Skip to content

এখন শিক্ষকরাই মার খাচ্ছেন

আমাদের বা তার পূর্ববর্তী কোন প্রজন্মের এমন কোন শিক্ষার্থী পাওয়া যাবে না যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বা বাহিরে যৌক্তিক কারণে শিক্ষকের হাতে বেতের মার, কানমলা, নিলডাউন, কানধরে উঠবস করাসহ আরো বিভিন্ন ধরনের শাস্তি পায় নাই। সে শাস্তিটাকে অভিভাবক কোন পাত্তা দিতেন না। বরং শিক্ষার্থীদের জন্য আর্শিবাদ হিসেবে ধরে নিতেন। শাস্তির কথা জানলে তারা ধরে নিতেন তাদের সন্তানাদি শিক্ষাগুরুর শাসনে রয়েছে। এতে তারা বরং খুশি হতেন। অপরাধের মাত্রা বেশি হলে অভিভাবকদের হাতে আরেক দফা মার খেতে হতো।

সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলী ইউনিয়নের হাওরবেষ্টিত প্রত্যন্ত মশালঘাট গ্রামে আমার প্রাথমিক শিক্ষা জীবন কেটেছে। গ্রামের স্কুলটিতে তখন চার জন শিক্ষক ছিলেন। তারমধ্যে শিক্ষার্থীদের মারার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন কান্দাপাড়ার স্যার। ভর্তির শুরুতে এ নামেই স্যারকে চিনতাম। পরে জেনেছি স্যারের নাম আব্দুল বারিক। বাড়ি ধর্মপাশা উপজেলার কান্দাপাড়া গ্রামে। স্যার ছিলেন অকৃতদার। জানি না স্যার জীবিত আছেন কিনা। শুনেছি অবসরগ্রহনের পর স্যার গ্রামের বাড়িতে অবস্থান করছেন। স্যারের ভয়ে কেহ স্কুল ফাঁকি দেয়ার সুযোগ ছিল না। আমরা পড়া না পারলে স্যারের ভয়ে বন্ধুরা স্কুলে গিয়েই দোয়া করতাম আল্লাহ স্যার যদি পৃথিবী থেকে বিদায় নিতেন। এটা না হলেও আজ যদি অন্তত স্কুলে না আসতেন। তাহলে একটা দিন অন্তত আনন্দে কেটে যেত। কিছুক্ষণ পরেই দেখতাম সঠিক সময়ে স্যার হাটতে হাটতে হাসি মুখে স্কুলে প্রবেশ করতেন। আমাদের তখন বুকের ভিতরে পানি শুকিয়ে যেত। কোন অপরাধে শিক্ষার্থীদের বেত্রাঘাত শুরুর পূর্বেই দেখা যেত অনেকে ভয়ে প্রশ্রাব করে দিতো। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত স্কুল ফাঁকি দেয়া ছিলো আমার নিয়মমাফিক অভ্যাস। এমনও হয়েছে টিফিনের পরে বই রেখে স্কুল থেকে চলে এসেছি। সহপাঠি চাচাত বোনকে কানে কানে বলে এসেছি স্কুল ছুটি হলে আমার বইগুলি সাথে আনার জন্য। বিকেলে অপেক্ষায় থাকতাম কবে বই নিয়ে আসবে। সে আসার পর বলতো আমি তো তোর বই আনি নাই। তখন আমার কান্না এসে যেতো। অনেক পরে লুকানো বই আমার হাতে তুলে দিতো। এভাবেই চলছিল স্কুলের দিন গুলো।

বারিক স্যার আমাদের পাশের বাড়িতে লজিং থাকতেন। প্রতি রাতের আঁধারে ছাত্র ছাত্রীদের বাড়িতে লুকিয়ে দেখতেন তারা পড়াশুনা করছে কিনা। পড়ায় নিয়মিত না হলে পরের দিন স্কুলে শাস্তির ব্যবস্থা থাকতো। একদিনের ঘটনা, কি কারণে একদিন স্কুল মিস করেছি। পরের দিন বিকালে মা পাঠিয়েছেন পাশের বাড়ির দোকান থেকে কি জরুরী একটি জিনিস কিনে আনার জন্য। ভাবছি দোকানে যাব কিনা। দোকানে যাবার পথেই এক বাড়িতে বারিক স্যার লজিং থাকতেন। আর অবসরে স্যার বাড়ির বারান্দায় বসা থাকেন। আল্লাহর নাম নিয়ে দোয়া দুরুদ পড়ে বুকে সাহস সঞ্চার করে বীর দর্পে দোকানের দিকে রওয়ানা হলাম। স্যার যে বাড়িতে থাকেন সে বাড়ির কাছে গিয়েই হাটার গতি বাড়িয়ে দিলাম। ভাবছিলাম স্যার হয়তো তখন নাও থাকতে পারেন। নিশ্চিত হবার জন্য একবার সেদিকে তাকাতেই স্যারের চোখে চোখে আমার চোখ। হাতের ইশারায় স্যারের কাছে যাবার জন্য ডাকলেন। বুকে পানি নেই। কথায় বলে যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়। কাছে যাবার পর স্যার জিজ্ঞেস করলেন গতকাল স্কুলে যাসনি কেন? শাস্তি এড়াতে বানিয়ে মিথ্যে বললাম আমার আম্মা গতকাল স্কুলে যেতে নিষেধ করেছেন। তিনি বললেন তোর মা কি মাস্টার? কানে ধর, দশবার উঠবস কর। পরে বেশি শাস্তি হবে সেই ভয়ে দ্রুত কানে ধরে নির্ধারিত শাস্তি মাথা পেতে নিলাম। শাস্তি শেষ হবার পর বললেন কাজে যা, আর কোন দিন স্কুল মিস করবে না। ভদ্র ছেলের মতো আমি কাজে গেলাম। কাজ শেষ করে বাড়ি এসে পুরো ঘটনাটি মাকে বললাম। মা শুনে মুচকি হাসি দিলেন। এভাবেই শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের কঠোর শাসনে বৃত্তি পেয়ে প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শেষ করলাম।

পরে স্থানীয় সাতগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়, শাহপুরে ভর্তি হলাম। ভর্তির হবার পর স্কুলে নতুন বিএসসি শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলেন আবুল কালাম স্যার। টগবগে তরুণ। খুবই কড়া। কঠোর শাসন করেন শিক্ষার্থীদের। সপ্তম শ্রেণিতে একদিন ভুলে গণিতের হোম ওয়ার্ক আনি নাই। আমি ছিলাম ক্লাসের ফাস্ট বয়। কালাম স্যার ক্লাসে ডুকেই প্রথমেই আমার কাছে হোম ওয়ার্কের খাতা দেখতে চাইলেন। আমি বিনয়ের সাথে স্যারকে বললাম স্যার ভুলে হোম ওয়ার্ক করি নাই। আমি এখনই অংক গুলো করে দেখাই। স্যার কোন কথা শুনেন নাই । অফিসে গিয়ে জালি বেত এনে কয়েকটি বেত মারতেই আমি স্যারের বেতটি হাতে ধরতেই বেয়াদবি করেছি মনে করেই স্যার আরো রেগে গিয়ে ত্রিশ পয়ত্রিশটি বেত্রাঘাত করলেন। সেদিন ক্লাসে আমার সহপাঠি বড় বোনসহ সবাই আমার জন্য সবাই চোখের জল ফেলেছিল। পরে কালাম স্যার প্রধান শিক্ষক শফিক স্যারের কাছে গিয়ে আমাকে মারার কথা বললেন। হেড স্যার বললেন তাকে মারাটা আপনার ঠিক হয় নাই। সে এমনিতেই ক্লাসের মেধাবী ছেলে। এ ঘটনাটি জানার পরও আমার বাবা স্কুলের সকল শিক্ষকদের বাড়িতে দাওয়াত দিয়ে এনে সম্মানিত করেছেন। কঠোরে শাসনের মধ্যে অষ্টম শ্রেণিতে টেলেন্টফুলে বৃত্তি পেয়ে নবম শ্রেণিতে জেলার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ সরকারি জুবীলি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হই।

জুবিলী স্কুলেও শৃঙ্খলিত জীবন। কঠোর নিয়ম! স্কুলের পাশে মুসলিম ছাত্রাবাসে দু’বছর বন্দি জীবনে হোস্টেল সুপার রফিক স্যারের কাছ থেকে জীবন সম্পর্কে অনেক কিছুই জেনেছি। সেটা আজও চলার পথেও পাথেয়। স্যারের বেতের মারের কথা বললে শেষ করা যাবে না। স্যারের সকল শিক্ষার্থীরা সেটা জানেন। কোন অনিয়ম বা অপরাধে অভিভাবকরে সামনে স্যার ছাত্রদেরকে মারতেন। স্যার চোখ রাঙানো দেখলে অনেকের বুক শুকিয়ে যেথো। স্কুলে গণিতের অজয় স্যারের (বেনু স্যার) ছাত্রদের পেঠে মোচড় দেয়ার কথা সবাই জানতো। আজও স্যারকে রাস্তায় দেখলে ভয় পাই (সেটা শ্রদ্ধার)। সেই স্যারদের কঠোর শাসনে ও যত্নে স্টার মার্কসসহ বিজ্ঞানে এসএসসি পাস করে অভিভাবকদের মুখ উজ্জল করেছি। জুবিলী স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষক ফয়জুর রহমান (ভারপ্রাপ্ত) স্যারের অফিসে কয়েকদিন পূর্বে স্যারের সাথে দেখা। স্যারের সামনে চেয়ারে বসতে সাহস পাই নাই। বসলে স্যারের প্রতি অশ্রদ্ধা হবে সেটাই মনে মনে কাজ করছিল।

আজকের এ লেখাটির পেছনে একটি উদ্দেশ্য আছে। আজ দুপুরে শহরে একজন শিক্ষকের বাসায় একজন নারীসহ দু’জন অভিভাবক এসেছেন শিক্ষককে মারার জন্য। তার অপরাধ তিনি তাদের সন্তানকে তার বাসায় পড়ানোর সময় তাকে পিঠে মেরেছেন। যতটুকু জানি শিক্ষককে তারা যতদুর পারা যায় চরম অপমান করে গিয়েছেন। সঙ্গত কারণেই আমি শিক্ষকের প্রকৃত পরিচয় এখানে গোপন রেখেছি। বর্তমান সময়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থদের সর্ম্পকটা কোন পর্যায়ে সেটা দেখানোর জন্য। সুনামগঞ্জ সদর আসনের সাংসদ পীর মিসবাহ ভাই শহরে একটি অনুষ্টানে বক্তৃতায় বলেছেন তাঁদের সময়ে স্কুলে মার খেলে বাসায় গিয়ে সতর্কতার সহিত কাপড় পাল্টাতেন যদি পাছে ধরা পরে যান শিক্ষক তাঁকে মেরেছেন তাহলে আরেক দফা অভিভাবকদের হাতে মার খেতে হবে। তিনি আরো বলেলেন, কিছুদিন পূর্বে একজন অভিভাবক তাঁর কাছে গিয়েছেন একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করার জন্য। শিক্ষকের অপরাধ তিনি তার সন্তানকে স্কুলে মেরেছেন। এ লেখায় আমি স্কুলে শিক্ষার্থীদের মারার পক্ষে কোন বক্তব্য দিচ্ছি না। সরকারিভাবে পরিপত্র জারি করা হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরে বেত্রাঘাত করা যাবে না। মানসিকভাবে আঘাত দেয়া যাবে না। কিন্তু আজকের ঘটনাটি দু’জন অভিভাবক তাদের সন্তানকে সামনে রেখে বাসায় এসে শিক্ষককে আঘাত করাটা আমাদেরকে কি বার্তা দিচ্ছে। আশে পাশে নাকি অনেকেই বলাবলি করছেন, আজকে একজন অবাধ্য শিক্ষার্থীর পক্ষ নিয়ে অভিভাবক শিক্ষককে আঘাত করলেন। আরেকদিন অন্য শিক্ষকের পালা।

এভাবেই এসব অবাধ্য শিক্ষার্থীরাই কোন দিন তাদের বাবা মাকেই লাঠি দিয়ে মারতে শুরু করবে। বিষয়টি অভিভাবকদের বুঝা উচিত। শিক্ষার্থীদৈর হাতে শিক্ষকেরা মার খাচ্ছেন এমন ঘটনা নিত্যনৈমক্তিক। এসব ঘটনা কেন ঘটছে? বিষয়টি নিয়ে গভীর ভাবে ভাবা উচিত। কোথাও মনে হচ্ছে গ্যাপ সৃষ্টি হয়েছে। খুজেঁ বের করা উচিত।


মোঃ মশিউর রহমান
প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ।
দিগেন্দ্র বর্মণ ডিগ্রি কলেজ, বিশ্বম্ভরপুর, সুনামগঞ্জ

সুনামগঞ্জমিরর/এসএ

x