মঙ্গলবার সরস্বতী পূজা, বাণী অর্চনার দিন

আজ সরস্বতী পূজা, বাণী অর্চনার আরাধ্য দিন। শুল্কা পঞ্চমীতে আজ মঙ্গলবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) শ্বেতশুভ্র কল্যাণময়ী বিদ্যাদেবীর আবাহন হবে। মা সরস্বতী জ্ঞানদায়িনী বিদ্যাদেবী সরস্বতী শ্বেতশুভ্র বসনা। তাঁর এক হাতে বীণা অন্য হাতে বেদপুস্তক। অর্থাৎ বীণাপানিতে যার তিনি বীণাপানি- সরস্বতী। আর এ থেকেই বাণী অর্চনার প্রচলন। বিদ্যাদেবীর কৃপালাভের আশায় রাজধানীসহ সারাদেশে মঙ্গলবার সকালে সরস্বতী পূজা উদযাপিত হবে। অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করতে কল্যাণময়ী দেবীর পাদপদ্মে প্রণতি জানাবেন পুণ্যার্থীরা।

প্রতিবছর মাঘ মাসের শুল্ক পক্ষের পঞ্চমী তিথিতে শ্বেতশুভ্র কল্যাণময়ী বিদ্যাদেবীর আবাহন করা হয়। ঢাকা-ঢোল-কাঁসর আর শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠবে রাজধানী ঢাকামহ সারাদেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ। সরস্বতী বিদ্যার ও ললিতকলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে পূজিত হন। ঐশ্বর্যদায়িনী, বুদ্ধিদায়িনী, জ্ঞানদায়িনী, সিদ্ধিদায়িনী, মোক্ষদায়িনী এবং শক্তির আধার হিসেবে সরস্বতী দেবীর আরাধনা করা হয়।

করোনাকালে এবারের সরস্বতী পূজার আয়োজন হচ্ছে সীমিত পরিসরে ও যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে। পূজার আনুষ্ঠানিকতার বাইরে অন্য কোন আড়ম্বরতা থাকছে না। মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আরতি ও ধর্মীয় আলোচনা সভা কিংবা জনসমাগম হয় এমন আয়োজন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হবে। অন্যদিকে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে ১ বছর ধরে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এ কারণে এবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরস্বতী পূজার আয়োজন হচ্ছে না। তবে অন্যান্য মন্দির, পূজামণ্ডপ কিংবা ভক্তদের ঘরে ঘরে পূজার আয়োজন থাকছে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার ও সংবাদপত্রগুলোতে বিশেষ নিবন্ধও প্রকাশিত হবে।

এদিকে সরস্বতী পূজা উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁরা বাণীতে হিন্দু সম্প্রদায়কে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশে কাউকে সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে দেয়া হবে না। আগামী দিনে সকল ধর্মের পারস্পরিক সম্প্রীতি আরও সুদৃঢ় হবে।

ধর্মীয় বিধান অনুসারে, মাঘ মাসের শুল্কপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে সাদা রাজহাঁসে চড়ে বিদ্যা ও জ্ঞানদাত্রী দেবী সরস্বতী পৃথিবীতে আসেন। অফিস-আদালত, পাড়া-মহল্লায় আজ পূজামণ্ডপে পুণ্যার্থীরা মায়ের পদপদ্মে অঞ্জলি দেবেন। দেবীর সামনে ‘হাতেখড়ি’ দিয়ে শিশুদের বিদ্যাচর্চার সূচনা হবে অনেক স্থানে। এছাড়া কিছু মণ্ডপে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে সারাদেশে পূজা অর্চনার জন্য ব্যাপক আয়োজন করা হয়েছে। বেচা-কেনা চলছে পূজার অন্যতম উপকরণÑ ফলমূল, ফুল, বেলপাতা, খই-মুড়কি-বাতাসা-নাড়ু। জ্ঞান, সঙ্গীত ও শিল্পকলার দেবী হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের বাইরে জাপান, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও মিয়ানমারের কিছু কিছু স্থানে সরস্বতী পূজার চল আছে। কালপরিক্রমায় এ পূজা ব্যক্তি ও পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে এখন বাঙালী হিন্দুদের সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে ক্রমশ এক সার্বজনীন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের রূপ লাভ করেছে। হিন্দু ধর্মের বিভিন্ন গ্রন্থে সরস্বতীয় রূপ-মাহাত্ম্য বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। বেদ, পুরাণ ও বিভিন্ন শাস্ত্রীয় গ্রন্থে সরস্বতীর নানা রূপ ও প্রকৃতির বর্ণনা পাওয়া যায়। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে সরস্বতীর মাহাত্ম্য যেভাবেই বা যে রূপেই তুলে ধরা হোক না কেন, বাঙালী সংস্কৃতিতে সরস্বতীকে বিদ্যার দেবী হিসেবে পূজা করা হয়ে থাকে। হিন্দু সম্প্রদায় সরস্বতীর যে মূর্তি পূজা করে সেই সরস্বতীর রূপ দ্বিভূজা, শ্বেত বরণী, শ্বেতাম্বরা, শ্বেতদল বাসিনী, শ্বেত হংসবিহারিনী ও বীণা পুস্তক-কমলধারিনী।

সকাল হতে উপবাস থেকে মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে ভক্তরা প্রার্থনা জানাবেন বিদ্যাধিষ্ঠাত্রীর। হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে সরস্বতী জ্যোতির্ময়ী অধিষ্ঠাত্রী দেবী। তিনি বাগদেবী। সরস্বতী নদীর তীরে দেবীর স্তোত্র ও আরাধনার মাধ্যমে বেদধ্বনি হতো বলে এই নদী বাগদেবীর বাসস্থান বলে অভিহিত। নদী অর্থে তিনি পবিত্র তোয়া সঙ্গীতময় ও সুন্দর স্তোত্রের উদ্বোধনকারী। বাগদেবী অর্থে তিনি মানব হৃদয়কে পবিত্র করেন। তিনি সুন্দর ও মর্ত্যবাক্যের প্রেরণকাত্রী। তিনি মহাসমুদ্রের মতো পরমাত্মার প্রকাশ করেন। তিনি সমুদয় মানব-মানবীর হৃদয়ে জ্যোতি সঞ্চারিত করেন। পরমাত্মার মুখ থেকে তাঁর আবির্ভাব।

মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটি ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনের কেন্দ্রীয় পূজামণ্ডপে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরস্বতী পূজার আয়োজন করেছে। রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ পূজামণ্ডপেরও অনুরূপ অনুষ্ঠানমালা থাকছে। এদিকে প্রতিবছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলসহ অন্য হলগুলোতে ঐতিহ্যবাহী ও আড়ম্বরপূর্ণ সরস্বতী পূজার আয়োজন হয়ে থাকলেও এবার করোনা পরিস্থিতিতে তা সম্পূর্ণই বন্ধ থাকছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও পূজা হচ্ছে না। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে জগন্নাথ কেন্দ্রীয় পূজামণ্ডপে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হবে।

জাতীয় সংসদের উদ্যোগে প্রতি বছরের মতো এবারও সংসদ ভবন সংলগ্ন মানিক মিয়া এভিনিউর রাজধানী উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সরস্বতীয় পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এখানে সকালে পূজা ছাড়াও সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন রয়েছে। স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন। এছাড়া সকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ছাড়াও বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী উপস্থিত থাকবেন বলে জানিয়েছেন পূজার প্রধান আয়োজক সংসদ সদস্য পংকজ দেবনাথ।

এছাড়া রাজধানীর রমনা কালীমন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম, ঢাকা আইনজীবী সমিতি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ইসকন মন্দির, মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দির, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি (বাফা), ব্যাংকার্স পূজা পরিষদ, রামসীতা মন্দিরসহ বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে সরস্বতী পূজা উদযাপিত হবে।

সুনামগঞ্জমিরর/এসপি

x