Skip to content

সম্পর্কটা সুস্থ তো!

সেজুঁতি আর পারছেনা। চোখ ফেটে জল আসছে। কিন্তু ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলার মতো মেয়ে সে নয়। দিন দিন সোহানের চাওয়াটা যেন বেড়েই চলছে। রেগে যাচ্ছে একটু ইচ্ছের ব্যতিক্রম হলেই। বন্ধুদেরও চোখে পড়ছে তা।

সেজুঁতির ঘনিষ্ট বান্ধবী মিতা। কফি শপে ওরা আগে বলতে গেলে প্রতিদিনই কফি খেতে আসতো। সোহানের সাথে পরিচয় হওয়ার পর থেকে আগের মতো আসা হয় না। সেদিন উইকেন্ডে সোহানের কি একটা কাজ থাকাতে মিতার সাথে অনেকদিন পর আসা হলো কফিশপে। একথা সেকথা অনেক দিনের অনেক কথাই বলল ওরা। অনেক কথার মাঝে সোহানের প্রসঙ্গটাও এলো। মিতা বলল সোহান তোর কাছে চায় কি বল তো?

কেন, কি চাইবে আবার?

আচ্ছা ও যে তোকে মাঝে মাঝে আমাদের সামনে ছোট করে ফেলে, তা বুঝিস?

বুঝবো না কেন? কিন্তু কেন করে সেটা বুঝি না ।

সেজুঁতি সত্যিই বোঝে না। সোহান কখনো সরাসরি রাগ দেখাচ্ছে, আবার কখনো কোনো কথায় বন্ধুদের সামনে সেজুঁতিকে ছোট করে ফেলছে। সেদিন সিঁড়ি থেকে পা পিছলে পড়ে যাওয়াটা এত বড় কোনো ঘটনা ছিল না। কিন্তু সোহান সবার সামনে এমন ভাবে বলল যেন ও পাশে না থাকলে সেজুঁতির আর রক্ষা ছিল না । একবার বললে কোনো কথা ছিল না। কয়েকবার ওর বলা চাই। যেন সবাইকে ও বুঝিয়ে দিতে চায় সেজুঁতির ওকে খুব দরকার। বোঝানোর বিষয়টা অনেকটা হাস্যকর পর্যায়ে চলে যায়। সেজুঁতির সত্যি রাগ লাগে।

গত কয়েক মাস হল আর্ট ক্লাসে ওদের পরিচয়। তারপর একটা এসাইনমেন্ট একসাথে করতে গিয়ে পরস্পরের জানাশোনাটা একটু বাড়ে। বন্ধুত্ব একটা পর্যায়ে গেলে বুঝতে পারে আলাদা একটা আকর্ষণ আছে পরস্পরের প্রতি। তখন থেকে বন্ধুদের আড্ডা ছাড়াও আলাদা ভাবে দেখা করে। বেশি বেশি সময় দিতে থাকে নিজেদের মধ্যে। কিন্তু তাতে যে কোনো সম্পর্ক ওদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এমন নয়। আপাতত বিশেষ বন্ধুত্বই বলা যেতে পারে। এই ঘনিষ্টতাকে সেজুঁতি সেভাবেই দেখে।

তবুও বন্ধুদের কথায় সোহানের সাথে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিল সেজুঁতি। সোহান বলল সে আসলে সেজুঁতিকে ছাড়া কিছুই ভাবতে পারছে না। অনেকটা অনুতপ্ত মনে হলো তাকে। দুর্ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাইল। বলল এমনটা আর হবে না । নিজেকে বদলে ফেলবে।

বদলানো আর হলো না, বরং দিন দিন বিভিন্ন বিষয়ে চাপাচাপি যেমন বেড়ে গেল তেমনি বেড়ে গেল অধিকারবোধও। আর ইদানিং ওর জেলাস বোধ এত বেড়েছে যে সেজুঁতিকে কারো সাথে হেসে কথা বলতে দেখলেই মুখটা থম থমে হয়ে যায়। সম্পর্ক ধরে রাখতে সেজুঁতির এখন কষ্ট হচ্ছে।

ভালোবাসার এই যন্ত্রণাকাতর অংশটুকুর কথা আমরা অনেক সময়ই বুঝতে পারি না। রূপকথার গল্পের মতো অতপর রাজা রানী সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকল এমনই একটা সুখী সুখী ধারণা থেকে যায় এক সাথে হাত ধরে ঘোরা যুগলদের প্রতি।

কিন্তু সুখটা অনেক সময়ই অধরা থেকে যায়। অপরিচিত দু’জন মানুষ হঠাৎ এতটা কাছে এসে কেমন যেন আবার অনেকটা দূরে সরে যায়। কোথায় যেন কষ্টের সুর বাজে। যে শূন্যতা পরস্পরের সংস্পর্শে কেটে গিয়েছিল তা আবার মনের আকাশে নতুন করে উঁকি মারে । তাহলে এর শেষ কোথায়? এমন একটা প্রশ্ন দেখা দেয় দু’জনার মনেই।

প্রশ্নটা হয়ত আপনাদেরও কারো কারো মনে আসতে পারে। তাহলে আসুন জেনে নেই একটি সম্পর্কের সুস্থ অসুস্থ দিকগুলো।

অসুস্থ সম্পর্ক
১. সঙ্গীর পছন্দ, অপছন্দ যদি আপনাকে চাপে ফেলে।
২. সঙ্গীর মধ্যে ঈর্ষাপরায়নতা এবং অধিকার প্রবনতা দেখা যাবে। কোথায় যান, কি করেন, কার সাথে কথা বলেন, কার সাথে দেখা করেন যদি এসব বিষয়ে আপনার সঙ্গীকে বলতে হয়।
৩. সব বড় বড় সিদ্ধান্তগুলো আপনার সঙ্গী নেয়, আপনার মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে।
৪. আপনার সঙ্গীর প্রতিক্রিয়ার কথা যদি আপনাকে সবসময় ভাবতে হয় ।
৫. আপনার নিজস্ব জগতটা যদি সঙ্গীর কারণে ছোট হয়ে আসে।
৬. দৈহিক মিলনের ক্ষেত্রে আপনি যদি চাপ অনুভব করেন।
৭. নিজেকে উপেক্ষা করে যদি সঙ্গীর প্রয়োজনকে বড় করে দেখতে হয়।
৮. সঙ্গী যদি আপনাকে দায়ী করে।
৯. ভয় দেখায়।
১০. ঘন ঘন রাগ করে।

তাহলে সুস্থ সম্পর্ক কেমন হবে? সুস্থ সম্পর্কে কেউ কারো জন্য কষ্টকর হবে না।

সুস্থ সম্পর্ক:
১. পরস্পর পরস্পরের ব্যক্তি স্বাতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে
২. কোনো হিংসা থাকবে না। আপনার বন্ধু-বান্ধব আত্মীয় স্বজন আপনার সঙ্গী সহজভাবে গ্রহণ করবে।
৩. নিজেদের মধ্যে আলোচনা হবে, ভিন্ন মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে।
৪. পারস্পারিক বিশ্বাস থাকবে।
৫. একে অপরকে বদলাবার চাপ থাকবে না।
৬. দুজনেরই একান্ত ব্যক্তিগত জগত থাকবে।
৭. দৈহিক সম্পর্কের জন্য চাপ থাকবে না।
৮. দু’জনেই দু’জনার আচার-আচরণ, আবেগ অনুভুতির দায়িত্ব স্বীকার করবে। পরস্পরকে দায়ী করবে না।

এই হলো সুস্থ এবং অসুস্থ সম্পর্কের মধ্যে পার্থক্য। আসুন আমরা এই বসন্তকে উদযাপন করি সুস্থ সুন্দর ভালোবাসার মধ্যে দিয়ে। কারণ অর্থপূর্ণ সম্পর্কই পারে আমাদের সবচেয়ে বেশি সুখি করতে।

ডা. এস এম আতিকুর রহমান
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, মনোরোগ বিদ্যা বিভাগ
বঙ্গ বন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ব বিদ্যালয়

x