করিমের বাউল-দর্শন

অনেকেই বলে থাকেন, “করিমের গানে ‘বাউল-দর্শন’ কম। লালনের মতো তিনি আলাদা তত্ত্ব দাঁড় করাতে পারেননি।”

এই বক্তব্য আংশিক সত্য। বাউল-দর্শনের যে মূল কথা দেহসাধনা এবং এর ভেতর দিয়ে ঈশ্বরকে পাওয়া—এই তত্ত্বের প্রমাণ তাঁর বহু গানেই আছে। ‘গাড়ি চলে না’, কোন মেস্তরি নাও বানাইলো’—এগুলো তাঁর দেহবিষয়ক ভাবনাই প্রকাশ করে। এই ভাবনার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটান তিনি ‘কেমনে চিনিব তোমারে’ গানে। এই গানে তিনি বলেন-

“তন্ত্রমন্ত্র করে দেখি তার ভেতরে তুমি নাই

শাস্ত্রগ্রন্থ পড়ি যত আরও দূরে সরে যাই

কোন সাগরে খেলতেছো লাই

ভাবতেছি তাই অন্তরে

কেমনে চিনিব তোমারে।”

শাহ আব্দুল করিম ছিলেন ভাটির মানুষ। ভাটির অবারিত জলরাশির মতো তাঁর মনও ছিল উদার, সরল। এই সরলপ্রাণ মানুষটি তত্ত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থাকেননি সবসময়। ভাটি অঞ্চলের মানুষ, তাদের সুখ-দুঃখ, দারিদ্র্য ও তাদের বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরতে থাকলেন তাঁর গানে। হয়ে উঠলেন গণমানুষের শিল্পী আর সাধরণ মানুষের ‘করিম ভাই’। করিম তাই দৃঢ় কন্ঠে স্বীকার করেন-

“তত্বগান গেয়ে গেলেন যারা মরমি কবি

আমি তুলে ধরি দেশের দুঃখ-দুর্দশার ছবি

বিপন্ন মানুষের দাবি, করিম চায় শান্তির বিধান।”

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ঐকতান’ কবিতায় বলেছিলেন যে, জীবনে জীবন যোগ করা না হলে কৃত্রিম পণ্যে ব্যর্থ হয় গানে পসরা। করিম যেসব মানুষ ও সমাজজীবনকে তাঁর গানে তুলে ধরেছেন—সেই সমাজ-মানুষ সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল আজন্মলালিত। ফলে তাঁর গান ব্যর্থ হয়নি, বরং মানুষের অন্তরবেদনার মর্মমূলে তুলেছে

সমব্যথী জাগরণ। করিম যখন বলেন-

“ভাইরে ভাই/ভোট দেওয়ার সময় আইলে/নেতা সাহেব এসে বলে/এবার আমি পাস করিলে/ কাজ করবো গরিবের-দায়।/ শেষে দেখা যায়—ধনীর বাড়ি খাসি খাওয়া, লাইসেন্স পারমিট দেওয়া/নৌকা বাওয়া আর সালাম দেওয়া—এই দুইটা গরিবে পায়।/গরিবের কি মান-অপমান দুনিয়ায়!”

অথবা “এই কি তোমার বিবেচনা/কেউরে দিলায় মাখন-ছানা/আর কেউর মুখে অন্ন জুটে না/ভাঙা ঘরো ছানি নাই।”

তখন এদেশের বঞ্চিত মানুষ করিমকে ভাল না বেসে পারেন?

বর্তমান সময়ের যে সংকট যেমন দেশপ্রেমের অভাব, দুর্নীতি—এগুলো দূরদর্শী করিম খুব ভালভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এবং এসবের প্রতিবাদও তিনি গানে গানে করেছেন। ‘জন্ম আমার ধন্য যে হায়, জন্ম বাংলা-মায়ের কোলে/ আমি বাংলা-মায়ের ছেলে’ বলে তিনি যে প্রীত হয়েছিলেন, সেই জন্মভূমির নানাবিধ সমস্যা তাঁকে ব্যথিতও করেছে। দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে করিম তাই বলে ওঠেন-

” তোমরা খবর রাখনি/উন্দুরে(ইঁদুর) লাগাইছে শয়তানি।/ বাড়িত কাটে বাড়ির বস্ত্র, ক্ষেতে কাটে ধান/ ঘরের ধন বাইরে নিয়া ঘটাইছে নিদান।”

আজকের ব্যাংকলুঠেরা কোটি কোটি টাকা পাচার করে দেশের ক্ষতি করছে না??

করিম যেমনভাবে শান্তির কথা বলেছেন, সাম্যের কথা বলেছেন, তেমনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথাও বলেছেন। লালন যেখানে ‘জাত’কে অস্বীকার করেছেন, করিম সেখানে বাস্তবতাকে স্বীকার করেছেন এবং বলেছেন-

“এইসব নিয়ে দ্বন্দ্ব কেন/কেউ হিন্দু কেউ মুসলমান/ তুমিও মানুষ আমিও মানুষ/সবাই এক-মায়ের সন্তান।”

চরম দারিদ্র্য ও অর্থ-কষ্টের মধ্যেও করিম তাঁর নীতিবোধের জায়গাটিতে কখনও ছাড় দেননি। হিংসার মতো মানুষের আদিম প্রবৃত্তি তাঁকে এক মুহূর্তের জন্যও ছুঁতে পারেনি। যারা তাঁকে ‘নেশাখোর’ বলেছেন, ‘পাগল’ বলেছেন, তাদের কারো বিরুদ্ধে তিনি খড়গহস্ত হননি। বাউলের প্রাণ সেখানে বরং ‘রস’ বিলিয়েছে। নিরহংকার এই মানুষটি জীবদ্দশায় জনপ্রিয়তা পেলেও শেষ পর্যন্ত নির্মোহ-নির্লিপ্ত জীবন কাটিয়েছেন। তাই মানুষের অন্তহীন লোভ দেখে তিনি বলেছেন-

“একদিন তোমায় যাইতে হবে এই সমস্ত থইয়া রে

ভব সাগরের নাইয়া/ মিছা গৌরব কর রে পরার ধন লইয়া।”

পরের ধন নিয়ে তিনি অনন্তের পথে পা বাড়িয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর ধন আমাদেরকে দিয়ে সমৃদ্ধ করে গেছেন। এজন্য বাউল সম্রাটের প্রয়াণ দিবসে কৃতজ্ঞচিত্তে শ্রদ্ধা জানাই।

লেখক: মোঃ রুহুল আমিন

শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

x