Skip to content

স্বপ্নজয়ের উদ্বোধন রাত পোহলেই

পদ্মা সেতু, একটি স্বপ্নের নাম। তবে এখন আর সেটি স্বপ্ন নয়, বাস্তব। যে স্বপ্ন দেখা শুরু হয়েছিল প্রায় দুই যুগ আগে সেটি এখন পূরণ হচ্ছে। আর ২০১৪ সালের ৭ ডিসেম্বর এর নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর ৮ বছরের মাথায় শেষ হলো। অপেক্ষার পালা শেষ, সামনে চলে এসেছে সেই শুভক্ষণ।

রাত পোহলেই শনিবার (২৫ জুন) উদ্বোধন হচ্ছে স্বপ্নজয়ের পদ্মা সেতুর। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেতুর মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে দুই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সেতুর উদ্বোধন করবেন। গাড়ি চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে পরশু রোববার (২৬ জুন) ভোর ৬টা থেকে।

শনিবারের (২৫ জুন) উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে ঘিরে পদ্মার দুই পাড়ে এখন সাজ সাজ রব। মুন্সীগঞ্জের মাওয়া, শরীয়তপুরের জাজিরা ও মাদারীপুরের শিবচর উপজেলা এলাকা ব্যানার-ফেস্টুনে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। সড়কের দুই পাশে এবং গুরুত্বপূর্ণ ভবনগুলো নিয়ন আলোয় আলোকিত হয়ে গেছে। এসব এলাকার মানুষের মধ্যেও এক রকম উৎসবের আমেজ বয়ে যাচ্ছে। তারা গর্বিত তাদের এলাকায় দেশের টাকায় নির্মিত সবচেয়ে বড় অবকাঠামো নির্মাণ হওয়ায়।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করবেন, এ জন্য দুই পাড়ে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বলা যায়, পুরো এলাকা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রাখা হয়েছে। এনএসআই, এসবি, ডিবি, র‌্যাব-পুলিশসহ সকল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সদা তৎপর রয়েছেন।

পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে ঘিরে একরকম ঢেলে সাজানো হয়েছে ওই এলাকাকে। মাওয়া প্রান্তে ঢাকা থেকে যাওয়ার পথে বুড়িগঙ্গা দ্বিতীয় সেতু থেকেই রাস্তার দুই ধার সাজানো হয়েছে। বড় বড় ব্যানার ও সাইনবোর্ড শোভা পাচ্ছে। আর ঢাকা-মাওয়া হাইওয়ে এক্সপ্রেসওয়ের একেবারে শুরু থেকে মাওয়া ঘাট পর্যন্ত রাস্তার দুই ধারে ওয়াল এবং আশপাশের বড় বড় বেশ কিছু ভবনে আলোকসজ্জা করতে দেখা গেছে।

প্রধানমন্ত্রী মাওয়া এবং জাজিরা প্রান্তে দুটি অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুর একেবারে গোড়ায় স্থাপন করা হয়েছে একটি বড় মঞ্চ ও প্যান্ডেল। পুরো প্যান্ডেলটি ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। র‌্যাবের মহাপরিচালক এই সভাস্থলটিও পরিদর্শন করেন। এই জায়গাটা মূলত মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুতে গাড়ি ওঠা ও নামার স্থান। এখানে সড়ক ডিভাইডারে এবং সড়কের দুই পাশে বড় বড় ব্যানার এবং সাইনবোর্ড দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। এই প্রান্তের টোল প্লাজাটিকেও শতভাগ প্রস্তুত দেখা গেল। টোল প্লাজাটি পার হলেই বেশ কয়েকটি ইলিশের ম্যুরাল তৈরি করা হয়েছে। শ্রমিকরা এসব ম্যুরালে শেষ সময়ের কাজগুলো সম্পন্ন করতে ব্যস্ত রয়েছেন। ইলিশের ম্যুরালটি পার হলেই চোখে পড়বে মাওয়া প্রান্তে পদ্মা সেতুর মূল ম্যুরালটির। যেখানে থাকবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশাল আকৃতির ছবি। এখানকার শেষ সময়ের কাজগুলোও শেষ করতে শ্রমিকদের সারা দিন ব্যস্ত থাকতে দেখা গেল।

এদিকে জাজিরা প্রান্তে মূল জনসভাস্থলটিকে একেবারে ঢেলে সাজানো হয়েছে। এখানে মূল যে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে সেটি করা হয়েছে পদ্মা সেতুর স্প্যানের আদলে। শনিবার এই মঞ্চে দাঁড়িয়েই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বক্তৃতা দেবেন। আশা করা হচ্ছে এখানে দশ লাখেরও বেশি মানুষের সমাগম ঘটবে। এই বিশাল সংখ্যক মানুষের আগমন উপলক্ষে পুরো সভাস্থল প্রস্তুত করা হয়েছে। সভাস্থলে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে মানুষকে বসতে দেওয়া হবে। এজন্য বাঁশ দিয়ে আলাদা করে ঘিরে দেওয়া হয়েছে।

পদ্মা সেতুর (মূল সেতু) দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। দুই প্রান্তের উড়ালপথ (ভায়াডাক্ট) ৩ দশমিক ৬৮ কিলোমিটার। সব মিলিয়ে সেতুর দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ৮৩ কিলোমিটার। পদ্মা সেতু প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। পদ্মা সেতু প্রকল্পের টাকায় সেতুতে রেল চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এখনও রেললাইন বসানো শুরু হয়নি।

দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলাকে সারা দেশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করবে পদ্মা সেতু। এ সেতুর মাধ্যমে মোংলা বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। চলাচল সহজ করার পাশাপাশি অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে পদ্মা সেতু। সমীক্ষা অনুযায়ী, পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ১ দশমিক ২৩ শতাংশ হারে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বৃদ্ধি পাবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বাড়বে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।

২০০১ সালের ৪ জুলাই পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর সেতুর কাজ কয়েক বছর এগোয়নি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসার পর থেমে থাকা এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১২ সালে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক ঋণচুক্তি বাতিল করে। ২০১৩ সালের ৪ মে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর পর থেকেই চলছে সেতু নির্মাণের বিশাল কর্মযজ্ঞ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের ৭ ডিসেম্বর মূল সেতুর নির্মাণ ও নদী শাসন কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এরপর ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে বসানো হয় প্রথম স্প্যান। ২০০৭ সালে একনেকে পাস হওয়া পদ্মা সেতু প্রকল্পের ব্যয় ছিল ১০ হাজার ১৬২ কোটি টাকা। ২০১১ সালে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে দ্বিতীয় দফা সংশোধনের পর ব্যয় দাঁড়ায় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।

আরও ১৪ সেতুর টোল ফ্রি : এদিকে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিন খুলনা, বরিশাল ও গোপালগঞ্জের ১৪টি সেতুর টোল মওকুফ করেছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে ওই দিন একটি ফেরির টোলও মওকুফ করা হয়েছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে বৃহস্পতিবার এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিন শুধু ২৫ জুন খুলনা জোনের আওতাধীন খানজাহান আলী (রূপসা) সেতু ও দড়াটানা সেতু, বরিশাল জোনের আওতাধীন দোয়ারিকা-শিকারপুর সেতু, দপদপিয়া সেতু, গাবখান সেতু, বলেশ্বর সেতু, পটুয়াখালী সেতু, শেখ রাসেল সেতু, শেখ কামাল সেতু, শেখ জামাল সেতু ও পায়রা (লেবুখালী) সেতু এবং গোপালগঞ্জ জোনের আওতাধীন মোল্লাহাট সেতু, আচমত আলী খান বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু, কালনা ফেরি ও শেখ লুৎফর রহমান সেতু (পাটগাতি সেতু) যানজটমুক্ত রাখার উদ্দেশ্যে বর্ণিত ফেরি ও সেতুগুলো থেকে টোল আদায় মওকুফ করা হলো। গত ২০ জুন এক প্রজ্ঞাপনে পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দিনে বুড়িগঙ্গা সেতু, ধলেশ্বরী সেতু ও আড়িয়াল খাঁ সেতুর টোল মওকুফ করা হয়।

পদ্মা সেতুতে দৈনিক চলবে ৭৫ হাজার যানবাহন : স্বপ্নের পদ্মা সেতু নিয়ে মানুষের আগ্রহ অনেক। ঢাকার সঙ্গে সরাসরি ২১ জেলাকে সংযুক্ত করবে এ সেতু। উপকৃত হবে অন্তত তিন কোটি মানুষ। আর দৈনিক ৭৫ হাজার যানবাহন চলাচল করবে।

সুনামগঞ্জমিরর/এসএ

x