শ্রম বিক্রির হাটে ক্রেতা নেই, বিরস বদনে বসে আছেন দিনমজুররা

“কোন কামের লাগি চাইরা (চাচ্ছেন) মাজন (মহাজন)? বাড়ির কাম, না বাইরের কাম? দেখইন আমার লগে সব আইত্তর (হাতিয়ার বা যন্ত্র) আছে। কামে কোনো সমস্যা অইতো না। রুজ (মজুরি) ভালা দিলে শুধু দেখাইয়া দিবাইন, আপনার সব কাম সুন্দর কইরা অইবো।” এভাবে কথাগুলো বলছিলেন দিনমজুর বিজয় দাস। শুধু তিনি নয়, আরও প্রায় অর্ধশতাধিক লোক শ্রমবিক্রি করার জন্য জড়ো হয়েছেন। আর এই শ্রম বেচা-কেনার হাটের চিত্র দেখা যায় সুনামগঞ্জ শহরের কালীবাড়ি মোড়ে।

শ্রমিকের এই হাট বসে প্রতিদিন। সেখান থেকে দরদাম করে তাদেরকে কাজের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। করোনা পরিস্থিতিতে মানুষের হাতে টাকা নেই—তাই তাদের কাজেও নিচ্ছে কম, বললেন কাজের আশায় বসে থাকা দিনমজুরেরা। চোখেমুখে হতাশা।

প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে ওই এলাকায় ভীড় জমে দিনমজুর মানুষের, যারা বিভিন্ন প্রান্তিক এলাকা থেকে প্রতিদিন কাজের সন্ধানে এখানে জড়ো হন। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে তাদের অনেকেই কাজ না পেয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরেন।

গত মঙ্গলবার সকাল ৭টায় শহরের আলফাত স্কয়ার পেরিয়ে কালীবাড়ি মোড়ে দোজা শপিং সেন্টার প্রাঙ্গণে দেখা গেল কাজের সন্ধানে জড়ো হওয়া মানুষদের। বিরস চেহারায় বসে আছেন। অপেক্ষা করছেন, কখন কেউ এসে কাজের সন্ধানে তাদের খুঁজবে।

জানা যায়, প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে শুরু করে সকাল ১০টা পর্যন্ত দর কষাকষি করে শ্রমজীবীদের শ্রম বিক্রি হয়। শহরের কালীবাড়ি পয়েন্টে এই ‘শ্রমের হাট’ প্রায় এক যুগ ধরে চলে আসছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় অর্ধশতাধিক শ্রমজীবী মানুষ এখানে এসেছেন কাজের আশায়। বিভিন্ন এলাকার মানুষ বাড়ির কাজ, দোকানের কাজ, কৃষিকাজের জন্য তাদেরকে নিয়ে যাচ্ছেন দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে। আর এর আগে চলতে থাকে অন্যান্য পণ্য কেনার মতো দর কষাকষি। সকালের দিকে চাহিদা বেশি থাকে। শ্রমজীবীরা দামও বেশি হাঁকেন। সময় গড়িয়ে গেলে শ্রমিকের চাহিদা কমে আসে এবং দামও কমে।

স্থানীয়ভাবে শ্রমজীবীদের বলে দিনমজুর, আবার কেউ বলেন ‘কামলা’। ৬৫ বছরের বৃদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের শ্রমজীবী মানুষ কাজের সন্ধানে দলে দলে ছোটেন কালীবাড়ি মোড়ের শ্রমের হাটে। এই মানুষগুলোর অধিকাংশই আশ্রয়হীন, হতদরিদ্র। কাজের ধরণ অনুযায়ী ক্রেতাদের কাছে তারা কেউ একদিন, কেউ এক সপ্তাহ, আবার কেউ কেউ এক মাসের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে থাকেন।

কয়েকজন দিনমজুরের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দৈনিক ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায় তারা কাজ করেন। তবে মালিকের পছন্দের ওপর নির্ভর করে মূল্য। বৃদ্ধের চেয়ে জোয়ানদের চাহিদা বেশি। অনেকে শ্রমজীবীর শারীরিক গঠন দেখেও কাজ দিয়ে থাকেন।

কাজের সন্ধানে আসা জিয়া মিয়া জানান, চতুর্দিকে পানি হওয়ায় এ সময় গ্রামের বাড়িতে কোনো কাজকর্ম নেই। পরিবার-পরিজন নিয়ে খুব কষ্ট আছি। তাই শহরের এই হাটে কাজের সন্ধানে ছুটে এসেছি। বউ বাচ্চার রিজিকে যদি খাবার থাকে তাহলে আমার শ্রম নিতে কেউ আসবে। তিনি জানান, করোনাকালে কাজকর্ম কমে গেছে। তাই প্রায়সময়ই কাজ না পেয়ে খালি হাতেই ঘরে ফিরতে হয়।

মান্নারগাঁও গ্রামের আলম মিয়া জানান, শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসের প্রথম দিকে আমনের চারা রোপণের মৌসুম ছিল। এ সময় কৃষি কাজের শেষ নেই। সেসময় আমনের চারা রোপণের জন্য শ্রম কেনার ক্রেতাদের আনাগোনা ছিল বেশি এবং ভালো মজুরিতে তারা চুক্তি করতেন। এখন চাহিদা আগের চেয়ে কম।

স্থানীয়রা জানান, শ্রম কেনা-বেচার এই হাট থাকায় কাজের জন্য শ্রমিক সংকটে পড়তে হয় না। চাহিদা মতো দর কষাকষি করে শ্রমিক পাওয়া যায়। আর এই হাট যদি প্রচলন থাকে তবে আশপাশ এলাকার মানুষের জন্য উপকার হবে। তবে করোনা পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টিও দেখতে হবে। তারা যাতে ন্যায্য মূল্য পান সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

  • পীর জুবায়ের, সহকারী বার্তা সম্পাদক, সুনামগঞ্জ মিরর

সুনামগঞ্জমিরর/টিএম

x