Skip to content

‘বাঁশের লাঠিকে রাইফেল বানিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে অংশ নিই’

বীর প্রতীক ইদ্রিস আলী। তিনি সুনামগঞ্জের দোয়ারা বাজার উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের বড়খাল গ্রামের মৃত মো. ইসমাইল ও জামিরা খাতুনের সন্তান। পেশায় তিনি একজন শিক্ষক। এই বীর মুক্তিযোদ্ধা ১৯৭১ সালে এইচএসসি পাস করে সিলেটের মদনমোহন কলেজে নৈশ শাখায় পড়তেন। একইসঙ্গে দোয়ারাবাজারের বড়খাল জুনিয়র হাই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন।

খুব ভালোই চলছিল শিক্ষার্থীদের নিয়ে তার জীবন। শিক্ষার্থীদের কাছে খুবই প্রিয় তিনি। হঠাৎ দেশটা থমথমে হয়ে ওঠে। পাকিস্তানিরা হত্যা করতে লাগলো নিরীহ বাঙালিদের। তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যুদ্ধে যাওয়ার সময় হয়েছে। দেশকে বাঁচাতে, দেশের মানুষ বাঁচাতে যুদ্ধে যেতেই হবে।

প্রশ্ন: কখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেন?

ইদ্রিস আলী: ৬৯’র গণ-আন্দোলনের সময় যখন জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবো- স্লোগানে আমরা আন্দোলন সংগ্রামরত, তখন থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা আন্দোলন, ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন সেগুলো মিলিয়ে রাজপথে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলি। বঙ্গবন্ধু কারামুক্ত হওয়ার পর ৭০’র নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন এবং আমরা তার পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিই। পরে আমরা বিজয় অর্জন করি।

কিন্তু সেই সময় গোটা পাকিস্তানে মেজরিটি পার্টি হয়েও যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যেতে পারলো না। ষড়যন্ত্র শুরু হলো, ইয়াহিয়া খান কালক্ষেপণ করে এই বাংলায় সৈন্য মজুত করতে থাকলেন। তাতেই আমরা বুঝতে পারি, আমাদের একটি যুদ্ধে অবতীর্ণ হতেই হবে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের সেই বজ্রকণ্ঠের আহ্বান আমাদেরকে আরও প্রস্তুত করে তোলে। আমরা তখন থেকে বাঁশের লাঠি নিয়ে রাইফেলের মতো করে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে থাকি।

আমাদের অবসরপ্রাপ্ত ইপিআর, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ সহযোগিতা করেন। সেইভাবে গোটা বাংলার ছাত্র, তরুণ, কৃষক, শ্রমিক, জেলে, মাঝি, খামারি সবাই প্রস্তুত হয়ে যায় যুদ্ধের জন্য। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য। যদিও আমাদের কিছুই ছিল না। কিন্তু আমরা বিভিন্ন জায়গার থানার অস্ত্র, ইপিআর ক্যাম্পগুলোর অস্ত্র সংগ্রহ করি। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি বাহিনীরা যখন অপারেশন র্সাচ লাইটের নামে একটা হত্যাযজ্ঞ শুরু করলো, তখনই আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দিকনির্দেশনা দিয়ে যখন মেসেজ পাঠান।

এরপর গোটা জাতি মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি শুরু করে, যে শাসকের হাতে রক্ত পিলখানায়, রাজারবাগে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নিরস্ত্র ঘুমন্ত মানুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে অরাজকতা সৃষ্টি করে। গোটা বাঙালি জাতি যেমন মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে, আমরাও নিজ এলাকায় প্রস্তুতি নিতে থাকি প্রিয় নেতা আব্দুল হকের সরাসরি নির্দেশনায়। তার পরার্মশে আমরা প্রস্তুতি নিতে থাকি, তারপর ভারতের মেঘালয়ের ইকো ওয়ান ট্রেনিং সেন্টারে প্রথম ব্যাচে ২৮ দিন ১১ জন তরুণ আমরা যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণ নিই।

প্রশ্ন: শুরুর দিকে মনোভাব কেমন ছিল বা কারও দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয়েছিলেন কি না?

ইদ্রিস আলী: মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার ক্ষেত্রে পারিবারিকভাবে কিংবা সামাজিকভাবে বাধাগ্রস্ত হইনি। কারণ আমরা সীমান্ত এলাকার মানুষ, যেটা চিরমুক্ত ছিল। যে কারণে আমরা বাধাগ্রস্ত হইনি। যথারীতি যুদ্ধে যেতে পেরেছি। তবে আমাদের প্রিয় নেতা আব্দুল হক সাহেবের সঙ্গে দেখা করার পর আমরা যখন ফিরে আসছিলাম বাড়ির দিকে লোক সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়ার জন্য, তখন একজন খাসিয়া লিডার আমাদেরকে বাধাগ্রস্ত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমরা পাকিস্তানি সিপাহী। তখন আমার বন্ধু নুরুল হককে তার কাছে জিম্মি রেখে আমি ফিরে যাই তালাবে এবং সেখানকার ওসির কাছে বলার পরে ওসি সাহেব দুজন পুলিশ পাঠিয়ে আমাদেরকে বাড়ি পৌঁছানোর সুযোগ করে দেন।

প্রশ্ন: তখনকার প্রতিটি মুহূর্তই ছিল ঝঁকির্পূণ। এমন কোনো ঘটনা আছে, যা আপনার মনকে আজও শিহরিত করে?

ইদ্রিস আলী: যুদ্ধের সময়ের স্মৃতি অব্যশই শিহরণ জাগায়। প্রথমে আমরা ‘হিট অ্যান্ড রান’ যুদ্ধে অভ্যস্ত ছিলাম, গেরিলা পদ্ধতিতে। পরবর্তীতে যখন সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হই, তখন অনেকটা অনভ্যস্থ অবস্থায় সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছি। আমার জীবনের প্রথম যে যুদ্ধটা হয়েছিল, সেটা বালিউড়া যুদ্ধ। এখানে আমাদের মাত্র ছয়জনের ২০ রাউন্ড গুলি ছিল, আর একটি করে রাইফেল ছিল। এই নিয়ে আমরা শত্রুর মোকাবিলা করতে শুরু করেছিলাম। সামনে অনেক শত্রু। যে কারণে ধীরে ধীরে পিছু হটে ব্রিটিশ রোডে আমরা অবস্থান নিই। তারপর মর্টারশেল নিক্ষেপ করি। এর ফলে পাকিস্তানিরা পিছু হটতে শুরু করে। এটা ছিল যুদ্ধ জীবনে প্রথম রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। আর সর্বশেষ যে লড়াই আমাদের এই এলাকার সবচেয়ে বিখ্যাত যুদ্ধ হয়েছিল যেটিতে অনেকেই শাহাদাত বরণ করেছেন। সেই যুদ্ধটি ছিল ছাতক অপারেশন। এই যুদ্ধটির কথা মনে হলে এখনো আমার মনে শিহরণ জাগে।

প্রশ্ন: বিজয়ের প্রাক্কালে আপনি যেখানে দায়িত্ব পালন করতেন, সেখানকার সার্বিক পরিস্থিতি কেমন ছিল?

ইদ্রিস আলী: মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের প্রাক্কালে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত সুসংগঠিত ছিল। আমাদের সেক্টর কমান্ডারের কঠোর নিয়ন্ত্রণে ভালো অবস্থানে ছিলাম। আমাদের এখানে কেউ অন্যায় করে পার পেতো না। মুক্তিযোদ্ধরাও যদি কোনো অপরাধ করেছে, সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি পেয়েছেন। এই হিসাবে আমরা ভালো অবস্থানে ছিলাম।

প্রশ্ন: বিজয়ের ৫০ বছর পর দেশকে নিয়ে কিছু বলুন?

ইদ্রিস আলী: পাকিস্তান ২৫ বছরে নামা কাজির একটি ব্রিজও বানাতে পারেনি। আমরা তো এই স্বাধীন বাংলাদেশে সুরমা নদীর ওপর কিং ব্রিজের পর আরও আটটি ব্রিজ বানিয়েছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আজকে আমরা দেশের টাকায় পদ্মাসেতু করছি। তিনি দেশের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছেন। আজকে মানুষ যে কোনো জায়গা থেকে গাড়ি করে বাড়ি যেতে পারেন। এই যে সুন্দর অবস্থা। পাকিস্তানে থাকলে আমরা আমাদের বিদেশে যে জনবল পাঠিয়েছি, সেটা কখনো সম্ভব হতো না। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই দেশ মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে বলেই আজ বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে আছে।

প্রশ্ন: ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উদ্দেশে কিছু বলুন?

ইদ্রিস আলী: আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবে জীবনের ১৩টি বছর জেল খেটেও কেবলই মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন। সারা জীবন লড়াই সংগ্রাম করে মাত্র সাড়ে তিন বছর দেশ পরিচালনা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তারপর কিছু কুলাঙ্গার তাকে এবং তার পরিবারকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। আওয়ামী লীগকে নিশ্চিহ্ন করে এই দেশকে নেতৃত্বশূন্য করার চেষ্টা করে। এরপরও আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অলৌকিকভাবে বিদেশে থেকে বেঁচে যাওয়ায় আজকে দেশ পরিচালনা করছেন। এত দুঃখ, বেদনা অন্তরে নিয়েও তিনি এই দেশকে উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন। দিবারাত্রি কাজ করছেন।

বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে। তারপর উল্টো প্রহসনের মামলা করা হলো। এই সব জখম হৃদয়ে নিয়ে তিনি যেভাবে ত্যাগ স্বীকার করে বাংলাদেশের উন্নয়ন করছেন, ঠিক সেইভাবে আগামী প্রজন্ম নিজেদের প্রস্তুত করবে বলে প্রত্যাশা করি।

সৌজন্যে: জাগো নিউজ

লিপসন আহমেদ/সুনামগঞ্জমিরর/এসএ

x