Skip to content

তোমাকে আসতেই হবে হে স্বাধীনতা

‘তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,/সাকিনা বিবির কপাল ভাঙলো/সিঁথির সিঁদুর গেল হরিদাসীর/তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা/শহরের বুকে জলপাইয়ের রঙের ট্যাঙ্ক এলো/দানবের মত চিৎকার করতে করতে/তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা’

স্বাধীনতাকে প্রয়াত কবি শামসুর রহমান এভাবেই বর্ণনা করেছেন। এভাবেই অনেক ত্যাগ আর বিসর্জনের বিনিময়ে এসেছে স্বাধীনতা। একটি লাল সবুজের পতাকা পেয়েছে বাংলাদেশ।

২৬ মার্চ বুধবার মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পেরিয়েছে বাংলাদেশ।

ভয়াল কালরাতের ধ্বংসস্তুপ আর লাশের ভেতরে দিয়ে একাত্তরের এদিন রক্তরাঙা নতুন সূর্য উঠেছিল। ভীতবিহ্বল মানুষ দেখেছে লাশপোড়া ভোর। সারি সারি স্বজনের মৃতদেহ। আকাশে কুণ্ডলি পাকানো ধোঁয়া। পুড়ছে স্বাধীন বাংলার মানচিত্র অাঁকা লাল-সবুজ পতাকা। জ্বলে উঠল মুক্তিকামী মানুষের চোখ, গড়ল প্রতিরোধ।

‘জয় বাংলা’ স্লোগান তুলে ট্যাংকের সামনে এগিয়ে দিল সাহসী বুক। একাত্তরের এদিন ভোররাতে পাকিস্তানি হায়েনাদের গণহত্যার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। শত্রুসেনাদের বিতাড়িত করতে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করার বঙ্গবন্ধুর ডাকে জীবনপণ সশস্ত্র লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে বীর বাঙালি। দীর্ঘ ন’মাস এক সাগর রক্তের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠতম অর্জন-মহান স্বাধীনতা।

স্বাধিকার আদায়ের দৃঢ় মনোবল নিয়ে পশুশক্তিকে পরাজিত করে ঘোর অন্ধকার-অমানিশা কাটিয়ে বাংলার চিরসবুজ জমিনে রক্তে রাঙানো লাল-সবুজ পতাকার ভ্রূণ জন্ম নেয় আজকের ঐতিহাসিক দিনটিতেই।

বুধবার ভোরের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালি জাতির জীবনে সূচনা ঘটবে আরও একটি ঝলমল উৎসব দিনের। রক্ত, অশ্রুস্নাত বিক্ষুব্ধ বিদ্রোহের দিন ২৬ মার্চ। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মহার্ঘ্য স্বাধীনতার ৪৩তম বাষির্কী।

এ ভূখণ্ড ভাগের সবচেয়ে বড় অর্জন, বাঙালির সহস্র বছরের জীবন কাঁপানো ইতিহাস_ মহান স্বাধীনতা। অসংখ্য শহীদের রক্তে ভেজা, জাতির বীর সেনানিদের রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধের সূচনা দিন। বাঙালির স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিন। গৌরব ও স্বজন হারানোর বেদনার এই দিনে বীর বাঙালি সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা করেছিল। তাই আজ গৌরব ও অহঙ্কারের দিন।

সত্যিই এক ভিন্ন আবহে, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে জাতির সামনে এসেছে স্বাধীনতা দিবস। একাত্তরের নরঘাতক ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধীদের শিরোমণিরা এখন কারাগারে বন্দি। যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলানো হলেও অন্যান্য চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীরা এখন বিচারের প্রহর গুণছেন অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠে। স্বাধীনতা প্রিয় বাঙালির প্রত্যাশা, এই স্বাধীনতা দিবসই হোক ঘৃণিত যুদ্ধাপরাধীদের শেষ স্বাধীনতা দিবস।

বাঙালি জাতি নতুন উদ্দীপনায়, মুক্তিযুদ্ধের প্রখর চেতনায় প্রগতিবিরোধী শক্তি জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ ও যুদ্ধাপরাধীদের প্রতিহত ও বিচারের অঙ্গীকারে প্রাণিত। চারদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার দেশের মানুষ।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একাধিক গ্রন্থ থেকে জানা গেছে, ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের অব্যবহিত পরেই ভাষার প্রশ্নে একাত্ম হয় বাঙালি। ১৯৪৮, ‘৫২ পেরিয়ে ‘৫৪, ‘৬২, ‘৬৬-এর পথ বেয়ে আসে ১৯৬৯। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যূত্থানে কেঁপে ওঠে জেনারেল আইয়ুবের শাসন। জনতার সাগরে উন্মাতাল স্রোতধারা। ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’, ‘তোমার আমার ঠিকানা_পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয় গ্রাম-শহর-জনপদ।

শত ষড়যন্ত্র ও সামরিক জান্তার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সত্তরের জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। কিন্তু বাঙালির হাতে শাসনভার দেওয়ার বদলে শুরু হয় ষড়যন্ত্র।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনার নামে করতে থাকেন কালক্ষেপণ। প্রস্তুত হয় হিংস্র কায়দায় বাঙালি হত্যাযজ্ঞে।

তবে ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণেই মুক্তিপাগল বাঙালি পায় মুক্তিযুদ্ধের দিক-নির্দেশনা। আক্ষরিক অর্থেই তখন পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসন চলছিল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। সেই প্রবল প্রদীপ্ত আন্দোলনের জোয়ারে ধীরে ধীরে বাঙালির হৃদয়ে অাঁকা হয় একটি লাল-সবুজ পতাকা, একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের ছবি।

কিন্তু বাঙালির আবেগ, সংগ্রাম ও মুক্তির আকাঙ্খাকে নির্মূল করতে অস্ত্র হাতে নামে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী। শোষিত ও নির্যাতিত মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্খাকে রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে শুরু করে নিষ্ঠুর গণহত্যা। সেই কালরাত থেকেই শুরু হয় মৃত্যু, ধ্বংস, আগুন আর আর্তনাদের পৈশাচিক বর্বরতা। কিন্তু ওই ঘোরতর অমানিশা ভেদ করেই দেশের আকাশে উদিত হয় স্বাধীনতার চিরভাস্কর সূর্য্য।

২৬ মার্চের সূচনালগ্নে গ্রেফতার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ওয়্যারলেসের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা করে বলেন, ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অতর্কিতে পিলখানার ইপিআর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে এবং শহরের লোকদের হত্যা করছে। ঢাকা, চট্টগ্রামের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে। আমি বিশ্বের জাতিগুলোর কাছে সাহায্যের আবেদন করছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সঙ্গে মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে আপনাদের কাছে আমার আবেদন ও আদেশ_ দেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। আপনাদের পাশে এসে যুদ্ধ করার জন্য পুলিশ, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও আনসারদের সাহায্য চান। কোন আপোস নাই, জয় আমাদের হবেই। আমাদের পবিত্র মাতৃভূমি থেকে শেষ শত্রুকে বিতাড়িত করুন। সব আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং অন্য দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনতাপ্রিয় লোকদের এ সংবাদ পৌঁছে দিন। আল্লাহ আমাদের মঙ্গল করুন। জয় বাংলা।’

বঙ্গবন্ধুর এই স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার হওয়ার পর পাকিস্তানি হানাদার বর্বর বাহিনীর নির্বিচারে গণহত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও সর্বব্যাপী পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি তাদের সর্বশক্তি নিয়ে ইস্পাতকঠিন প্রত্যয় নিয়ে সশস্ত্র লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

সারাদেশে শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। দেশের অকুতোভয় সূর্যসন্তানরা তুমুল যুদ্ধ করে লাখো প্রাণের বিনিময়ে ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতা। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী মাথা নত করে পরাজয় স্বীকার করে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। বিশ্বের মানচিত্রে স্থান পায় এক সাগর রক্তের বিনিময়ে একটি স্বাধীন দেশ, স্বাধীন পতাকা-যার নাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।

যাদের রক্ত ও সম্ভ্রমের মূল্যে আমরা পেয়েছি মহামূল্যবান এই স্বাধীনতা, তাদের কাছে মহামূল্য ঋণ গভীর কৃতজ্ঞতা, ভালবাসা ও বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার দিন আজ। স্বাধীনতার স্মৃতিবিজড়িত দিনটিতে সমগ্র জাতি আজ বাঁধভাঙ্গা প্রাণের উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত হবে। একদিকে হাজার বছরের স্বপ্ন পূরণের সুখ ও আনন্দ, অপরদিকে স্বজন হারানোর ব্যথা-বেদনার এক আবেগঘন মিশ্র পরিবেশের মধ্য দিয়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধা, তাদের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও মুক্তিকামী লাখো মানুষ নানা ব্যঞ্জনায় পালন করবে আজকের দিনটি।

ফুলে ফুলে ভরে উঠবে জাতীয় স্মৃতিসৌধসহ দেশের সব শহীদ মিনার। স্মরণ করবে স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী তার সহকর্মী জাতীয় নেতাদের। জাতি শ্রদ্ধা জানাবে বীরাঙ্গনা আর শহীদ মাতাদের। দৃপ্ত শপথ নেবে- শত ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ছিন্ন করে যুদ্ধাপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করার শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে জাতি আজ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উদযাপন করবে।

এদিকে মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেট, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা জাতীয় পার্টির সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য রওশন এরশাদ এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া পৃথক বাণী দিয়েছেন।

যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস পালন উপলক্ষে এবার জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রত্যুষে রাজধানীতে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসটির সূচনা হবে।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সাভার স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। এছাড়া বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি কূটনীতিকরা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণ জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন।

x