প্রজন্মের কাছে জহুর আহমদ চৌধুরীকে পরিচিত না করানোটা খুবই হতাশাজনক। এ অবস্থা চলতে থাকলে জহুর আহমদ চৌধুরী নামে থাকবে শুধু তার সংগ্রামী জীবন তরুণ প্রজন্মের কাছ থেকে হারিয়ে যাবে।’

তিনি বলেন,‘বিশ্বের প্রতিটি দেশে স্থাপনা যার নামে নামকরণ করা হয় তার জীবনবৃত্তান্ত প্লেটে লেখা থাকে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিভিন্ন দেশ থেকে স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে আসবে দর্শকরা। তাই প্লেটে বাংলার পাশাপাশি ইংরেজী জীবনবৃত্তান্ত স্থাপন করা প্রয়োজন। যাতে করে বিদেশী দর্শকরাও আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ইতিহাস জানতে পারবে।’
কে এই জহুর আহমদ চৌধুরী?

১৯১৫ সালে চট্টগ্রাম জেলার ডবলমুরিং থানার উত্তর কাট্টলীতে জন্মগ্রহণ করেন জহুর আহমদ চৌধুরী। ১৯৩২ সালে তিনি অবিভক্ত ভারতের কলকাতার খিদিলপুর অঞ্চলের খ্রিষ্টান মিশনারী হাই স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। উত্তাল বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে একজন ত্যাগী দেশকর্মী রূপে সম্পৃক্ত হওয়ায় এখানেই তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। ১৯৩৮ সালে জহুর আহমদ চৌধুরী সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ছিলেন দেশের শ্রমিক রাজনীতির অন্যতম পুরোধা। ১৯৪২ সালে জহুর আহমদ চৌধুরী মুসলিম লীগের অন্যতম নেতা হিসেবে পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় ভুমিকা রাখেন। ১৯৪৬ সালে তিনি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে জহুর আহমদ চৌধুরী বৃহত্তর চট্টগ্রামে মুসলিম লীগের প্রচার সম্পাদক ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগে যোগদান করে এ দলের চট্টগ্রাম শহর শাখার সাধারণ সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত হন।

১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করায় তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৫৪ সালে আইন পরিষদের নির্বাচনে তিনি যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে চট্টগ্রামের শীর্ষ ধনী ও প্রভাবশালী সমাজপতি রেয়াজউদ্দিন বাজারের মালিক শেখ রফিউদ্দিন সিদ্দিকীকে হারিয়ে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। জহুর আহমদ চৌধুরী ১৯৭০ সালে ‘পূর্ব পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক লেবার ফ্রন্ট ‘ নামে একটি প্রগতিশীল শ্রমিকসংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। সর্বসম্মতিক্রমে তিনি ওই সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং একই সালে তিনি প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন।

একাত্তর সালের ২৬ মার্চ (২৫ মার্চ মধ্যরাতে) বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণার পর, চট্টগ্রামে জহুর আহমদ চৌধুরীর কাছে পাঠিয়েছিলেন দেশে-বিদেশে প্রচারের জন্য। পরবর্তীকালে চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণা প্রচার করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধে আগরতলায় অবস্থান নিয়ে জহুর আহমদ চৌধুরী মুজিব নগর সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে গোটা দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই তিনি আগরতলা গিয়ে সাংবাদিকদের মাধ্যমে বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের সংবাদ বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেন। তিনিই প্রথম বাংলাদেশের পক্ষে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর মাধ্যমে ভারত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার আহ্বান জানান।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তিনি সমগ্র পূর্বাঞ্চলীয় জোনাল কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে সফলভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। জহুর আহমদ চৌধুরী ১৯৭১ সালের ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম মন্ত্রিসভায় স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, শ্রম ও জনশক্তি এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিযুক্ত হন। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে গৌরবোজ্জ্বল এবং কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য জহুর আহমদ চৌধুরীকে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার ২০০১’ (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়।

জহুর আহমদ চৌধুরী ১৯৪৯ সালে জন্মলগ্ন থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চট্টগ্রামে দলকে সুদৃঢ় ভিত্তি দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি। যুদ্ধ শেষে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে দেশ পুনর্গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। সে অবস্থায় ১ জুলাই ১৯৭৪ সালে ঢলে পড়েন মৃত্যুর কোলে। জহুর আহমদ চৌধুরীর মৃত্যুতে জাতীয় সংসদে প্রদত্ত শোক বিবৃতিতে সংসদ নেতা, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের শাসকদের অত্যাচার-নির্যাতন সইতে হয়েছে। জহুর আহমদ চৌধুরীও আইয়ুব-মোনায়েমের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। তাঁকে এক কারাগার থেকে আরেক কারাগারে বদলি করে করে হয়রানি ও নির্যাতন চালানো হয়। সিলেট জেলে অমানুষিক নির্যাতন চালানোর ফলে তাঁর শ্রবণশক্তি হ্রাস পায়।

এছাড়া তাঁর বড় ছেলে সাঈফুদ্দিন খালেদ মুক্তিযুদ্ধের সময় রাউজানে অবস্থিত চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (তৎকালিন বিআইটি) সামনে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন। তাঁর সমাধি রাউজান ইমাম গাজ্জালী কলেজের পাশে। জহুর আহমদ চৌধুরীর স্ত্রী মরহুমা ডা. নুরুন নাহার জহুর ছিলেন বিশিষ্ট লেখিকা ও সংগঠক। (আবদুল্লাহ আল মামুন, বাংলানিউজ)

x