Skip to content

বন্যায় ক্ষত-বিক্ষত সুনামগঞ্জ

স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় সুনামগঞ্জ জেলাবাসীকে ক্ষত-বিক্ষত করেছে। ঘর-বাড়ি রাস্তা-ঘাট ও গবাদিপশুসহ সব কিছুতেই বন্যার বন্যার ক্ষত চিহ্ন বহন করে চলছে। সরেজমিন সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের জানিগাঁও এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে ১৬ জুন থেকে ওই গ্রামের ২৪টি পরিবার তাবু তৈরী করে বসবাস করছেন।

এক তাবুতে আশ্রয় নেয়া সোহেনা আক্তারের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। সোহেনা জানান, গাড়ির শব্দে দিনরাত ঘুম আসেনা। জানডা কাইপ্যা উঠে। আমার (তার)ছোড পোলাডা (৫ মাস) আতঁকে আতঁকে উঠে। রাতে ঘুমাতে পারে না। দিনেও ঘুমাতে পারে না। সব সময় তাকে কূলে। তার ৫ মাসের ছেলে হাফিজুর রহমানই নয় তাদের পরিবারের কারোরই ঘুম আসেনা। ওই বুঝি গাড়ি তাদের তাবুতে উঠে পরে। তিনি আরো জানান, ১৬ জুন তাদের ছোট কুড়ে ঘরটি বন্যার পানিতে ডুবে গেলে তার স্বামী গোলাম হোসেন তাদের নিয়ে সড়ককে আশ্রয় নেন। এরপর থেকে তাবু তৈরী করে পরিবার পরিজন নিয়ে সড়কে তাবুতেই বসবাস করছেন তারা। হোসনে আরা স্বামী গোলাপ হোসেন জানান, তিনি পেশায় একজন দিনমজুর। বন্যার আগ পর্যন্ত তার সংসার ভালই চলছিল। বৃহস্পতিবার (১৬ জনু) তাদের বসত ঘরটি ডুবে গেলে সড়কে আশ্রয় নেন তারা।

একই সড়কের একই এলাকার তাবুতে বাস করা সদর উপজেলার জানিগাঁও গ্রামের হোছনেহার জানান, তার স্বামী তারা মিয়া গত ১২ বছর ধরে সুস্থ। তিনি দিনমজুরি করে এবং আত্মীয়-স্বজনের হসযোগিতায় বাড়িতে একটি ছোট দোকান দিয়েছিলেন। কিন্তু সর্বনাশা বন্যার পানির  স্রোতে তার শেষ সম্বল দোকানটি ভেসে গেছে। এখন ১১দিন ধরে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে সড়কে তাবুতে বসবাস করছেন। একই এলাকায় তুবুতে আশ্রয় নেয়া জানিগাঁও গ্রামের আরজান আলী জানান, তিনি একজন বর্গাচাষী। ৬ সদস্যের তার পরিবার। এবার তিনি চার একর জমি চাষ করে ৫০ মণ ধাণ পেয়েছে। কৃষিকাজ ছাড়াও তিনি দিনমজুরী করেন। বন্যায় হঠাৎ করে তার বসত ঘর ডুবে গিয়ে পানির ¯্রােতে তার সব ধান চলেগেছে। এখন পরিবার পরিজন নিয়ে সড়কে তাবু গ্যাঁড়ে বাসবাস করছেন। তিনি জানান, পানি কমছে। কিন্তু তার বসত ভিটায় এখনও কাঁদা মাখামাখি করছে। কাঁদা না শুকানো পর্যন্ত বাড়ি ফিরতে পারছেন না। তিনি আরও বলেন, শুনছি নদীর পানি বাড়তাছে। নদীর পানি আবারও বাড়লে আমাদের যাওয়ার জায়গা থাকবে না। একই বক্তব্য তাবুতে বসবাস করা দিলবি বিবির। দিলবি বিবি জানান, ওই এলাকায় ১৬টি তাবুতে তাদের গ্রামের ২৪টি পরিবার বসবাস করছে।

পরিবারের সঙ্গে তাবুগুলোতে বাস করছে বেশ কয়েটি শিশু। তারা প্রাইমারিতে পড়া লেখা করে। বন্যায় তাদের বই, খাতা ও কলম ভেসে গেছে। তাবুর বাসিন্দা লুৎফা আক্তার মীম জানায় সে গ্রামের প্রাইমারীতে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। বন্যায় বই, খাতা ও কলম ভেসে গেছে। খালি গায়ে(শরীরে) এসে শিশু শ্রেণি সামাইয়া এসে জানায়, তার পরনের কাপড়-ছোপড় ও বই বন্যার পানি বাসিয়ে নিয়ে গেছে।

এদিকে, সুরমা নদীর সুনামগঞ্জ ষোলঘর পয়েন্টে গত ২৪ ঘন্টায় ১৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদ সীমার ২৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এখবর সুরমা পারের বাসিন্দাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে বন্যা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। সুনামগঞ্জ শহরের বনানীপাড়ার বাসিন্দা ছায়াতুন নেছা জানান, বৃষ্টি হলে বা নদীর পানি বৃদ্ধি খবর শুনলে তার বুকটা বন্যা আতঙ্কে ধরফর করে।

হাওর বাঁচাও অন্দোলনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক একে কুদরত পাশা জানান, সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি প্রধান জেলা। এ জেলার কৃষকরা এখন নানামুখি সংকটে পড়েছে। প্রথমত অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ী ঢলে ফসল হারিয়েছে একতৃতৃয়াংশ কৃষক। বাকিরা কিছু ধান তুলতে পারলেও দুদফা বন্যায় কারো কারো ৫০ ভাগ গোলার ধান নষ্ট হয়েগেছে। হাওর বাঁচাও অন্দোলনের ওই নেতা আরো জানান, ত্রাণ বিতরণে প্রশাসন হযবরল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি অভিযোগ করে জানান, শহর এলাকায় বন্যার্তরা ত্রাণ পেলেও শহরতলী ও গ্রামের ত্রাণ সামগ্রি পৌছেনি।

জেলা প্রশাসকের শিক্ষা শাখার সূত্র জানায়, এবার এসএসসি ও দখিল পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ২৮ হাজার ২০৫ জন। এরমধ্যে এসএসসিতে ২৩ হাজার ৪২৪ জন, দাখিল৩ হাজার ৫৭৫ জন, এসএসসি ভোকেশনাল ও দখিল ভোকেশনাল পরীক্ষার্থী এক হাজার ২০৬ জন।

সুনামগঞ্জ শহরের হাছন নগর এলাকার বাসিন্দা ও সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী সাদিয়া জানায় বন্যার পানি তার সবগুলো বাই ডুবেগেছে। সাদিয়া অরো জানান, শুধু তার বইই পানি ডুবে নষ্ট হয়নি তার অনেক বান্ধবীর বই বন্যার পানি নষ্ট হয়েছে।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানাযায়, এ জেলার ১২টি উপজেলায় জনসংখ্যা রয়েছে ২৯ লাখ ৫৪ হাজার। কৃষি শুমারী অনুয়ারি জেলায় ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৭শত পরিবার রয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম জানান, জনসংখ্যার এ পরিসংখ্যান কৃষি বিভাগ জনসংখ্যা বৃদ্ধির পারসেনটেউজ অনুয়ারি বের নির্ণয় করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগ জানায়, দুদফা বন্যায় জেলার ৮টি সড়কের দৈর্ঘ্য সাড়ে তিনশত কিলোমিটার। সড়কগুলো হচ্ছে, সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়ক, মদনপুর-দিরাই সড়ক, পাগলা-জগন্নাথপুর-বাণীগঞ্জ-আউশকান্দি সড়ক,সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপু তাহিরপুর সড়ক, সুনামগঞ্জ-দোয়ারাবাজার সড়ক, সুনামগঞ্জ-জামালগঞ্জ সড়ক, নিয়ামতপুর-তাহিরপুর সড়ক ও গোবিন্দগঞ্জ-ছাতক সড়ক। এর মধ্যে ১৮৪ কিলোমিটার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যার ক্ষতির পরিমান প্রাথমিকভাবে নির্ণয় করা হয়েছে। কমপক্ষে ৩শত কোটি টাকা। বিষয়টি নিশ্চিত করে সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম প্রামানিক  জানান, ক্ষতিগ্রস্ত ১৮৪ কিলোমিটার সড়ক মেরামতে প্রাথমিকভাবে ২৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে এ ৮টি সড়কের ৪২ কিলোমিটার প্রাথমিকভাবে সংস্কার করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো জহুরুল ইসলাম জানান, সুরমা নদীর পানি (মঙ্গলবার সন্ধ্যা) গত ২৪ ঘন্টায় ১১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে ৭ দশমিক ৫৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘন্টায় ৩৫ মিলিমিটার, ছাতকে ১৭০ মিলিমিটার এবং ভারতে চেরাপুঞ্জিতে ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। তিনি অরো জানান, চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত সব সময়ই হয়। যহেতু বর্ষাকাল বৃষ্টিপাতের প্রবনতা থকবেই। তবে কি পরিমান বৃষ্টিপাত হবে সেটা এমুহুর্তে বলা মুশকিল।

সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি তালিকা করা হচ্ছে,এ মুহুর্তে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি পরিমান বলা যাচ্ছেনা। তবে, সঠিক নিয়মে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলছে।

বার্তাবাহক/সুনামগঞ্জমিরর/এসএ

x