Skip to content

‘হোঁচট খাচ্ছে গণতন্ত্র’

সহিংসতা, ভোট জালিয়াতি, কেন্দ্র দখলসহ নানা অভিযোগের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছে উপজেলা নির্বাচনের চতুর্থ ধাপের ভোট। রবিবার ৯১টি উপজেলার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা ও অনিয়মের ঘটনা গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার জন্য অশনি সংকেত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক ও নির্বাচন বিশ্লেষকরা।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় চারজন নিহতসহ শতাধিক আহতের ঘটনা ঘটেছে। সহিংসতার কারণে ২৬টি কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন।

চতুর্থ দফা উপজেলা নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহ বলেন, ‘সাম্প্রতিক� আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলেরই মাইন্ড সেট এমন পর্যায়ে রয়েছে, যে কোনো মূল্যে জয়ী হতে চায় তারা। তবে বিষয়গুলো রাজনৈতিক বিবেচনায় ঘটছে না।’

চলমান উপজেলা নির্বাচনের বিভিন্ন অপ্রীতিকর ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে হতাশাজনক বলেও অবিহিত করেন অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিম উল্লাহ।

চতুর্থ দফা উপজেলা নির্বাচন প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘প্রথম দুই দফা উপজেলা নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলেও তৃতীয় দফায় ব্যাপক সহিংসতা, কারচুপি ও ভোট জালিয়াতির অভিযোগ আসতে থাকে। এরপর চতুর্থ দফা নির্বাচনে এই সহিংসতা ও অনিয়মের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম, নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা দমন করতে সমর্থ হবে। কিন্তু তারা তা করতে পারেনি। এমনকি চতুর্থ দফা নির্বাচনে সহিংসতার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনও আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল এবং তারা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিবে বলেও ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু তারাও ব্যর্থ হয়েছে।’

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় বিশেষ করে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার সংস্কৃতি থেকে আমরা অনেকটা বেরিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু উপজেলার মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যেভাবে সহিংসতা ও অনিয়মের ঘটনা ঘটছে, তাতে মনে হচ্ছে, গণতন্ত্রের সে অগ্রযাত্রা হোঁচট খেয়েছে, যা আমাদের গণতন্ত্রের জন্য একটি অশনি সংকেত।’

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘প্রথম দুই দফায় বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা এগিয়ে থাকার কারণেই যে সরকার পক্ষ সহিংসতা বা অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে এটা পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ যে সব স্থানে সহিংসতা ও অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে সে সব স্থানে সরকার সমর্থকদের পাশাপাশি বিরোধী দলেরও অংশগ্রহণ দেখা গেছে।’

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘প্রথম দুই দফা নির্বাচনের পর দেশের দুই রাজনৈতিক দলই এটাকে মর্যাদার লড়াই হিসেবে নিয়েছে। তাই ফলাফল নিজেদের দিকে নিতেই উভয়পক্ষ সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েছে।’

এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘তৃতীয় দফা নির্বাচনে সহিংসতার পর মনে হয়েছিল নির্বাচন কমিশন একটু নড়েচড়ে বসেছে। তাদের বক্তব্য ও কার্যক্রমে মনে হয়েছিল সহিংসতা ও অনিয়ম রুখতে তারা যথেষ্ট সচেষ্ট, কিন্তু দেখা গেল পুরো নির্বাচন কার্যক্রমে তারা তাদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে। বিশেষ করে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নির্বাচন কমিশনের নির্দেশের প্রতি কঠোরভাবে শ্রদ্ধা দেখাতে পারেনি। আর এ ক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধেই ভোটে অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে।’

বদিউল আলম বলেন, ‘প্রথম দুই দফায় বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এগিয়ে থাকার কারণে সরকার সমর্থকরা সহিংসতা চালাবে বিএনপির এমন অভিযোগ সত্য হওয়া বা না হওয়ার বিষয় না। এটা সবারই ধারণা ছিল মর্যাদার লড়াই মনে করে উভয়পক্ষই মরিয়া হয়ে উঠেছে। ফলাফল নিজেদের দিকে নিতেই তারা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েছে। আর এ ক্ষেত্রে আগাম সতর্ক বার্তা থাকলেও নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন তা দমনে ব্যর্থ হয়েছে।’

প্রথমবারের মতো উপজেলা নির্বাচনকে ছয় দফায় অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা ইতিবাচক হলেও তা সফল করতে পারেনি কমিশন- এমন মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের।

এ ব্যাপারে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘স্বল্প জনবল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কার্যক্রমকে সহজ করতে কয়েকটি দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তটি ইতিবাচকই ছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে আমাদের পাশের দেশ ভারতে জাতীয় নির্বাচনও কয়েকটি ধাপে অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে আমাদের কমিশন অভিজ্ঞতা নিলেও তা বাস্তবায়নে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। কারণ একটি দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরপরই তার ফলাফল ঘোষণা করায় এ ধরনের সহিংসতা ঘটছে। নির্বাচন কমিশন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্ত নিলেও নিজেদের ভুলের কারণে তা ব্যর্থ হয়েছে। আর এ ধরনের নির্বাচনী সহিংসতার কারণে কয়েক ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টিকে দায়ী করা যেতে পারে।’

বদিউল আলম বলেন, ‘কয়েক দফায় নির্বাচন অবশ্যই একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। কিন্তু কমিশনের ব্যর্থতার কারণে তা এখন নেতিবাচক হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ প্রথম দুই দফায় সরকার পক্ষ পিছিয়ে থাকে বাকি দফাগুলোতে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে তারা মরিয়া ছিল। আর কয়েক দফায় নির্বাচনের কারণে এক জায়গায় সন্ত্রাসী বা সহিংসতাকারীরা অন্য এলাকায় গিয়ে সহিংসতা চালানোর সুযোগও পেয়েছে।’

রবিবার সকাল ৮টায় চতুর্থ উপজেলা নির্বাচনের চতুর্থ দফার ভোট গ্রহণ শুরু হয়। ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার ঘন্টা খানেকের মধ্যে ভোট কেন্দ্র দখল, জালভোট, প্রশাসনের পক্ষাপাতমূলক আচারণ, ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট ঢুকতে না দেওয়াসহ নানা অভিযোগে বিরোধীপক্ষের ভোট বর্জন শুরু হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার খবর আসতে থাকে। পাশাপাশি ভোট গ্রহণের আগের দিন রাতেও অনেক কেন্দ্রে ভোট জালিয়াতি করার খবর পাওয়া গেছে।

প্রথম দুই দফায় উপজেলা নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হলেও তৃতীয় দফা থেকে সহিংস রূপ নিতে থাকে। তৃতীয় দফা নির্বাচনে নির্বাচনী সহিংসতায় দুইজন নিহত হওয়াসহ ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল। একই সঙ্গে প্রশাসন ও সরকার পক্ষের বিরুদ্ধে ভোটকেন্দ্র দখল, ভোট কারচুপি, ব্যালট পেপার ও বাক্স ছিনতাইসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল।

চতুর্থ দফায় অনুষ্ঠিত দেশের ৯১টি উপজেলা নির্বাচনী সহিংসতায় রবিবার ৪ জন নিহত হয়েছেন। ভোট জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে নবম জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কট করে। দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হচ্ছিল দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারেনা। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিলেও উপজেলা নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় দলটি। উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলটির প্রস্তুতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রথম দুই দফার নির্বাচনে দলের সমর্থক প্রার্থীরা এগিয়ে থাকলেও তৃতীয় দফায় সরকার সমর্থক প্রার্থীরা এগিয়ে যায়। অরাজনৈতিক নির্বাচন হলেও উপজেলা নির্বাচনকে অনেকটা মর্যাদার লড়াই হিসেবে নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সাবেক বিরোধী দল বিএনপি। উপজেলা নির্বাচনটি মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হওয়া তৃতীয় ধাপে এসে ব্যাপক নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা ঘটে। যার প্রতিফলন আরও ভয়াবহভাবে দেখা দিয়েছে চতুর্থ দফায় এসে।

x